fbpx
পশ্চিমবঙ্গহেডলাইন

মদিরাময় মদালাপে মুখর মুখপুস্তকের মহল্লা, মাদকতার মজলিসে মাতাল মনদুনিয়াও

শান্তনু অধিকারী, সবং: ‘অবাক নয়নে বিপনী সমুখে দাঁড়িয়ে ছিলেম ক্ষণেক,/মদের দোকানে দীর্ঘ লাইন, দামও তো শুনি অনেক !/অবনী, তাড়ি আছে ?’― তৈরি হয়েছে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের লেখা কবিতার এমনই এক মজার প্যারডি। ঘুরে বেড়াচ্ছে নেট দুনিয়ায়। আসলে এই লকডাউনের বাজারে খুলে গেছে মদের ঝাঁপি। সেইসঙ্গে যেন উন্মুক্ত হয়েছে সৃজনের ভাণ্ডারও। মদের কাউন্টারে আছড়ে পড়ছে গণসুনামী। মদ্যপায়ীদের সুনামীর সেই ঢেউ এসে পড়েছে নেটদুনিয়াতেও। শুধু এমন প্যারডি নয়, অকাতরে ভেসে আসছে শতশত মিম আর জোকস। পিছিয়ে নেই ছড়াকাররাও। রীতিমতো শব্দের পেয়ালায় ছন্দের তুফান তুলেছেন তাঁরাও। কোথাও নিছক রসিকতা, কোথাও আবার রসের আড়ালে  বিদ্রূপের হুল। শানিত হয়েছে প্রতিবাদও। তবে সবকিছু ছাপিয়ে কেবল মজার মজলিস।এভাবেই মদিরাময় মদালাপে মত্ত হয়ে উঠেছে আজ মুখপুস্তকের মহল্লাও। মদ্যপায়ী না হয়েও রীতিমতো মদিরাসুখে মত্ত নেটিজেনরা।

শঙ্খ ঘোষ একটি কবিতায় লিখেছিলেন, ‘মদ খেয়ে তো মাতাল হয় সবাই/কবিই শুধু নিজের জোরে মাতাল।’ সেই পংক্তিমালার সারবত্তাই অক্ষরে অক্ষরে বুঝিয়ে ছাড়লেন এই বাজারে বিশিষ্ট সাংবাদিক ও জনপ্রিয় কবি শংকর দত্ত‌ও। লিখে ফেললেন, ‘বেশ করেছি মদ খেয়েছি’। নিজে না খেয়েও পাঠকদের রীতিমতো নেশাতুর করে এই মুহূর্তে ভাইরাল তিনিও। মদের অর্থে দেশের কোশাগার ভরছে। এ‌ও তো একপ্রকার দেশসেবা! তাই তিনি ছন্দে ছন্দে বিদ্রুপের ‘পেগ’ কেটেছেন, ‘খেয়াল আছে ? হিসেব জানো?/কাল কতো হয়েছে সেল?/শুনে চক্ষু চরক গাছ/ভাবছো মাতালকে দিচ্ছি তেল?/একটুও না মিথ্যে কথা/ছিয়াশি কোটি টাকা …/টেস্ট করাতে কীট কিনতেই/সব কোশাগার ফাঁকা!/আমরা লাইন দিলুম বলেই/একদিনে আয় ভাবুন!/আলটপকা চিন্তা থেকে/এবার একটু নামুন!’ তাঁর এই নেশা ধরানো লেখাটির ফেসবুকে শেয়ার সংখ্যা চমকে দেওয়ার মতোই। মন্তব্যের সহাস্য ঢেকুর তুলেছেন পাঠকেরাও।

আরও পড়ুন: করোনা মোকাবিলায় ব্যর্থ রাজ্য সরকার: রাজু বিস্ত

এই এক‌ই ভাবনার বেশ কিছু পোস্ট গত দু’দিন ধরে লাগাতার ফেসবুকে নেশার ফোয়ারা ছোটাচ্ছে। যেমন― ‘মাতাল পড়ে গেলে তাকে টেনে তোলার কেউ থাকে না। কিন্তু অর্থনীতি পড়ে গেলে মাতালের ডাক পড়ে।’ কিংবা ‘শিশু ভূমিষ্ঠ হ‌ওয়ার সাথে সাথে দু’ছিপি মদ খাইয়ে দিলে বড় হয়ে আসক্তি জন্মাবে, ফলে দেশের আয় বাড়বে, তরতর করে বিকাশ ঘটবে।’ একজন লিখেছেন, ‘ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে― ২০২০ সালে দেশের অর্থনীতি চাঙ্গা করতে মাতালদের ভূমিকা অনস্বীকার্য।’ আরেকজন তো রীতিমতো প্রতিবাদের বোতল খুলেছেন― ‘কার ভরসায় আছেন, সরকারের? সে তো নিজেই মাতালের ভরসায় আছে!’ ‘এবারের মতো যদি বেঁচে যাও/ কেটে যায় ভয়/মনে রেখো দুর্দিনে মাতাল/ বাঁচিয়েছিল ইকনমি/ রায় ও মার্টিন নয়।’ এইভাবে রসিকতার সোডা মেশানো হয়েছে বিদ্রূপের শ্যাম্পেন।

জনৈক পুলককুমার বেরা তাঁর সদ্য লেখা ছড়া ‘মোদের দেশ মদেই বেশ’-এ লিখেছেন, ‘খোল তাড়াতাড়ি কেন এত দেরি করিস না বেশি ঝামেলা/নেশা ছুটে গেলে বাড়ি যাব চলে পস্তাবে দেশ শালা।’ বোঝাই যাচ্ছে মজা আর ব্যঙ্গের যথার্থ ককটেল গিলিয়েছেন পুলকবাবু। তাই লাইক ও কমেন্টের নেশা‌ও চড়েছে ভালোই। প্রবাদে আছে ‘জাতে মাতাল তালে ঠিক।’ অনেকেই সুরার সঙ্গে রাজনীতিটাকেও কায়দা করে ঢুকিয়ে ফেলেছেন। নেশার চাট হিসেবে জমেছে‌ও মন্দ নয়। যেমন― ‘লকডাউনে ঢুক ঢুক পিও/মা-মাটি-মাতাল যুগ যুগ জিও/আকালে ভরপেট খাই না খাই/মদ খেয়ে রাজকর দেওয়া চাই।’ কেউ কেউ আবার মজা করে লিখেছেন, ‘একদম ভুল বুঝবেন না। ভুয়ো খবর ছড়াবেন না। সত্যিটা হল, লোকজন হ্যান্ড স্যানিটাইজার বানানোর জন্য অ্যালকোহলের দোকানে লাইন দিয়েছে।’ যথারীতি ভাইরাল হয়েছে পোস্টটি।

একবার একজন বিদ্যাসাগরের কাছে এসে বলল, ‘আপনি যে মধুসূদনকে টাকা পাঠান, সে সব টাকা মদ খেয়ে ওড়ায়।’ বিদ্যাসাগর বললেন, ‘জানি আমি সেটা।’ ‘জেনেও টাকা দেন?’ — লোকটা বলল, ‘তবে আমাকে কিছু টাকা দিন। আমিও মদ খাই।’ বিদ্যাসাগর বললেন, ‘তোমার মেঘনাদবধ কাব্যখানা কই?’ সুরা যে সৃষ্টির উদ্দীপক, তার স্বীকৃতি তো এভাবেই দিয়ে গেছেন স্বয়ং বিদ্যাসাগরমশাই।

আজ‌ও সুরা তেমনই সৃজনের উদ্দীপক। মাইকেল মধুসূদন থেকে অধুনার শক্তি চাটুয্যে― সর্বজনবিদিত তাঁদের সুরাপ্রীতি। কণ্ঠে সুরা না পড়লে সৃষ্টির এত সুধা বাঙালি পেত কিনা সন্দেহ আছে! আজ‌ও ফেসবুক প্রমাণ দিচ্ছে সুরার উদ্দীপনা। সেই উদ্দীপনা স্পষ্ট হচ্ছে কাতারে কাতারে পোস্টে। যেমন― ‘সরকার মদ বেচে চাল দেবে। আর মাতাল চাল বেচে মদ কিনবে। হিসেব বরাবর।’ কিংবা, ‘মদ্যপানের বিরুদ্ধে যারা, তাদের মাথায় পড়ুক বাজ।’\

আরও পড়ুন: হলদিয়ায় একই পরিবারে করোনা আক্রান্ত ৫

সম্প্রতি করোনাযোদ্ধাদের প্রতি সম্মান জানাতে বায়ুসেনার কপ্টার থেকে ফুল ছড়ানো হয়েছিল দেশের চিকিৎসাকেন্দ্রগুলিতে। সেই বিষয়টিকে মাথায় রেখে জনৈক নেটিজেন লিখেছেন, ‘যারা লাইন দিয়ে মেহনত করে মদ কিনে দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার চেষ্টা করছে, তাদের ধন্যবাদ জানাতে সারা দেশে কপ্টার থেকে চানাচুর ছড়ানো হবে।’ আরেকজন তো আবার এই মদের দোকান খোলার সিদ্ধান্তকে রীতিমতো ব্যঙ্গ করে লিখেছেন, ‘থালা বাজল। মোমবাতি জ্বলল। ফুল‌ও দেওয়া হল। প্রসাদটাই বা বাকি থাকে কেন!’

কেউ তো আবার রাজ্যের প্রাক্তনমন্ত্রী মদন মিত্রের ছবি দিয়ে তার তলায় লিখে দিয়েছে ‘মদ-ON’! মদের কাউন্টারে বেলাগাম ভিড় নিয়ে একজন লিখেছেন, ‘স্যাটেলাইট দ্বারা মদের কাউন্টারে ভিড় দেখে জাপান, রাশিয়া, আমেরিকাও কনফিউজড, ভারত করোনার ভ্যাকসিন তেরি করে ফেলল নাকি!’ পোস্টটি রীতিমতো হাসির ফোয়ারা ছুটিয়েছে নেটিজেনদের মধ্যে। এই সময় আবার কেউ কেউ ইউটিউব থেকে তুলে এনেছেন বহুল প্রচারিত একটি গানের দুটি লাইন―’যত মাতাল রাস্তায় এবার নামব আন্দোলনে/মদ আমাদের দিতে হবে রেশন দোকানে।’

‘অমানুষ’ সিনেমায় মহানায়ক উত্তমকুমার মদের বোতল হাতে গান ধরেছিলেন― ‘বিপিনবাবুর কারণসুধা/মেটায় জ্বালা মেটায় ক্ষুধা/ মরা মানুষ বাঁচিয়ে তোলে/ এমনি যে তার জাদু’। লকডাউনের জেরে দেশের মৃত অর্থনীতিকে বাঁচিয়ে তুলতে সরকার যে সেই ‘জাদু’র ওপরেই নির্ভর করছে, তা আজ স্পষ্ট। কিন্তু যাঁরা ‘সামাজিক দূরত্ব’ বিধিকে শিকেয় তুলে সুরাপ্রেমে নিজেদের ভাসিয়ে দিচ্ছেন, তাঁদের উচিৎ ওমর খৈয়ামের রুবাইয়াৎটিও স্মরণে রাখা। যেটি অনুবাদ করেছিলেন নজরুল ইসলাম। ‘যদিও মদ নিষিদ্ধ ভাই, যত পার মদ চালাও/তিনটি কথা স্মরণ রেখে, কাহার সাথে মদ্য খাও?/মদ-পানের কি যোগ্য তুমি? কি মদই বসে করছ পান?/জ্ঞান পেকে না ঝুনো হলে মদ খেয়ো না একফোঁটাও।’ যদিও আমাদের দেশে মদ নিষিদ্ধ নয়, তবু মদ্যপায়ীদের জ্ঞানের পক্কতা কিন্তু বেশ জরুরি। কারণ নেশার ঘোরে ভালোমন্দ কত কিছুই তো ঘটে! ওদিকে ফেসবুকের মজলিসে কাদের কণ্ঠে যেন শোনা যায় সুরময় সুরার আকুতি― ‘মদের জোয়ারে/ভাসিল সংসার এ/ বোতল খুলে দাও― দাও― দাও― দাও―/ঢালিব কণ্ঠতে/ভুলিব কণ্টকে/ চাট এনে দাও― দাও― দাও― দাও―’। আপাতত ফেসবুকের সৌজন্যে মনদুনিয়াও এভাবেই মাতাল মদিরাময় মাদকতায়।

Related Articles

Back to top button
Close