fbpx
অন্যান্যঅফবিটহেডলাইন

ঢ্যাং কুরাকুর ঢাকের বাদ্যি

মনীষা ভট্টাচার্য: টেবিলের ওপর খোলা রং করার খাতা। খাতায় এক সিংহের ছবি। ডোডো ছবিটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে। পাশের বাড়িতে কেউ বেসুরে গাইছে ‘আয়রে ছুটে আয় পুজোর গন্ধ এসেছে, ঢ্যাং কুরাকুর ঢ্যাং কুরাকুর বাদ্যি বেজেছে…’। ডোডো ভাবছে ঢ্যাং কুরাকুর বাদ্যিটা কি? সেও সদ্য শিখেছে ‘আশ্বিনের মাঝামাঝি উঠিল বাজনা বাজি…’ চেয়ার ছেড়ে উঠে ব্যালকনিতে এসে ডোডো দাদুকে জিজ্ঞেস করল, ‘দাদু আশ্বিন মাসে কিসের বাজনা বাজে?’ ছয় বছরের ডোডোর কাছে আশ্বিনের বাজনা ঠিক কী, তা জানা না থাকলেও, আমরা জানি ওই মাসে বাজে ঢাক, কারণ দেবীদুর্গার আগমনের বার্তা পৌঁছে দেয় ঢাকের বাদ্যি। এই ঢাক তৈরি হয় কী করে? কী কী লাগে ঢাক তৈরিতে? জানি কি আমরা এইসব?

কলকাতা শহর ছেড়ে বেড়িয়ে মুর্শিদাবাদ, বাঁকুড়া এইসব জেলায় গেলে ঢাক তৈরির নানা কথা জানা যাবে। ওইসব জেলায় বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে কান পাতলেই শোনা যাবে ঢাকের আওয়াজ। সারাদিন অন্যান্য কাজের পর সন্ধের সময় গ্রামের অনেকে মিলে ঢাকের বাজনার রিহার্সালে বসেন। শুনে অবাক লাগছে?  হ্যাঁ, ঢাকের বাদ্যিরও রিহার্সাল হয়, ঢাকের বাদ্যিরও একটা স্কেল আছে। কিন্তু এই ঢাক তৈরি হয় কেমন করে?

তৈরি হচ্ছে ঢাক।

আমগাছের গুঁড়ি থেকে তৈরি হয় ঢাকের খোল। তারপর তাকে ঘষে ঘষে মসৃণ করা হয়। এই কাঠে যাতে  ঘুণ না ধরে তার জন্য গোমূত্র, তেল, লঙ্কা, গোলমরিচ প্রভৃতি জিনিস ভালো করে মাখিয়ে নেওয়া হয়। বাঁশের ছিলা কেটে, ধীরে ধীরে বাঁকিয়ে রিং তৈরি করা হয়, যাকে বলে চাক। এরপর এই চাকে চামড়া লাগানোর পালা। ছাগচর্মের ব্যবহারে এই কাজ হয়। ছাগচামড়াকে প্রথমে শুকিয়ে নেওয়া হয়, এই শুকনো চামড়াকে বলে তালা। এই তালাকে গোল করে কেটে নেওয়া হয়। তারপর সেই গোল করে কাটা চামড়ার ওপর জল দিয়ে তাকে নিংড়ে নেওয়া হয় নরম করার জন্য। তারপর শুরু হয় টানটান করে চাক বাঁধার কাজ। বাঁধা শেষ করে চামড়াকে উপযুক্ত করতে এরপর চামড়ার ওপর ঝামা ঘষা হয়। সব শেষে দড়ি দিয়ে চাকের সেই টানকে আরও শক্ত করে শুকোতে দেওয়া হয়।

এবার শুকিয়ে যাওয়া সেই চাক ঢাকের খোলে লাগানোর পালা। গ্রাম্য ভাষায় একে বলে ঢাক ছাওয়া। যে গ্রামেই ঢাক বানানো হয়, সেখানেই এই ঢাক ছাওয়ার আগে লক্ষ্মীর পা এঁকে, ধুপ-ধুনো, গঙ্গা জল দিয়ে জায়গাটিকে পবিত্র করে কাজটি শুরু হয়। এটাই নাকি নিয়ম, বিশ্বাস। ঢাক ছাওয়া মানে ঢাকের খোলের ওপর চাক লাগানো। দড়ি, বেল্ট এই সব দিয়ে খুব শক্ত করে ঢাক ছাওয়া হয়। আমরা যেন তবলিয়াদের সঠিক স্কেলে তবলা বাঁধতে দেখি হাতুড়ি মেড়ে মেড়ে, তেমনই এই ঢাক ছাওয়ার সময়ও লক্ষ রাখতে হয় ঢাকের স্কেলের। এ এক আশ্চর্য কেরামতি। এখানেই শেষ নয়, ঢাক বাঁধা শেষ হলে, ঢাকের যেদিকটা  বাজানো হয়না সেদিকে ভেলেন্দা গাছের বীজ বেটে লাগিয়ে দেওয়া হয়, এতে নাকি স্বর আরও গম্ভীর হয়। এইভাবে একটা ঢাক তৈরি করতে প্রায় দু’মাস লাগে। তৈরি সম্পূর্ণ হলে তাকে জরির কাপড়ে, পালকের ঝালরে সাজানো হয়।

মহড়া দিচ্ছেন শিল্পী গোকূলচন্দ্র দাস ও তাঁর সহ-শিল্পীবৃন্দ।

দুর্গাপুজোতে প্রায় সব মণ্ডপেই একের অধিক ঢাকিদের দেখা যায়। তাই পুজোর আগে ঢাকিদের মধ্যে বসে মহড়া। কোন ছন্দে, কোন তালে কী বাজাবেন তারা, তারই চলে জল্পনা-কল্পনা। আজকের প্রজন্মের আমরা, অনেকেই জানি না, মায়ের মণ্ডপে নিয়ে আসা, মায়ের বরণ, মায়ের বিসর্জন এইসব আলাদা আলাদা আচারে আলাদা আলাদা বোল। প্রতিমা নিয়ে আসার বোলকে বলে মভৈরা, এটি সাধারণত চার মাত্রার হয়, আবার পনেরো মাত্রার পঞ্চম শেয়ারী হল প্রতিমা বরণের বোল। তাছাড়া বিসর্জনের বোল তো আটমাত্রার হয়। গ্রামের নতুন প্রজন্মও এই প্রফেশনে আসছেন, ডাক পাচ্ছেন আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, হাওয়াই দীপপুঞ্জ থেকে। সারা বছর অভাবকে সহ্য করে থাকা যেন বছরের এই মাস দেড়েক জন্য। বিপদে আপদে এই সময়ের রোজগার করা টাকাই যেন একটু সুরাহার পথ দেখায়।

নির্দিষ্ট ছন্দে বাজাচ্ছেন শিল্পীরা।

‘ঢাকের ছন্দ যায় বেজে যায় আগমনির সুরে, প্রবাস ছেড়ে বিবাগি মন আসে যে ঘরে ফিরে’-ঢাকিদের জীবনে এই কথারই যেন উল্টোপুরাণ। কিন্তু এবছর কি হবে? যদিও মহড়ায় কোনও খামতি নেই। তবে বায়না এসেছে খুব কম। পুজোর বাজেট কম তাই অনেক জায়গায় ডিগিটাল ঢাক বাজবে, কোথাও পুজো বন্ধ আছে, বাইরের অনেক পুজো বাতিল হয়েছে। তাই অনেকেরই বায়না হয়নি। কোনও কোনও ঢাকির আবার করোনার কারণে বায়না না হলেও নির্দিষ্ট পারিশ্রমিক পেয়েছেন। তবু অনেকেই এখনও আশা করছেন ডাক আসবে। সত্যিকারের ঢাকে কাঠি না পড়লে পুজোর গন্ধটা যেন ঠিক নাকে লাগে না। গলি ছেড়ে, সড়ক পেরিয়ে, রাজপথের উদ্দেশ্যে ঢাকিদের এই যাত্রা আর কদিনের মধ্যেই শুরু হয়ে যাবে। বলো দুর্গামাই কী জয়।

Related Articles

Back to top button
Close