fbpx
কলকাতাগুরুত্বপূর্ণহেডলাইন

লক্ষাধিক টাকার বিল মেটালেও দিতে পারেননি মাত্র ২০ হাজার, এই হাসপাতালে অ্যাম্বুলেন্সেই মৃত্যু হল আক্রান্তের

অভীক বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা: করোনা আক্রান্তকে ভর্তি করতে হলে প্রাথমিক ভাবে ৫০ হাজার টাকার বেশি ভর্তি নেওয়া যাবে না বলে দু’দিন আগেই নির্দেশিকা জারি করেছিল স্বাস্থ্য দফতর। কিন্তু সেই সমস্ত নির্দেশিকাকে অমান্য করে সোমবার রাতে চূড়ান্ত অমানবিকতার নজির দেখাল বাইপাসের ধারে একটি বেসরকারি হাসপাতাল। অভিযোগ, ৩ লক্ষ টাকার মধ্যে ২ লক্ষ ৮০ হাজার টাকা দিয়েও মাত্র ২০ হাজার টাকা দিতে না পারায় ভর্তি নেওয়া হল না সুদূর পূর্ব মেদিনীপুরের তমলুক থেকে আসা এক করোনা রোগীকে। হাসপাতালের দোরগোড়ায় সকলের চোখের সামনে অ্যাম্বুল্যান্সের মধ্যেই প্রাণ হারালেন ৬০ বছরের লায়লা বিবির।

পরিবার সূত্রে খবর, তিন দিন আগেই মৃত্যু হয়েছে লায়লা বিবির করোনা আক্রান্ত স্বামীর। স্বামীর মৃত্যুর পর পরই অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। এরপরই প্রথমে পার্ক সার্কাসে অবস্থিত একটি বেসরকারি নার্সিংহোমে ভর্তি করা হয়। ওই মহিলারও করোনা পরীক্ষা করা হয়। সোমবার তাঁর রিপোর্ট পজিটিভ আসে। কিন্তু করোনা রোগীদের জন্য কোনও ব্যবস্থা ছিল না ওই হাসপাতালে। সেই কারণেই রোগীকে অন্যত্র স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেয় পরিবার। এরপর সোমবার রাতেই একটি অ্যাম্বুল্যান্স ভাড়া করে করোনা আক্রান্ত ওই মহিলাকে রুবির কাছে ওই বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।

মৃতার জামাই সইফুল্লার অভিযোগ, ভর্তির জন্য হাসপাতাল থেকে ৩ লাখ টাকা জমা দিতে বলা হয়। প্রথমে তারা ৮০ হাজার টাকা জমা দেন। কিন্তু হাসপাতাল থেকে বলা হয় একসঙ্গে ৩ লাখ টাকা দিলে তবেই ভর্তি নেওয়া হবে। তার পরে আবু ধাবি থেকে এক আত্মীয়ের সূত্রে আরও ২ লাখ টাকাও জমা দেন। কিন্তু তারপরেও ২০ হাজার টাকা বাকি থাকায় ভর্তি নেওয়া বা চিকিৎসা শুরু করার কোনওটাই করতে চায়নি হাসপাতাল বলে অভিযোগ।

এদিকে পরিবার-হাসপাতালের দর কষাকষির মধ্যে ভর্তি হতে না পেরে অ্যাম্বুল্যান্সেই পড়ে থাকেন করোনা আক্রান্ত ওই মহিলা। তারপর অ্যাম্বুল্যান্সের মধ্যেই তাঁর মৃত্যু হয়। এই ঘটনায় উত্তেজনা ছড়ায় হাসপাতাল চত্বরে। খবর পেয়ে রাতেই হাসপাতালে চলে আসে আনন্দপুর থানার পুলিশ। মানুষের সেবার পেশায় নেমে হাসপাতালগুলি কী ভাবে এরকম ব্যবসায়ী মানসিকতার হতে পারে, তা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন পরিবারের লোকজন। গোটা ঘটনা লিখিত আকারে জানিয়ে আনন্দপুর থানায় হাসপাতালের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেছে রোগীর পরিবার।

যদিও এই অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, মৃত অবস্থাতেই ওই রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। ওই হাসপাতালের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর তাপস মুখোপাধ্যায় টেলিফোনে জানিয়েছেন, ওই রোগিণীকে যখন আনা হয়েছিল, তখন অ্যাম্বুল্যান্সেই তাঁর মৃত্যু হয়েছিল। সেই কারণেই তাঁকে ভর্তি করা হয়নি। টাকা দিতে না পারার জন্য ভর্তি না নেওয়ার অভিযোগ পুরোপুরি মিথ্যে। তিনি আরও বলেন, “ওঁরা ৮০ হাজার টাকা অগ্রিম দিয়ে বেড বুক করেছিলেন। ফলে ভর্তি না নেওয়ার প্রশ্নই ছিল না। ৩ লক্ষ টাকার যে অঙ্কটা বলা হয়েছিল, সেটা সম্ভাব্য খরচের হিসেব। সেটা স্বচ্ছতার জন্য আমরা আগেই জানিয়ে দিই রোগী পরিবারকে। কিন্তু সোমবার রাত সাড়ে ন’টায় যখন রোগিণীকে আনা হয়, আমাদের চিকিৎসক তখনই অ্যাম্বুল্যান্সে গিয়ে দেখেন, তিনি মৃতা। সিপিআর দেওয়ার চেষ্টাও করা হয়, কাজ হয়নি। সেই কারণেই ভর্তি নেওয়া হয়নি রোগিণীকে। কারণ এ ক্ষেত্রে আমাদেরই বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযোগ উঠত, মৃত রোগীকে ভর্তি করে টাকা দাবি করেছি আমরা। তবুও আমরা গোটা ঘটনা নিয়ে অভ্যন্তরীণ তদন্ত করে দেখব।”

অন্যদিকে, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের এই দাবি পুরোপুরি মিথ্যে বলে দাবি করে মৃত লায়লা বিবির জামাই সইফুল্লা বলেন, “বিকেলে ৮০ হাজার টাকা জমা দিয়ে বেড বুক করে রেখে রাত ৮টা ৫০ মিনিটে আমরা মাকে নিয়ে এসে পৌঁছই। আমাদের বলা হয়, ৮০ হাজার জমা আছে, আরও ২ লাখ ২০ হাজার টাকা জমা করলে তবেই পেশেন্টকে নামানো হবে অ্যাম্বুল্যান্স থেকে। আমি জানাই, আমার কার্ডের লিমিট আজকের মতো শেষ, রাত ১২টা হলেই আমি পেমেন্ট করে দেব। আপনারা চিকিৎসা শুরু করুন। কিছুতেই রাজি হননি তাঁরা। শেষমেশ আবুধাবিতে আমার শ্যালক (মৃতার বড় ছেলে) থাকেন, তাঁর ওখান থেকে ২ লাখ টাকা পাঠানো হয়। সেই ট্রানজ্যাকশন ডিটেলসও আমরা দেখাই। তবুও ওনারা চিকিৎসা শুরু করতে চাননি।”

তাঁর আরও দাবি, রাত ১০ টা ২০ মিনিট পর্যন্ত অ্যাম্বুল্যান্সেই জীবিত অবস্থায় ছটফট করেছেন রোগিনী। কিন্তু হাসপাতালের তরফে বলা হয়, ‘আপনারা যেহেতু সকলে হোম কোয়ারেন্টাইনে চলে যাবেন, তাই এখনই টাকা দিতে হবে। না হলে আমরা চিকিৎসা শুরু করব না।’ এর অনেক পরে যখন চিকিৎসক অ্যাম্বুলেন্সে দেখতে রোগী আসেন ততক্ষণে মৃত্যু হয়েছে ওই রোগিনীর। রোগিনীকে আনা মাত্র ভর্তি করলে তার মৃত্যু হতো না বলে দাবি পরিবারের। রাজ্য স্বাস্থ্য দফতর করোনা রোগী ফেরালে হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল, ন্যূনতম ৫০ হাজার টাকায় ভর্তি করিয়ে ১২ ঘণ্টা পরিষেবা দেওয়ার মত একাধিক নির্দেশিকা দিলেও হাসপাতালগুলি যে তার কোনও পরোয়াই করে না, এই ঘটনা যেন ফের তার জানান দিল।

Related Articles

Back to top button
Close