fbpx
কলকাতাগুরুত্বপূর্ণপশ্চিমবঙ্গব্লগহেডলাইন

দিদি, বিনা খরচের চিকিৎসা কোথায়? সাধারণ মানুষ যে ধুঁকে মরছেন প্রতিদিন

শংকর দত্ত, কলকাতা: এই তো কদিন আগের ঘটনা। প্রধানমন্ত্রী যেদিন চার রাজ্যের জন্য মেশিন দিলেন কোভিড টেস্টের জন্য। সেদিন আমাদের রাজ্যকেও দিলেন। ভার্চুয়াল উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আপনিও উপস্থিত ছিলেন সেদিন। প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে বললেন, ‘আপনি গোটা বিশ্বকে বলুন, একমাত্র পশ্চিমবঙ্গে বিনা খরচে কোভিড চিকিৎসা হয়।’

কিন্তু দিদি, আদৌ বাস্তবে কি তাই হচ্ছে? বরং উল্টোটাই ঘটছে। যাদের চ্যানেল আছে, সোর্স আছে তারা চেষ্টা করলে লোকাল কাউন্সিলর, নেতা-মন্ত্রী ঠিকঠাক ধরতে পারলে হয়তো কোথাও কোনও সরকারি হাসপাতালে কোনরকমে মাথা গোজার ঠাঁই পাচ্ছেন। কিন্তু সবার ক্ষেত্রেই কী তা ঘটছে? আমি জানি ও এটা মানি প্রতি মুহূর্তে অপ্রতুল ক্ষমতার মধ্যে দিয়েও আপনি অস্বাভাবিক লড়াই করছেন মানুষকে বাঁচাতে। কিন্তু বেসরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থায় একটু লাগাম টানুন! সরকারি হাসপাতালে সহ জেলা স্তরে যে সব বেসরকারি হাসপাতালকে কোভিড হাসপকতাল করেছেন বা অধিগ্রহণ করেছেন মানুষের পরিষেবার জন্য সেটা কিন্তু এখনও যথেষ্ট নয়। তথ্য ও তত্ত্ব বিশ্লেষণে আমি যাচ্ছি না। আমি জানি আপনার প্রচেষ্টার অন্ত নেই। আপনার সরকারের মন্ত্রী-আমলাদের উদ্বিগ্নতার অভাব নেই। কিন্তু বাস্তবটা একদমই মিলছে না দিদি।

ঘটনা:১

বছর ২২-এর ছেলেটির বাড়ি উত্তর চব্বিশ পরগনার বারাসত। হঠাৎ জ্বর, শুরু হল শ্বাসকষ্ট। পরিবারের লোকজন দিশাহীন। কী করবে ভেবে না পেয়ে স্থানীয় একটি কোভিড হাসপাতলে তাকে নিয়ে গেল। যথারীতি কোভিড পজেটিভ। কিন্তু হাসপাতালে তাঁর ঠাঁই হল না। বাড়ির লোকজন মহা চিন্তায়। এলাকার প্রভাবশালী লোকজন ধরে অ্যাম্বুলেন্সে নিয়ে ছুটল কলকাতার আরজিকরে। সেখানেও জায়গা না মেলায় দৌড়ালো মেডিক্যাল কলেজে। তারা আবার রেফার করল বারাসতের সেই হাসপাতালেই। মাঝে কয়েকটা দিন ছুটোছুটি, দৌড়াদৌড়ি। গাদা গুচ্ছের অ্যাম্বুলেন্সে ভাড়ার গচ্ছা, টেনশন, নিদারুণ দুর্ভোগ। যদিও শেষ অব্দি চিকিৎসা ঠিকঠাক পাওয়ার ফলে ছেলেটি প্রাণে বেঁচে গেল এ যাত্রায়। কিন্তু এই ভোগান্তি, চাপ টেনশন কিংবা গাদা গাদা খরচ! এসব করতে গিয়েই তার অবসরপ্রাপ্ত বাবার অবস্থা কাহিল। মা টেনশনে নিজেই বিছানায়।

ঘটনা: ২

কলকতার একটি নামী ব্যবসায়ীর একমাত্র কন্যা। কদিন ধরেই গলায় ব্যথা। ডাক্তারের ফোনে পরামর্শ নিতে তিনি সোজা নির্দেশ দিলেন কোনও ভালো নার্সিং হোমে গিয়ে লালারস পরীক্ষা করতে। টাকার অভাব নেই। বাড়িতে নিজেদের গাড়ি নিয়েই ছুটলেন বাইপাসের এক নাম করা বেসরকারি হাসপাতালে।সেখানে গিয়েও ভয়। দীর্ঘক্ষণ বসে থেকে অবশেষে তার লালারস সংগ্রহ হল। তবে ঘটনা যেটা অবাক করলো তাঁকে সেটা অভাবনীয়। কোভিড পজেটিভ হলে সেখানে চিকিৎসা করতে হলে তার বাজেট কেমন হবে? এটা জানতে চাইতেই ওই বেসরকারি হাসপাতালের কর্তৃপক্ষ তুরন্থ জানায়, মিনিমাম তিন লক্ষ টাকা ডিপোজিট দিয়ে ভর্তি হতে হবে। সর্বমোট বিল জানা যাবে ছাড়া পাওয়ার পরই। শেষমেশ ওই মহিলার কোভিড পজেটিভ ধরা পরে। কিছুদিন পর তিনি ভর্তি হন ওই হাসপাতালেই। চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরেন ১২ লক্ষ টাকা খরচ করে। প্রশ্ন হল তিনি বড়লোক ব্যবসায়ীর কন্যা। স্বাভাবিক কারণেই টাকা খরচ নিয়ে তাঁরা চিন্তা করেননি। কিন্তু এটাই যদি এক অসহায় পিতার যুবতী কন্যা হতেন। যিনি সরকারি হাসপাতালে ভর্তির সুযোগটুকুও পেলেন না হয়তো কোনও রকম যোগাযোগ না থাকার কারণে। তিনি এই বেসরকারি হাসপাতালে কোনও সুযোগ পেতেন কি? অথচ মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশ আছে এই অবস্থায় কেউ কোনও রোগী ফেরত পাঠাতে পারবেন না। কিন্তু বাস্তবে তা কি ঘটছে?

ঘটনা: ৩

টিভি চ্যানেলের সাংবাদিক সত্যেন মন্ডল।এই করোনা বাজারে বাধ্য হয়েই কদিন ধরে অফিস আর ঘর করেছেন। গত কদিন জিভে স্বাদ পাচ্ছেন না। গন্ধ বুঝতে পারছেন না কোনও কিছুরই। এদিকে হালকা জ্বর, সঙ্গে গা-হাত ব্যথা। অফিসে জানতেই কর্তৃপক্ষ সোজা জানিয়ে দেয় ভালো জায়গা থেকে কোভিড টেস্ট করে নেগেটিভ হলেই তবে অফিসে এসো। বাধ্য হয়েই সচেতন নাগরিকের প্রমাণ করাতে মরিয়া সত্যেন বাবু। টেস্ট করলেন, এবং অবশ্যই পজিটিভ রিপোর্ট। কী করবেন? মুশকিল হল তিনি সরকার বিরোধী একটি সংবাদ মাধ্যমে কাজ করেন। স্বাভাবিকভাবেই সরকারি স্তরে নেতা-আমলা মন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর সখ্যতা কম। তাই চেষ্টা করেও ভালো কোনও জায়গায় তিনি ভর্তি হতে পারেননি। তিনি বাড়িতেই আছেন। অন্য আর একটি ঘরে। পরিবারের লোকজনের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রেখেই। তবে তাঁর পক্ষে সাপে বর একটাই। ভালো জায়গা থেকে টেস্ট করবার কারণে তাঁর তথ্য স্বাস্থ্য দফতরে নথিভুক্ত হয়। স্বাস্থ্য দফতর নিয়মিত টেলি-চিকিৎসা করে তাঁকে সাহায্য করছে। তাঁর মনের জোর বাড়াচ্ছে। অসুধপত্র, ইমিউনিটি পাওয়ার যোগানের ব্যাপারে পরামর্শ দিচ্ছে। তাঁর সুবিধা একটাই তিনি যে ফ্ল্যাটে থাকেন, সেখানে তিনজনের সংসারে একটি ঘরে তাঁর আলাদা বাথরুম আছে। তিনি সরকারি নিয়ম মেনে নিজের ঘরে নিজেকে বন্দি রেখেই সুস্থ আছেন। মুশকিল হল যে মানুষটির বাড়িতে দুটি বাথরুম নেই? যে মানুষটি একটি বড় ঘর বা বারান্দা নিয়ে কোনও ভাড়া বাড়িতে ৫ জনের পরিবারে থাকেন। তিনি পয়সার অভাবে বা ধরাধরির অভাবে কোথাও ভর্তি হতেই পারলেন না। বা ভর্তি হতে হতেই তাঁর ৫টা দিন চলে গেল। এই অবস্থায় তিনি টেলি-চিকিৎসার সুযোগটা নেবেন কীভাবে? দ্বিতীয়ত কোভিড পজেটিভ জানলে ওই বাড়িওয়ালা বা পাড়া প্রতিবেশী তাঁকে বা তাঁর পরিবারের লোকজনকে সুষ্ঠুভাবে থাকতে দেবেন তো? যদি না দেন তিনি কোথায় অভিযোগ করবেন? প্রশাসনকে পাশে পাওয়া যাবে তো সময় মতো? নাকি তিনি ‘দিদিকে বলো’ তে ফোন করেও কোনও সঠিক সদুত্তর পাবেন না!!

ঘটনা: ৪

পেশায় শিক্ষিকা বছর চল্লিশের সোমা জানা। থাকেন দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার সোনারপুরে। স্বামী নামী কোম্পানির মার্কেটিং ম্যানেজার। বেশিরভাগ সময়ই বাইরে থাকেন। লকডাউনের কারণে এমনিতে স্কুল বন্ধ। তাই এই শিক্ষিকা বাড়িতেই থাকেন ১০ বছরের সন্তানকে নিয়ে। সঙ্গে আছেন বৃদ্ধা অসুস্থ মা ও এক পিসি। যাদের মাঝে মধ্যেই গুরুতর অবস্থা হয়ে যায়। ছুটতে হয় হাসপাতালে। নিজেও কিডনির সমস্যায় ভুগছেন। কিন্তু মুশকিলে পরে যান যখন বাড়ির কেউ দুম করে অসুস্থ হয়ে যান। গতো ৬ মাসের লকডাউনের মধ্যেই বার কয়েক হাসপাতাল ঘর করতে হয়েছে তাঁকে। বেশিরভাগ সমযেই যেতে হয়েছে কাছাকাছি বেসরকারি নার্সিং হোমে। যেখানে সাধারণ চিকিৎসাতেই মাত্র দুই তিন দিনে গচ্ছা দিতে হয়েছে এক একবারে ৩০-৪০ হাজার টাকা করে। তার উদ্বিগ্নতা অন্য জায়গায়। তিনি বলেন, ‘দেখুন সরকারি চাকরি করি বলে অনেকেই মনে করেন আমাদের অনেক টাকা। অনেকেই ব্যঙ্গ করে বলেন, আমরা বসে বসে মাইনে নিই। হ্যাঁ হয়তো এই লকডাউনের মধ্যে আমাদের স্কুল যেতে হচ্ছে না। কিন্তু সারা বছর কাজটা তো আমরাই করি। অথচ দেখুন আমাদের কিন্তু বাড়তি কোনও সুবিধা নেই। একা থাকি বাচ্চা মেয়েকে ও দুজন অসুস্থ মানুষকে নিয়ে। তার মধ্যেই যখন বিপদ ঘনিয়ে আসে মনে হয় জীবনটা শেষ হয়ে গেল। নার্সিং হোমের নানান বাহানা। প্রচুর খরচ। তাও হয়তো মেনে নিলাম অনেক কষ্ট করেই। সমস্যা হল হাতেই কাছে কোনও লোক পাওয়া যায় না। বয়স্ক মানুষরা এখন অন্য কারণে অসুস্থ হলেও পাড়া প্রতিবেশীরা ভাবছেন কোভিড আক্রান্ত। পেশেন্টকে গাড়িতে বা অ্যাম্বুলেন্সে তোলবারও লোক পাওয়া যায় না পাশে। এই অবস্থায় সরকার যদি স্থানীয় ভাবে একটা হেল্প লাইন চালু করতো বা প্রশাসনিকভাবে আমাদের সাহায্য করতে হত বাড়িয়ে দিতো। ভীষণ উপকৃত হতাম। সোমাদেবী স্বচ্ছল হলেও একটা অন্য চাপা টেনশনে জীবন কাটাচ্ছেন। কে আসবেন তাঁর পাশে? দিদিকে বলোতে ফোন করে সাহায্য পেতে পারবেন কি মহা বিপদের মুহূর্তে। প্রশ্ন কিন্তু থেকেই যাচ্ছে।

ঘটনা: ৫

হুগলির রিষরাতে থাকেন বছর ৬৫ -র অক্ষয়বাবু। দীর্ঘদিন হার্টের পেশেন্ট। সঙ্গে হাই প্রেসার। নিয়মিত পরীক্ষা করতে যান কলকাতার কাছের একটি বেসরকারি হাসপাতালে। কিন্তু সেই হাসপাতাল এখন কোভিড হাসপাতাল। দীর্ঘ চার মাসে শরীরের নানান সমস্যায় ভুগছেন। কিন্তু তাঁর রুটিন চেকআপের কোনও সুরাহা নেই। এদিকে তাঁর অভিযোগ, এলাকার ভালো নামী ডাক্তারদেরও হাতের কাছে পাওয়া যাচ্ছে না। তাঁরা বেশিরভাগই নিজের চেম্বার বন্ধ রেখেছেন। এই বৃদ্ধ মানুষটির হঠাৎ কিছু হলে কে বাঁচাবে? কোথায় যাবেন তিনি?

আমি মুখ্যমন্ত্রীকে বা তাঁর মন্ত্রিসভার কাউকেই দোষারোপ করছি না। কারণ তাঁরা চেষ্টা করছেন। তাঁরা জানেন, এবং জেনেই গেছেন পশ্চিমবঙ্গ করোনা চিকিৎসায় দেশে শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করেই আছে। আর সেটা আছে বলেই মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করেন, পশ্চিমবঙ্গের চিকিৎসা সম্পর্কে বিশ্বকে জানাতে। জানি না প্রধানমন্ত্রী তা করেছেন কিনা। তবে এ জাতীয় বিচিত্র রোজকার ভিন্ন ঘটনা চোখে আঙুল দেখিয়েই বলে দেয়, ‘পশ্চিমবঙ্গ বড় অসহায়, এখানকার সাধারণ মানুষ ভীষণ নিরুপায়।’ তাই একজন সাধারণ নাগরিক হিসাবেই বলছি, দিদি আসল সমস্যাই জোর দিন। গোড়ায় যে গলদ হয়ে আছে। প্লিস ধামাচাপা দেবেন না। মানুষকে তার ন্যায্য চিকিৎসার, ভালো থাকবার অধিকারটুকু শুধু ফিরিয়ে দিন। তাহলেই বাংলার মানুষ আবার আপনাকে মাথায় করে রাখবেন। না হলে আগামী ২০২১-এ তাসের ঘরের মতন ভেঙে পড়বে আপনার ঠুনকো সাম্রাজ্য।

(মতামত নিজস্ব)

 

Related Articles

Back to top button
Close