fbpx
ব্লগহেডলাইন

করোনায় ঐক্যবদ্ধ, পরিবেশরক্ষায় কি একজোট হবে বিশ্ব? উঠছে প্রশ্ন

শান্তনু অধিকারী, সবং: করোনায়িত বিশ্বে মৃত্যুমিছিলের ধারা আজও অব্যাহত। আতঙ্কে কাঁটা প্রায় সবকটি দেশ। ১৯৭৪ সালে পৃথিবীর প্রথম পরিবেশ আন্দোলনের ‘থিম’ ছিল ‘একটি মাত্র পৃথিবী’। হাজার সম্মেলন, হাজার চুক্তিও যা পারেনি, এই ২০২০-তে করোনাই তা করে দেখাল। সার্থক করে তুলল ১৯৭৪-এর সেই ‘এক পৃথিবী’র স্লোগান। কারণ, লকডাউনের জেরে এমনিতেই কমেছে বিশ্বব্যাপী দূষণের বোঝা। তেমনই সব রাষ্ট্রশক্তিও আজ ঐক্যবদ্ধ। তাঁরা সকলেই হাতে হাত, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আজ লড়ছেন। লক্ষ্য একটিই, ‘করোনা হঠাও, জীবন বাঁচাও।’

কিন্তু করোনা-উত্তর পর্বে পৃথিবী বাঁচবে কি? জলবায়ু রক্ষায় কি দেখা যাবে এক দেশের পাশে অন্য দেশের এমন মানসিক সহাবস্থান? বিজ্ঞান ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের মতামতকে মান্যতা দিয়ে বন্ধ হবে কি রাষ্ট্রনায়কদের পারস্পরিক কাজিয়া? করোনাতঙ্কের মধ্যেই জাগছে প্রশ্ন। প্রশ্ন তুলছেন বর্তমান বিশ্বের পরিবেশ আন্দোলনের অন্যতম মুখ সুইডিশ কিশোরী গ্রেটা থুনবার্গও।

গত ২২এপ্রিল বসুন্ধরা দিবস উপলক্ষে এক অনলাইন কথোপকথনের আসরে এসেছিলেন গ্রেটা। সেখানেই প্রকাশ করলেন তাঁর সংশয়। যা বিশ্বের প্রায় সবকটি সংবাধমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি বলেন, করোনা মোকাবিলায় যেভাবে রাষ্ট্রগুলি বিশেষজ্ঞদের মতামতকে গুরুত্ব দিচ্ছেন, জলবায়ু রক্ষায় তাঁরা তেমন সচেতন নন। গ্রেটার এই আশঙ্কা কি নিতান্তই অমূলক?

মনে রাখতে হবে, পৃথিবীকে বাঁচাতে জলবায়ু রক্ষায় প্রতিটি দেশেরই নিজ নিজ ভূমিকা স্বীকার করে, সহমতের ভিত্তিতে একটি চুক্তি করতেই লেগে গিয়েছিল প্রায় কুড়িটা বছর বছর! ‘কিয়োটো প্রটোকল ১৯৯৭’ থেকে ‘প্যারিস জলবায়ু চুক্তি-২০১৬’। তবু ‘কেউ কথা রাখেনি!’ অব্যাহত থেকেছে রাষ্ট্রগুলির আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব। সঙ্গে চিন ও আমেরিকার অর্থনৈতিক আধিপত্যের ঠাণ্ডা লড়াই। ফলে উপেক্ষিত থেকেছে বিশ্ব জলবায়ু রক্ষার মতো জরুরি বিষয়টি।

আরও পড়ুন: আমেরিকায় মৃত্যু সংখ্যা ছাড়াল ৫০ হাজার

অবশ্য পরিবেশ ও জলবায়ু রক্ষার উদ্যোগ কিন্তু অনেক প্রাচীন। আমাদের দেশের প্রাচীন মহাকাব্যেই রয়েছে পরিবেশ রক্ষার বার্তা। রামচন্দ্র তখন বনবাসে। ভরত চলেছেন তাঁর লোকলস্কর নিয়ে অগ্রজের সঙ্গে দেখা করতে। যাওয়ার পথে প্রয়োজনে তিনি কোথাও নদীতে বাঁধ দিয়েছেন। কোথাও আবার অতিরিক্ত জল বইয়ে দিতে খনন করেছেন প্রবাহপথ। চলার পথ তৈরি করতে বহু গাছ কাটতে হয়েছিল তাঁদের। সেই ক্ষতিপূরণে তাঁরা গাছবিরল স্থানে করেছেন বনসৃজন। শুধু রামায়ণ নয়, এ দেশের প্রাচীন বেদে, উপনিষদে, পুথিতে-পুরাণেও রয়েছে পরিবেশ সচেতনতাভরা সূক্তমালা। কে ভুলতে পারে, আর্যঋষি শ্বেতাশ্বতরের উপনিষদীয় বাণী? “যো দেবোহগ্নৌ যোহপসু যো বিশ্বভুবনানিবেশ। ওষধিষু যো বনস্পতিষু তস্মৈ দেবায় নমো নমঃ।।”

এই প্রাচীন পুরাণ-উপনিষদ ছেড়ে বেরিয়ে এলে আধুনিক বিশ্বেও দেখা মেলে পরিবেশ রক্ষায় অসংখ্য উদ্যোগের। । ইংল্যান্ডের শিল্পবিপ্লব চলাকালীন ১৮৬৩-র ‘আলকালাই অ্যাক্ট’, ১৮৯২-এ বন্যসম্পদ সংরক্ষণে জন মিয়রের ‘সিয়েরো ক্লাব’, ১৯৬৯-এ যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশবিদ ডেভিড ব্রাওয়ারের ‘ফ্রেন্ডস অব দ্য আর্থ’, ১৯৭১-এ ফ্রান্স, সুইডেন, ইংল্যান্ড ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মিলে প্রতিষ্ঠিত ‘ফ্রেন্ডস অব দ্য আর্থ ইন্টারন্যাশনাল’, সমস্ত উদ্যৈগই হারিয়ে গিয়েছে লাভক্ষতির খতিয়ানে।

ইতিমধ্যে ১৯৭০-এ জাতিসংঘের উদ্যোগে প্রথম ‘ধরিত্রী দিবস’ উদযাপন। ১৯৭২-এ জাতিসংঘেরই উদ্যোগে সুইডেনের স্টকহোমে প্রথম ‘আর্থ সামিট’। প্রতিষ্ঠিত হয় ‘United Nations Environment Programme, সংক্ষেপে UNEP। এর কুড়ি বছর পরে ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোতে আরেকটি ‘আর্থ সামিট’। কিন্তু কোনও উদ্যোগই তেমন দাগ কাটতে পারেনি। ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলির চরম উদাসীনতায়। অসার খামখেয়ালিপনায়।

অথচ সকলেই জানেন, বিশ্বের পরিবেশ দূষণের অন্যতম কাণ্ডারি এই তথাকথিত শিল্পে উন্নত দেশগুলোই। তাই ভয়ংকর পরিবেশ বিপর্যয় ও মোকাবিলায় জাতিসংঘ ১৯৯৭ সালে গ্রহণ করে ‘কিয়োটো প্রটোকল’। উদ্দেশ্য, বিশ্বের দেশগুলোকে একটা নিয়ন্ত্রণের বেড়িতে বেঁধে গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন কমানো। কিন্তু এই চুক্তিরও বিরোধিতা করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়া। স্বাক্ষর করেও অর্থনৈতিক কারণ দেখিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসে ২০০১-এ। বস্তুত কিয়োটো চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী অন্যান্যন্য দেশগুলোও যে তাদের অঙ্গীকার রক্ষায় বিশেষ কোনও উদ্যোগ নিয়েছে, তেমন অভিযোগ আজও নেই!

আরও পড়ুন: কাজ হারানো মানুষদের প্রতি মাসে ৭,৫০০ টাকা করে কমপক্ষে ৩ মাস দেওয়ার দাবি ইয়েচুরির

বরং উল্টে ২০২০ পর্যন্ত বর্ধিত এই চুক্তির দ্বিতীয় পর্যায়ে কিয়োটো প্রটোকল থেকে বেরিয়ে এসেছে জাপান, নিউজিল্যান্ড ও রাশিয়ার মতো দেশ! ডিগবাজি খাওয়ার ধারাবাহিকতা বজায় রেখেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকেও বেরিয়ে আসার ঘোষণা করেছে। অজুহাত সেই একটিই, অর্থনীতি! মনে রাখতে হবে, এই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই পৃথিবীর অন্যতম কার্বন নিঃসরণকারী দেশ। তবু ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে এই জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি নিছকই ‘ধাপ্পাবাজী!’ চিনের ‘সাজানো’! অবশ্য একা ডোনাল্ড ট্রাম্প নন। বিশ্বের অসংখ্য লাভ-ক্ষতির কারবারিরাই এই জলবায়ু চুক্তির ঘোর বিরোধী।

ফলে, ক্রমশ স্পষ্ট হয়েছে রাষ্ট্রগুলোর সদিচ্ছার অভাব। ভবিষ্যতের কথা ভেবে কেউই সামান্যতম অর্থনৈতিক ক্ষতি স্বীকারে প্রস্তুত নয়। সেই জন্যই তো, প্যারিস জলবায়ু চুক্তি আজ বিশবাঁও জলে। হাবুডুবু খাচ্ছে বিশ্বের উষ্ণায়ন রোধে কার্বন নির্গমনের মাত্রা কমানোর উদ্যোগও। তাহলে? করোনা রুখতে একজোট হওয়া বিশ্বকি আবার সমবেতসঙ্গীত ভুলে মন দেবে একক সঙ্গীতে? করোনা থেকে বেঁচে আবার দূষণের হাড়িকাঠে মাথা রাখবে পৃথিবী?

সেবছর দফায় দফায় দাবানল আর গ্রীষ্মের প্রচণ্ড দাবদাহে রীতিমতো বিপর্যস্ত সুইডেন। স্কুল না গিয়ে একদিন এক বছর পনেরোর বেনীবাঁধা কিশোরী দাঁড়িয়ে পড়েছিল তার দেশের পার্লামেন্টের সামনে। হাতে প্ল্যাকার্ড। দাবি তার একটিই। জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে বিপর্যস্ত বিশ্বকে বাঁচাতে জরুরি পদক্ষেপ নিক সুইডেন-সহ পৃথিবীর বাকি দেশগুলি। এক নাগাড়ে দাঁড়িয়ে রইল পনেরো দিন। লিফলেট বিলি করল। তাতে লিখল, ‘আমি এসব করছি কারণ, তোমরা বড়রা আমাদের ভবিষ্যতের পথ আগলে আছ।’ সেদিনের সেই কিশোরী আজ বছর আঠারোর গ্রেটা থুনবার্গ। আজ আর সে একা নয়। ‘দ্য গার্ডিয়ান’ পত্রিকার তথ্য অনুসারে গত বছর সেপ্টেম্বরে তার ডাকা বিশ্বজলবায়ু ধর্মঘট (২০-২৭সেপ্টেম্বর) সফল করতে বিশ্বব্যাপী এগিয়ে এসেছিল আনুমানিক ছয় মিলিয়ন মানুষ। দেড়শোটি দেশের প্রায় সাড়ে চার হাজার স্থানে হয়েছিল প্রতিবাদ জমায়েত।

এইজন্যই তো, তাবড় রাষ্ট্রনায়কদের চোখে চোখ রেখে গ্রেটা বলতে পারেন, ‘তোমরা ফাঁকা বুলি দিয়ে আমার স্বপ্ন, আমার শৈশব কেড়ে নিয়েছ। মানুষ মারা যাচ্ছে। সারা বিশ্বের ইকোসিস্টেম ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।কিন্তু তোমরা অর্থের আর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির রূপকথা শোনাচ্ছ! এত সাহস তোমরা পাও কোথায়?’ ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর সাঙ্গপাঙ্গরা আজও গ্রেটার এই বক্তব্যকে ‘হাস্যকর’ বলে উড়িয়ে দিতে চান। গ্রেটাকে ‘বখে যাওয়া স্কুলছুট’ তকমায় দাগিয়ে দিতেও কুণ্ঠিত নন তাঁরা!

পৃথিবীর ‘ফুসফুস’ আমাজনের বিপর্যয়ের স্মৃতি আজও টাটকা। অস্ট্রেলিয়ার দাবানলের হাহাকার আজও জীবন্ত। বরফ গলছে মেরুতে। হাজার সুনামী, ভূমিকম্পেও হুঁশ ফেরে না রাষ্ট্রগুলোর। সব অহংকারেরই একদিন পতন হয় কালের নিয়মে। কিন্তু কার্বন গিলতে গিলতে, অসহ্য উষ্ণতায় পুড়তে পুড়তে ততদিন এই মানবজাতিটাই টিকে থাকবে কিনা, তৈরি হচ্ছে সংশয়। বরং সময় থাকতে সংযত হোক বিশ্বের রাষ্ট্রগুলো, বিশ্ববাসীর এখন সেটাই প্রার্থনা।

Related Articles

Back to top button
Close