fbpx
পশ্চিমবঙ্গবাংলাদেশব্লগহেডলাইন

দাড়িভিট: হিমশৈলের চূড়ামাত্র

শ্রীপর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায়: ঢাকায় সাভারে শহিদ স্মৃতিফলকে লেখা ভাষা শহিদদের, অর্থাৎ ১৯৫২-র ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা শহরে পুলিশের গুলিতে মারা যাওয়া বাংলাভাষীদের নাম। সেই তালিকায় ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্কহীন কিন্তু গুলিতে মৃত রিকশাওয়ালা নামও জ্বলজ্বল করছে। কিন্তু কোথাও কোনও স্তম্ভ, কোনও ফলক, কোনও পুস্তিকায় একটিও হিন্দু নাম চোখে পড়ল না। অথচ বাংলা ভাষার হয়ে প্রথম দাবি ও ভাষা আন্দোলনের পথ ধরে মুক্তিযুদ্ধে মুজিবকে সাহায্য করার অপরাধে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে সপুত্রক পাকিস্তানি সেনার নৃশংস অত্যাচার ভোগ করে দেহত্যাগ করতে হয়েছিল। এরকম আরও অনেক ধীরেন্দ্রনাথ ও অসংখ্য হিন্দুর রক্তের বিনিময়ে বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনে সাফল্য ও মুক্তিযুদ্ধে জয়লাভ। কিন্তু আন্তর্জাতিক মহলে পুরো পরিক্রমার অংশ বিশেষের যথোচিত বিজ্ঞাপনের ফলে বিশ্বময় বাংলাভাষা আন্দোলনকারী তথা সমগ্র বাঙালী জাতিসত্ত্বার প্রতিনিধিত্ব করছে বাংলায় বসবাসকারী আরব্য সংস্কৃতির বাহকরা এবং বাংলাভাষা হিসাবে পরিচিতি পেয়েছে আরবি-ফারসী-বাংলা মিশ্রিত একটি ভেজাল ভাষা। সংঘাতটা শুরু হয়েছিল অবিভক্ত পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসাবে উর্দুর পাশাপাশি বাংলাভাষারও স্বীকৃতির দাবি থেকে।

বাংলা উর্দু দ্বৈরথকে কেন্দ্র করেই ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮ এই পশ্চিমবঙ্গের বুকেও গুলি চলে। কিন্তু উত্তর দিনাজপুর জেলার দাড়িভিট হাই স্কুলের ঘটনাটিকে ভাষা সংঘাত নয়, রাজনৈতিক সুযোগসন্ধান হিসাবে দেখানো হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন বাংলা ও বিজ্ঞান বিভাগের শূন্যপদে শিক্ষক নিয়োগ বন্ধ থাকার ফলে ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবকদের অসন্তোষ ছিল। হয়তো পূর্ববঙ্গের মতো মাতৃভাষা বাংলার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়নি, কিন্তু বাংলা, বিজ্ঞান, গণিতের মতো বিষয়ে দীর্ঘদিন শূন্য পদ ফেলে রেখে যদি উর্দু ও সংস্কৃত যা পঠনপাঠনের জন্য কোনও ছাত্রছাত্রীই নেই, এমন দুটো বিষয়ের শিক্ষক নিযুক্ত হয়, তাহলে ব্যাপারটা প্রহসন ছাড়া আর কী মনে হতে পারে?

স্বভাবতই ছাত্রছাত্রী, অভিভাবক থেকে সমস্ত গ্রামবাসীর ধৈর্যচ্যুতি ঘটে। স্কুলের সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে বাংলা ও বিজ্ঞান শিক্ষকের দাবি জানিয়ে এবং উর্দু শিক্ষকের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে। সঙ্গে অবশ্য শিক্ষার্থীহীন বিষয় সংস্কৃতর জন্যও শিক্ষক আনা হয়েছিল, তবে সেটা সম্ভবত উর্দু দ্বারা উন্মোচিত সাম্প্রদায়িক অভিপ্রায়টিকে খানিকটা আচ্ছাদিত করতে। কিন্তু পড়ুয়াদের প্রয়োজন তাতেও মেটে না। সংস্কৃত শিক্ষক তৌরং প্রধান ও উর্দু শিক্ষক সানাউল্লা রেশমানির নিয়োগ নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরে চলা অসন্তোষ দমন করতে প্রধান শিক্ষক অভিজিত কুণ্ডু ও সহকারি প্রধান শিক্ষক নুরুল হুদা ১৭ সেপ্টেম্বর পুলিশ ডাকেন। এরপর বিক্ষোভ আরও বেড়ে যায়, যার মধ্যে কিছু বহিরাগতও ঢুকে পড়ে প্রতিবাদ কর্মসূচি বেশ আক্রমণাত্মক চেহারা নেয় বলে অভিযোগ। তার জেরেই প্রশাসনের প্রথমে লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস, রবার বুলেট ও শেষে মারণ গুলি চালনা এবং দুজন প্রাক্তনীর মৃত্যু। পুলিশের গুলিতে ঘটনাস্থলেই নিহত হয় রাজেশ সরকার। স্কুলের গেটের সামনেই বাড়ি ও লাগোয়া পারিবারিক মিষ্টির দোকানে থাকাকালে পুলিশের ছোঁড়া গুলিতে বিদ্ধ হয়ে পরে হাসপাতালে মারা যায় বাড়ির একমাত্র রোজগেরে ছেলে তাপস বর্মণও। দুজনেই সেই দাড়িভিট উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়টির প্রাক্তন ছাত্র।

পুলিশের দাবি গুলি তারা নয়, চালিয়েছিল বিহার ঝাড়খণ্ড থেকে আসা বহিরাগতরা। আর পরিবার ও প্রত্যক্ষদর্শীরা লক্ষ্য করেছে, গুলি ছুটে এসেছিল নবনিযুক্ত শিক্ষকদের সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় পুলিশের জীপ থেকেই। রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য, উর্দু শিক্ষক নিয়োগ তাঁর অজানা, কিন্তু প্রাক্তন ছাত্ররা স্কুলের সামনে কেন গিয়েছিল সেটা জানা দরকার। প্রধান ও সহকারি প্রধান শিক্ষককে সাময়িকভাবে বরখাস্ত হলেও বলাবাহুল্য এহেন অবস্থায় রাজ্য সরকার নিযুক্ত সিআইডি তদন্তের আশ্বাসে পরিবার ও প্রতিবেশীরা ভরসা রাখতে না পারছে না। সিবিআই তদন্তের দাবিতে দেহ দুটি দাহ না করে সমাধিস্থ করে গ্রামবাসীরা রীতিমতো পাহারা দিয়ে রাখে।

প্রসঙ্গত, বহিরাগত তত্ত্ব মেনে নিলেও পাথর ছোঁড়া কাদের পরিচিত ক্ষোভপ্রকাশভঙ্গী, সেটাও মাথায় রাখা উচিৎ। সুতরাং সতাসত্য জানতে কেন্দ্রীয় সংস্থা দ্বারা তদন্তের দাবি যুক্তিগ্রাহ্য। কিন্তু রাজ্য সরকার মানতে নারাজ।
অনেকের অভিযোগ গেরুয়া শিবির সামান্য একটা স্থানীয় ঘটনাকে ‘বাংলা-উর্দু’ দ্বন্দ্বের রূপ দিয়ে ক্রমশ প্রাদেশিক আন্দোলনের চেহারা দিতে চাইছে। কিন্তু শুধুই কি তাই? ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে শাসকদলের অতি সক্রিয়তাই কি বিরোধীপক্ষ থেকে সাধারণ মানুষের মনেও প্রশ্ন উস্কে দেয়নি? লাশদুটি যেখানে এখনও সৎকার না হয়ে সুবিচারের আশায় মাটির নীচে পচছে, সেখানে আজও রাজ্য সরকারের কাছ থেকে সিবিআই তদন্তের অনুমতি মিলল না কেন? ঘটনার জেরে বন্ধ থাকা স্কুলটি অবশ্য পুনরায় খুলেছে। যেহেতু এই রাজ্যে এখনও সরাসরি বাংলা নিষিদ্ধ করে অন্য কোনও ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার নজির নেই, তাই হয়তো আমাদের ঘটনাটিকে ভাষা আন্দোলন হিসাবে শনাক্ত করতে অসুবিধা হচ্ছে। কিন্তু বিগত দুই দশকের কিছু পরিসংখ্যান কী ইঙ্গিত দিচ্ছে দেখা যাক।

আরও পড়ুন: ২০১৮’র পর ২০২০.. হোয়াইট হাউসে এল বিষ মাখানো চিঠি! সংস্পর্শে এলে ৭২ ঘন্টার মধ্যে মৃত্যু নিশ্চিত

১৯৯২ সালে পূর্বতন পশ্চিম দিনাজপুর জেলার উত্তর অংশ নিয়ে উত্তর দিনাজপুর জেলা গঠিত হয় যার পূর্ব সীমানা জুড়ে বাংলাদেশ। ১৯৮১-র জনগণনা অনুযায়ী পশ্চিম দিনাজপুর জেলার অধুনা উত্তর দিনাজপুর অংশে হিন্দু জনসংখ্যা ছিল ৬৩.২৬% ও মুসলমান ৩৫.৭৯%। প্রয়াত জ্যোতি বসুর মুখ্যমন্ত্রীত্বকালে সম্প্রদায়বিশেষের অনুপ্রবেশে প্লাবিত হয়ে এই জেলায় একদশকের মধ্যে ১৯৯১ সালে হিন্দু ও মুসলিম জনসংখ্যা যথাক্রমে কমে ও বেড়ে দাঁড়ায় ৫৪.২% ও ৪৫.৩৫%।

পরবর্তী পরিবর্তনের জোয়ার আসামাত্র ২০১১ সালেই উত্তর দিনাজপুর মোটামুটি মুসলিমপ্রধান জেলা হয়ে যায়। কিন্তু উত্তর দিনাজপুরের শহরগুলিতে হিন্দু জনসংখ্যার অনুপাত ভদ্রস্থ হলেও গ্রামাঞ্চলে যথেষ্ট উদ্বেগজনক। ইসলামপুর মহকুমা শহরে হিন্দু জনসংখ্যা ২০১১-র আদমসুমারি অনুযায়ী ৬৭% হলেও ইসলামপুর মহকুমার গ্রামাঞ্চলে হিন্দু জনসংখ্যা ছিল মাত্র ২৭%। দাড়িভিট ইসলামপুর মহকুমার অধীনে কিছুটা শহুরে ছোঁয়াচ লাগা একটি গ্রাম যেখানকার বিতর্কিত স্কুল থেকে বাংলাদেশ সীমান্ত মাত্র ২ কিলোমিটার। সমগ্র উত্তর দিনাজপুরে জনবিন্যাস পরিবর্তনের যে ছবি ভারত সরকারের জনগণনায় প্রতিফলিত তা এই রূপ: হিন্দু জনসংখ্যার শতাংশ অনুপাত ১৯৮১, ১৯৯১, ২০০১ ও ২০১১ সালে যথাক্রমে ৬৩.২৬, ৫৪.২০, ৫১.৭২ ও ৪৯.৩১, যেখানে মুসলিম জনসংখ্যার শতাংশ অনুপাত যথাক্রমে ৩৫.৭৯, ৪৫.৩৫, ৪৭.৩৬ ও ৪৯.৯২। পরিবর্তনের জোয়ারে ২০১৮-য় হিন্দুরা যে শহরে ও গ্রামে আরও সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক হয়ে গেছে তা বলাই বাহুল্য, যদিও সংখ্যালঘুর আইনি তকমা ও সুবিধা অন্য পক্ষেরই দখলে।

২০১১ সাল থেকে অদ্যাবধি দেখেছি, জামাত-এ-উলেমা-এ-হিন্দ আয়োজিত জনসভার নামে ময়দানে চালানো সন্ত্রাসে পুলিসকে আক্রমণ করা হোক বা ধূলাগড়, উস্তি, ক্যানিং বসিরহাটসহ অসংখ্য সাম্প্রদায়িক হামলা হোক বা ভাঙড়ে গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের জেরে পুলিশের গাড়ি জলে ফেলা বা জ্বালানো, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের বিরোধিতার নামে রাজ্যজুড়ে চলা ধ্বংসলীলা হোক বা কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে লকডাউন চলাকালীন আইনরক্ষকের পিঠে জিমনাস্টিক পদাঘাত – পুলিশ টেবিলের তলায় লুকিয়েছে, লাথি খেয়ে পদাঘাতীর পরিবারে সম্বৎসরের রেশন পৌঁছে দিয়ে আলিঙ্গন করে সম্প্রীতি মিছিলে হেঁটেছে, কিন্তু গুলি চালায়নি। গুলি চালাতে হল বিষয় বহির্ভূত উর্দু ও সংস্কৃতর বদলে বিদ্যালয়ে শূন্যপদে সংশ্লিষ্ট বিষয় অর্থাৎ বিজ্ঞান ও বাংলার শিক্ষক চেয়ে আন্দোলনরত ছাত্রদের ওপর!

আরও পড়ুন: স্বস্তি, করোনায় সুস্থতার নিরিখে রেকর্ড গড়ল ভারত

দাড়িভিটে নিহত দুই ছাত্র হয়তো উর্দু বিরোধী কোনও সংগঠিত কর্মসূচিতে যুক্ত ছিল না। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের ইসলামিকরণের হাত ধরে বাংলাভাষার সর্বনাশের যে ব্লুপ্রিন্ট রচিত হচ্ছে, তার বিরুদ্ধে পুঞ্জীভূত গণবিক্ষোভ দমন করার সরকারি অপচেষ্টার যূপকাষ্ঠেই যে রাজেশ, তাপসরা বলি হয়েছে, তা নিয়ে দ্বিমত থাকতে পারে না। বস্তুত আমরা প্রত্যেকেই সংস্কৃত বংশোদ্ভূদ পরিচয় থেকে অনাথ করে বাংলাভাষার আরবীকরণ প্রত্যক্ষ করছি। করেও নির্বিকার, বা বড়োজোর সামাজিক মাধ্যমে রঙ্গ-রসিকতা বিনিময় করেই নিজেদের দায়িত্ব সারছি। দাড়িভিট কিন্তু হিমশৈলের চূড়া। ‘পশ্চিমবঙ্গের জন্য’ ও আরও দু একটি সংগঠন সেই রাক্ষুসে হিমবাহটাকে অনেকটাই শনাক্ত করেছে। কিন্তু অবিলম্বে নিজেদের অস্তিত্ব, ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষার লড়াইয়ে সম্মিলিতভাবে ঝাঁপাতে না পারলে বাঙালী হিন্দুর সমূলে অবলুপ্তি শুধু সময়ের অপেক্ষা।

(মতামত নিজস্ব)

Related Articles

Back to top button
Close