fbpx
কলকাতাহেডলাইন

বিধায়করা একুশের ভোটে লড়াইয়ের টিকিট পাবেন, দলবদল রুখতেই মাস্টারস্ট্রোক তৃণমূল সুপ্রিমোর

যুগশঙ্খ ডিজিটাল ডেস্ক:  টার্গেট ২১-এর নির্বাচন। লোকসভা নির্বাচনে কার্যত মুখ থুব্রে পড়ে ছিল ঘাসফুল শিবির।গাঢ় সবুজ বাংলায় বামে-রামে সন্ধিতে গেরুয়া হয়ে উঠেছিল।গত লোকসভা নির্বাচনে এ রাজ্যে বিজেপির উত্থান বেশ ইঙ্গিতবাহী। তা বুঝতেও পেরেছেন তৃণমূল সুপ্রিমো। একুশের আগে তাই আরও সাবধানী তিনি। সামনেই বিধানসভা হাতে আর মাত্র ৯টা মাস এর মধ্যেই গুটি সাজিয়ে মাঠে নামতে প্রস্তুতি নিচ্ছে তৃণমূল। ২১ জুলাইয়ের কর্মসূচি-সহ বিধানসভা নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে শুক্রবার দলীয় বৈঠক ছিল তৃণমূলের। ভিডিয়ো কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে সেই বৈঠকে হাজির ছিলেন তৃণমূলের জেলা সভাপতি, জেলা স্তরের নেতা, বিধায়ক ও সাংসদরা। বৈঠকে দলের আগামী কর্মসূচির দিক নির্দেশ করেন তৃণমূলনেত্রী। সঙ্গে চিন নিয়ে মুখ খোলার ব্যাপারে দলীয় নেতাকর্মীদের সাবধান করেন তিনি।

একুশে হ্যাটট্রিকের হাতছানি। ক্ষমতায় থাকা এই ১০ বছরের মধ্যে দল বদলের কাঁটায় বিদ্ধ হতে হয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলকে। আপনারা কি ভোটে দাঁড়াতে চান না? শুক্রবার দলীয় বৈঠকে বিধায়কদের উদ্দেশে সরাসরি এই প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই সঙ্গে ক্ষোভ প্রকাশ করেন বিধায়কদের একাংশের নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে। বিজেপি যে একতরফা প্রচারে অনেকটা এগিয়ে গিয়েছে, উল্লেখ করেন তা-ও।

বিধানসভা ভোটের আগে এ বছরই তৃণমূলের শেষ একুশে জুলাই কর্মসূচি। সব কিছু ঠিক থাকলে আগামী বছর একুশে জুলাইয়ের আগেই ভোট হয়ে যাবে। শুক্রবার একুশে জুলাইয়ের প্রস্তুতি সংক্রান্ত এই বৈঠকে বিধায়কদের দিকে ছুঁড়ে দেওয়া দিদি-র এই ‘গুগলি’ পর্যবেক্ষকদের মতে তাত্‍পর্যপূর্ণ। মূলত ২১ জুলাইকে সামনে রেখে হলেও, গুরুত্বপূর্ণ কথা জানিয়ে দিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বললেন, বিধায়করা সকলে আগামী বছর ভোটে লড়াইয়ের টিকিট পাবেন। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মত, দলের হেভিওয়েট নেতাদের দলবদল রুখতেই তাঁর এই ঘোষণা। বিধায়কদের ফের লড়াই নিশ্চিত করে দিলেন। তবে ২৯৪ কেন্দ্রে প্রত্যেকেই লড়ার সুযোগ পাবেন কি না, তা নিয়ে কিঞ্চিৎ সন্দেহের অবকাশও রেখে দিলেন তৃণমূল সুপ্রিমো। জানালেন, অন্য কোনও সংরক্ষণ না থাকলে, প্রত্যেকে নিজের নিজের কেন্দ্র থেকেই দাঁড়াতে পারবেন। অনিশ্চয়তা রয়েছে অবশ্য রায়দিঘিতে। সেখানকার দু’বারের তারকা বিধায়ক দেবশ্রী রায়কে নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তেমন সন্তুষ্ট নন বলে সূত্রের খবর।

করোনা ও আমপান পরিস্থিতিতে দলের বিধায়কদের কাজ নিয়ে আলোচনায় কিছুটা অসন্তোষই ছিল তৃণমূলনেত্রীর কথায়। এই প্রসঙ্গ টেনে ভিডিয়ো বৈঠকে মমতা বলেন, ”রাজ্যে নানা বিষয়ে একতরফা প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে বিজেপি। আমাদের দলের প্রচার কোথায়? তৃণমূল সরকার মানুষের জন্য এত কাজ করছে অথচ বিধায়কেরা তা নিয়ে প্রচার করছেন না!” এই প্রসঙ্গেই পুরুলিয়ার বিধায়ক শান্তিরাম মাহাতোর নাম করে তিনি বলেন, ”এই যে তিনটে মাস গেল, কোথায় ছিলে তুমি? ঘর থেকেই বার হওনি। সকলকেই সুস্থ থাকতে হবে। কিন্তু মানুষের সঙ্গেও তো থাকতে হবে আমাদের।” তারপরই বিধায়কদের উদ্দেশে তাঁর প্রশ্ন, ”আপনারা কী করছেন? ভোটে দাঁড়াবেন না? ভোটে দাঁড়িয়ে জিততে চান না?” তারপর মমতার ঘোষণা, ”কারা কারা ভোটে দাঁড়াতে চান, হাত তুলুন।” সূত্রের খবর, এক বিধায়ক হাত না তোলায়, তাঁকে লক্ষ্য করে মুখ্যমন্ত্রীর তাঁর নাম করেই বলেন, ”কী হল! আর দাঁড়ানোর ইচ্ছে নেই?” শুনে ওই বিধায়ক তড়িঘড়ি হাত তোলেন।

আরও পড়ুন: রাজাবাজার থেকে হাওড়া ব্রিজ চালু ট্রাম পরিষেবা

এদিন দক্ষিণ ২৪ পরগনার জেলা সভাপতি শুভাশিস চক্রবর্তীকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, দেবশ্রীকে নিয়ে ভেবেচিন্তে প্রাথমিক সিদ্ধান্ত জানাতে। এতেই অনেকে মনে করছেন, হয়ত দেবশ্রী রায়কে আর প্রার্থী নাও করতে পারেন মমতা। এছাড়া শুভাশিস চক্রবর্তীকে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এতদিন দলের কোষাধ্যক্ষ ছিলেন ফলতার প্রয়াত বিধায়ক তমোনাশ ঘোষ। দলের প্রথম থেকেই এই ভার ছিল তাঁর উপর। তমোনাশ ঘোষের প্রয়াণের পর কোষাধ্যক্ষের দায়িত্ব পেলেন দক্ষিণ ২৪ পরগনার জেলা সভাপতি শুভাশিস চক্রবর্তী।

এদিনের বৈঠকে বিধায়ক ছাড়াও দলের জেলা সভাপতি, পর্যবেক্ষকেরা ছিলেন। সেখানে ত্রাণের কাজ পর্যালোচনার সূত্রে উত্তর ২৪ পরগনার জেলা দলের সভাপতি জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকের সাংগঠনিক বিষয়ে খোঁজ শুরু করেন। বসিরহাটের সাংগঠনিক বিষয়ে কথা উঠতে ফোনে জেলা পরিষদের কর্মাধ্যক্ষ তথা বসিরহাটের দায়িত্বে থাকা নারায়ণ গোস্বামীকে ধরতে বলেন মমতা। বসিরহাট নিয়ে নিজের অসন্তোষের কথা বলে নারায়ণের কাছে মমতা জানতে চান, কেন এ রকম হচ্ছে। জবাবে নারায়ণ বলার চেষ্টা করেন, স্থানীয় গ্রাম কিছু পঞ্চায়েতের প্রধান ও উপপ্রধানের জন্যই এই দুর্নীতির কথা উঠছে।

তা শুনেই বৈঠকে উপস্থিত দলের রাজ্য সভাপতি সুব্রত বক্সী বলে ওঠেন, এই সব প্রধান-উপপ্রধান তো শীর্ষ নেতৃত্ব ঠিক করেননি। স্থানীয় স্তরেই ঠিক করা হয়েছে। সেই প্রসঙ্গ ধরে ক্ষুব্ধ মমতা জানিয়ে দেন, যাঁরা দুর্নীতি করেছে তাঁদের দল থেকে তাড়াতে হবে। এবং যেহেতু পঞ্চায়েতের পদাধিকারীদের স্থানীয় নেতারা বেছে নিয়েছিলেন তাই এ কাজ করতে হবে তাঁদেরই। এ দিন আরও এক বার তিনি দলকে জানিয়ে দেন, তৃণমূল ছেড়ে যাঁরা অন্য দলে যেতে চান, তাঁরা চলে যেতে পারেন।

আরও পড়ুন: তৃণমূলের ২১ জুলাই পালিত হবে বুথে বুথে ভার্চুয়াল সভা, নির্দেশ মমতার

দলের একাধিক জেলা সভাপতি ও বিধায়কদের নাম ধরে দ্বন্দ্ব এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছেন মমতা। পুরসভার কাজকর্ম প্রসঙ্গে কাউন্সিলরদের একাংশের কড়া সমালোচনা করে হুঁশিয়ারি দেন, যে সব জায়গায় সংরক্ষণের জন্য বিদায়ী কাউন্সিলর এ বার প্রার্থী হতে পারবেন না, সেখানে তাঁরা কোনও কাজ করছে না তা তিনি জানেন। সাংগঠনিক অবস্থা নিয়ে ধমক খেয়েছেন মন্ত্রী রবীন্দ্রনাথ ঘোষ। কৃষ্ণনগরের সভানেত্রী মহুয়া মৈত্রের কাজকর্ম নিয়ে স্থানীয় নেতাদের অসন্তোষ রয়েছে। মহুয়ার নাম না করেও এ দিন পুরনো নেতাদের সংগঠনের কাজে গুরুত্ব দিতে বলেছেন মমতা। তা নেতাদের নজর এড়ায়নি। এদিনের বৈঠকেই স্থির হয়েছে সদ্যপ্রয়াত দলীয় বিধায়ক তমোনাশ ঘোষের জায়গায় তৃণমূলের কোষাধ্যক্ষ হবেন দলের সাংসদ শুভাশিস চক্রবর্তী।

বৈঠকে নেত্রীর ভর্ৎসনার মুখে পড়লেন বেশ কয়েকজন বিধায়ক। আমফানের ত্রাণ দুর্নীতি নিয়ে তাঁদের কড়া ধমক দিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কেন ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা ঠিকমতো তৈরি হল না, কেন বিধায়করা সেদিকে নজর দেননি, তা নিয়ে জবাব তলব করেন তিনি। ঘনিষ্ঠ সূত্রে খবর, মমতা এদিন রাগত স্বরে বিধায়কদের প্রশ্ন করেন, সবই কি তিনিই করে দেবে? একুশের নির্বাচনের আগে আমফানের ত্রাণ দুর্নীতিতে যেভাবে দলের নেতাদের নাম জড়াচ্ছে, তাতে বেশ ক্ষুব্ধ দলনেত্রী।  এতে দলের ভাবমূর্তি ফের নষ্ট হচ্ছে বলে আশঙ্কা তাঁর।

 

Related Articles

Back to top button
Close