fbpx
ক্রিকেটখেলাগুরুত্বপূর্ণহেডলাইন

লর্ডসের ব্যালকনি থেকে বিসিসিআইয়ের মসনদ, টিম ইন্ডিয়ার রূপকার,মহারাজা তোমারে সেলাম

যুগশঙ্খ ডিজিটাল ডেস্কঃ  দৃশ্য- ১. ২০০৩ সাল, দক্ষিণ আফ্রিকার জোহেন্সবার্গের ওয়ান্ডারার্স স্টেডিয়াম।ওয়ার্ল্ডকাপ হাতে ভিকট্রি ল্যাপ দিচ্ছেন রিকি পন্টিংয়ের  অস্ট্রেলিয়া। আর অদূরে দাঁড়িয়ে প্রতিপক্ষের সেই আনন্দের দৃশ্যে কিন্তু যন্ত্রণায় বিদীর্ণ হয়েছিলেন  তদকালীন সৌরভের নেতৃত্বাধীণ মেন ইন ব্লু।কান্না ডুকরে উঠেছিল ১১০ কোটির ভেতরে।

দৃশ্য-২ঃ  ২ রা এপ্রিল, ২০১১ সাল মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়েতে মাস্টার ব্লাস্টারকে কাধে নিয়ে মাঠ প্রদক্ষিণ করছে শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে সদ্য বিশ্বকাপ জেতা ধোনির মেন ইন ব্লু। আট বছরের স্বাদ পূর্নতা পেল সেদিন। অনেকটা স্বাধীনতার পতাকা দিল্লির লালকেল্লায় যেদিন উত্তোলিত হয়েছিল সেদিন সেখানে ছিলেন না নেতাজি। তেমনই সেই ঐতিহাসিক মুহুর্তে ওয়াংখেড়ের সবুজ ঘাসে পা  রাখেন অধিনায়ক। কিন্তু ছিলেন তার পুরোনো সতীর্থরা। তার নিজের হাতে গড়া দল।এই দুই দৃশ্যের মধ্যে ভারতীয় ক্রিকেটের এক ঐতিহাসিক যাত্রা ও অধ্যায় রয়েছে।  যেই অধ্যায় লিখেছেন কলকাতার বেহালার বীরেণ রায় রোডের সেই ছেলেটা। আজ তাঁর ৪৮ তম জন্মদিবসে একটু দেখা যাক ভারতীয় ক্রিকেটে তাঁর লেখা সেই কাহিনী।

প্রাক্তন ভারত অধিনায়ক সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়  একটা সময় ভারতীয় ক্রিকেটকে ভয়ঙ্কর খারাপ পরিস্থিতি থেকে টেনে তুলেছিলেন অধিনায়কত্বের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়ে। আর এখন তিনি দল নয় গোটা ভারতীয় ক্রিকেটের ক্যাপ্টেন। তিনি এখন ভারতীয় ক্রিকেটকে শাসন করেন। তিনি ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি। কিন্তু এই রাস্তা সহজ ছিল না এই বাঙালির জন্য। ভারতীয় ক্রিকেটে একমাত্র বাঙালি যিনি বদলে দিয়েছিলেন সবটা। শিখিয়েছিলেন প্রতিপক্ষের চোখে চোখ রেখে জবাব কীভাবে দিতে হয়। তার আগে পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ডের মতো দেশের সামনে ভারতের ক্রিকেটাররা গুটিয়ে থাকতেন। ‘গড অব অফ-সাইড’ তাঁকে বলেছিলেন রাহুল দ্রাবিড়। ঠিক যেভাবে সৌরভের ব্যাটিং মানুষের মনে জায়গা করে নিয়েছিল সে ভাবেই নজর কেড়ে নিয়েছিল তাঁর নেতৃত্ব।

আজ তাঁর জ‌ন্মদিন। ৪৮ বছরে পা দিলেন ভারতীয় ক্রিকেটের দাদা। ১৯৯৬-এ ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে টেস্টে অভিষেক হয় তাঁর।  লর্ডসে প্রথম ম্যাচেই সেঞ্চুরি করে নিজের আগমনের বার্তাটা সোচ্চারে দিয়ে দিয়েছিলেন সৌরভ।

দ্বিতীয় টেস্টেও সেঞ্চুরি করেছিলেন। তিন ব্যাটসম্যানের মধ্যে তিনি একজন যিনি অভিষেকেই পর পর সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছিলেন। এর পর ১৯৯৭-এ একদিনের ক্রিকেটে অভিষেক। সেখানেও তিনি পর পর চারটি ম্যাচের সেরার পুরস্কার হাতে নিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন ভারতীয় ক্রিকেটকে শাসন করতে চলে এসেছেন একজন।

১৯৯ বিশ্বকাপে সৌরভ শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে ১৮৩ রানের ইনিংস খেলেন এবং রাহুল দ্রাবিড়ের সঙ্গে মিলে ৩১৮ রানের পার্টনারশিপ করেন।

২০০০-এ ম্যাচ গড়াপেটার অভিযোগে রীতিমতো ধসে যায় ভারতীয় ক্রিকেটে ভিত। সেই সময় দলের অধিনায়কত্ব তুলে দেওয়া হয় সৌরভের হাতে। সেই সময় একটা বিধ্বস্ত দলকে সামলানো এবং ভারতীয় ক্রিকেটে সম্মান ফিরিয়ে আনা সহজ ছিল না।

কিন্তু অন্য পথ বেছে নিলেন তিনি। নতুন প্রজন্মকে তুলে আনতে শুরু করলেন তাঁর দলে। তাঁর হাত ধরে ভারতীয় ক্রিকেটকে সমৃদ্ধ করেছেন যুবরাজ সিং, হরভজন সিং, মহম্মদ কাইফ, এমএস ধোনি, আশিস নেহেরা, জাহির খানের মতো বড় নাম। যাঁরা দীর্ঘদিন ভারতের হয়ে সাফল্য এনে দিয়েছেন।

সৌরভ ভারতকে প্রথম নেতৃত্ব দেন ২০০০-এর আইসিসি নকআউট ট্রফিতে। ২০০১-এ বর্ডার গাভাস্কার ট্রফিতে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে দেয় ভারত ঘরের মাঠে। চোখে চোখ রেখে লনাই করে গোটা দল। ইডেনের সেই টেস্ট তো আজও ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে।

সেই ম্যাচে ফনো-অন করে জয় তুলে নিয়েছিল ভারত। ভিভিএস লক্ষ্মণ ও রাহুল দ্রাবিড় ব্যাট হাতে ইতিহাস রচনা করেছিলেন। এর পর বল হাতে হ্যাটট্রিক করে ভারতকে জয় এনে দিয়েছিলেন হরভজন সিং।

স্টিভ ওয়ার মতো ক্রিকেটারকে টসের জন্য মাঠে অপেক্ষা করিয়ে তাঁদের দূর্ব্যবহারের জবাব দিয়েছিলেন সৌরভ।

সৌরভের অধিনায়কত্বের সব থেকে বড় ছবি অবশ্য লর্ডসের ব্যালকনিতে জার্সি ওড়ানো। ২০০২-এর ন্যাটওয়েস্ট ট্রফিতে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে দেওয়ার মুহূর্ত আজও ভারতীয় ক্রিকেটের আগ্রাসনের ছবি নতুন করে তুলে ধরে। যুবরাজ ও কাইফের সেই দাঁতে দাঁত চাপা লড়াই দাদার নেতৃত্বে আজও মনে করে উচ্ছ্বসিত হন ক্রিকেটপ্রেমীরা। সেটাও কিন্তু ছিল দাদার জবাব এক ইংল্যান্ড ক্রিকেটারকে কারণ তিনিও ভারতে এসে জিতে জার্সি খুলে উড়িয়েছিলেন।

এর পর এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ২০০৩ বিশ্বকাপ। ভারতকে ফাইনালে তুলেছিলেন সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়। ১৯৮৩-র পর এই প্রথম ফাইনালে পৌঁছেছিল ভারত। কিন্তু ফাইনালে অস্ট্রেলিয়ার কাছে হেরে রানার্স হয়ে থাকতে হয়।

এর পর ২০০৪-এ পাকিস্তানের মাটিতে প্রথম টেস্ট সিরিজ জয় তাঁরই নেতৃত্বে।২০০৫-০৬-এ দল থেকে বাদ পড়তে হয় এই সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়কে। যে গ্রেগ চ্যাপেলকে তাঁরই উপদেশ শুনে অধিনায়ক করে নিয়ে আসা হয়েছিল সেই ভারতীয় দলে সৌরভের থাকা কঠিন করে তুলেছিলেন।

কিন্তু সৌরভ তো সৌরভই, জীবনের লড়াইটা খুব ভালো করে জানতেন। তাই লড়াই করে ফিরে আসেন ভারতীয় দলে।

২০০৮-এ আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নেন নাগপুরে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে টেস্ট ম্যাচ খেলে। এর পর আইপিএল-এ খেলা চালিয়ে যান তিনি। সেখানেও নানা প্রতিবন্ধকতার শিকার হতে হয়েছে তাঁকে। একটা সময় নিজের কলকাতা দলও তাঁকে ছাড়তে হয়। ২০১২তে শেষ পর্যন্ত সব ধরনের ক্রিকেট থেকে অবসর নেন তিনি।

সৌরভ ভারতের হয়ে ১১৩টি টেস্ট ও ৩১১টি ওডিআই খেলেন। সব ফর্ম্যাট মিলে তিনি ১৮,৫৭৫ রান করেছেন। ভারতকে নেতৃত্ব দিয়েছেন ১৯৫টি ম্যাচে তার মধ্যে ৯৭টি ম্যাচ জিতিয়েছেন।

এর পর তিনি বেঙ্গল ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি হন এবং গত অক্টোবরে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতির দায়িত্ব তুলে নেন।

তাঁর দায়িত্বেই ভারতের মাটিতে এবং ভারতীয় দল প্রথম দিন-রাতের টেস্ট খেলে। ইডেনে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সেই টেস্ট জিতে নেয় ভারত।

Related Articles

Back to top button
Close