fbpx
অন্যান্যঅফবিটআন্তর্জাতিকবাংলাদেশহেডলাইন

শ্রীহট্টের দুর্গাপুজো – বাকি বাংলার চেয়ে খানিক স্বতন্ত্র

উচ্ছ্বাস রায়, হবিগঞ্জ (বাংলাদেশ): বাংলাদেশে বৃহত্তর শ্রীহট্ট বলতে সমগ্র সিলেট বিভাগ অর্থাৎ (সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার আর হবিগঞ্জ) আর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সামান্য অংশ নিয়ে এই অঞ্চল। শ্রী চৈতন্যদেবের পৈতৃক নিবাস থাকার কারণে অনেকেই এটা ভেবে থাকেন যে শ্রীহট্ট বৈষ্ণব প্রভাবসম্পন্ন একটি অঞ্চল। তবে এটা সম্পূর্ণ রূপে সত্য নয়, অর্ধেক সত্য। শ্রীহট্টের শাক্ত প্রভাবও বেশ লক্ষণীয়।
কথিত আছে, শ্রীচৈতন্যদেব যখন শ্রীহট্টে বেড়াতে আসেন তখন হাতে লেখা তালপাতার চণ্ডী পুঁথি ওঁনার ঠাকুরদাদাকে উপহার দেন। শ্রীহট্টের শাক্ত বৈষ্ণব ভাবধারা মিলেমিশে গেছে। দুর্গাপুজো নিয়ে যদি বলা হয় তবে এখানে শারদীয় দুর্গাপুজোর সঙ্গে বাসন্তীপুজোও সমানভাবে জনপ্রিয়। তবে বাসন্তীপুজো শুধু পারিবারিক পর্যায়েই রয়েছে। শারদীয় উৎসব পারিবারিক ও বারোয়ারী উভয় পর্যায়ে হয়ে থাকে। বর্তমানে ২৬০০টির মতো পুজো হয় সমগ্র সিলেটে।শ্রীহট্টের সবচেয়ে প্রাচীন দুর্গোৎসব হিসেবে ধরা হয় মৌলভীবাজারের পাঁচগাও গ্রামের লালদুর্গা। প্রায় ৩০০ বছরেরও প্রাচীন পুজো।

কথিত আছে লক্ষ আহুতির পুজো। সপ্তমী থেকে নবমী সর্বমোট এক লক্ষ আহুতি হয় আর বলি হয় অসংখ্য। মহিষ, পাঁঠা, মেষ, হাঁস ও কবুতর বলি হয় এখানে। চালকুমড়ো আর আখ বলিতো আছেই। তাছাড়া মৌলভীবাজারের মঙ্গলচণ্ডী বাড়ির নবদুর্গা পুজাও বিখ্যাত। প্রাচীনকাল থেকে শ্রীহট্টে শক্তিপুজোর চল দেখা যায়। বিশেষত পারিবারিক দুর্গাপুজোট প্রতিপদাদি কল্পারম্ভ খুব কম পরিবারেই হয়। ষষ্ঠ্যাদি কল্পারম্ভ একদমই নেই আর অধিকাংশই সপ্তম্যাদি। ঘট,পট ও প্রতিমা তিন আধারেই পুজো হয়ে থাকে। অষ্টমী ও নবমী কল্পের পুজোগুলি সাধারণত ঘটেই হয়ে থাকে। শ্রীহট্টের দুর্গাপুজোয় কিছু ব্যাতিক্রম লক্ষ্য করা যায়।

আগেকার দিনে আচার্য্য ঠাকুর দ্বারা প্রতিমা নির্মিত হত কিন্তু এখন যেকোনও কেউই চাইলে বানাতে পারে। এখানে চালচিত্র অনুপস্থিত কিন্তু চালচিত্রের জায়গায় নন্দী-ভৃঙ্গী সহ মহাদেবের প্রতিমা দেখা যায়। এখানাকার প্রাচীন পুজোগুলো হত শ্রীবিদ্যাপতি বিরচিত দুর্গাভক্তিতরঙ্গিনী মতে। তাই বহু প্রাচীন পুজায় সন্ধিপুজোর বিধান নেই। তবে বর্তমানে কেউ কেউ দেবী পুরনোক্ত পদ্ধতিতেও পুজো করেন তখন সে মতানুসারে সন্ধিপুজো করেন। এখানে অর্ধরাত্র বিহিত কালীপুজো হয় অর্থাৎ অষ্টমী যে দিন রাতে পাওয়া যাবে ওই দিন রাতেই এই পুজো অনুষ্ঠিত হয়। হোম, পুজার পর পরই দেবী প্রতিমা বিসর্জন হয়। সপ্তমীতে শ্রীবিষ্ণুকে তুলসী দিয়ে অর্চনা না করে দেবীপুজো শুরু করা যায় না। শ্রীহট্টের আরেক ব্যাতিক্রমী প্রথা হল ত্রিশুল পুজো। অষ্টমীতে প্রধানঘট বা শ্রীহট্টের প্রচলিত নাম ব্রহ্মঘটের সামনে ত্রিশূল স্থাপন হয়। সে ত্রিশূল যেকোনও ধাতুরই হতে পারে সাধারণত দেখা যায় লৌহনির্মিত ত্রিশূলই পুজো করা হয়। অষ্টমী ও নবমী দুই দিনই এই ত্রিশূলে পুজো হয় তারপর নবমীতে হোম। শ্রীহট্টে ভোগে নৈবেদ্যের ক্ষেত্রে বলা হয় দেবীর প্রধান নৈবেদ্য হল রাজভোগ। বড় থালে ১০টা কলা দিয়ে এই নৈবেদ্য সাজানো হয় এতে সকল ফলই দেওয়া হয়। অন্নভোগ সকল বাড়িতেই দেওয়ার প্রথা আছে তবে সেটা অবশ্যই ব্রাহ্মণ পাচক দিয়ে রান্না করে।

আরও পড়ুন: পুজোয় সংক্রমণ রুখতে রাজ্যের ছোটো, বড় সমস্ত পুজো প্যান্ডেলই ‘NO ENTRY’ বাফার জোন, জানাল হাইকোর্ট

সাধারণত ব্রাহ্মণ পরিবারের আমিষ ভোগের চল আর অব্রাহ্মণ পরিবারে নিরামিষ। সন্ধ্যার পর হয় বৈকালী ভোগ। খই-চিড়া, দই কিংবা ঘি দিয়ে এখানে বিশেষ নৈবেদ্য হয় আর নানা রকম পিঠা আর সন্দেশ নাড়ু। রচনা হিসেবে এখানে বিজোড় সংখ্যক শস্য ভাজা যেমন চাল, ডাল কিংবা শিম বীচি ভাজা সঙ্গে খই চিড়া আর দেশী পাকা কলা কিংবা পেয়ারা। বহু পুজোয় এখনও নবমীতে মহিষবলি হয়। পাঠা আর মেষ বলি তো আছেই। দশমীতে দুর্গাযাত্রা প্রথা পালন করা হয়। ঘট বসিয়ে যাত্রার কৌটা, জোড়াপুঁটি, দই জল এসবে সিঁদুর, ধান দূর্বা আর খই দিয়ে বরণ করা হয়। দর্পণবিসর্জনের পরপরই সকালে নবপত্রিকা বিসর্জন হয়। গৃহস্থ বাড়ির দুয়ারে আলপনা দিয়ে লোহার সিন্দুকের উপর ধান রেখে বাড়ির ভেতরের দিকে মুখ করে বসানো হয় নবপত্রিকাকে। তারপর বাড়ির বউরা একে একে ধান দূর্বা, খই, তেল সিদুঁর বরণ করে। বউরা তাদের স্বর্ণালঙ্কার নবপত্রিকাকে ছুঁইয়ে নিয়ে যান। তারপর নবপত্রিকার পক্ষে পুরোহিত ধানে ভর্তি থালা থেকে বাম হাতে নিয়ে একমুঠ ধান নবপত্রিকার শাড়ির আঁচলে বেঁধে দেন। আর ডান হাতের মুঠের ধান বাড়ির মধ্যে ছিটিয়ে দিয়ে যান, তারপর বিসর্জন হয়। এই প্রথাটা হুবহু কন্যা বিবাহেও পালন করা হয়। প্রতিমা বিসর্জনের আগে দেবীকে বই, অস্ত্র, লেখনী, ধান, চাল স্বর্ণ, রূপা ইত্যাদি ছোঁয়ানো হয়। দেবীকে তখন লক্ষ্মীরূপে ভাবা হয়। তার পুজোর পর সমৃদ্ধি লাভ হবে এটাই ভাবা হয়। এখনও নবপত্রিকা এবং দেবীপ্রতিমা বিসর্জনের সময় দুই দিকে লোকজন রামদা কিংবা তলোয়ার নিয়ে যায়। এটাও প্রাচীন প্রথা, ওঁনাকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য এই প্রথার প্রচলন। গান শ্রীহট্টের সংস্কৃতির সঙ্গে ওতোপ্রোতোভাবে জড়িত। দুর্গাপুজো প্রচুর গান রয়েছে।

আরও পড়ুন: স্বপ্নপূরণ আবাসিকদের নতুন ভাবনায় উমা আসছে ঘরে

সকালে গীত জাতীয় গান হয় তা গায় মহিলারা। এর বিষয় বস্তু হল শ্রীরামের অকালবোধন। দুপুরে হয় ধামাইল আর সন্ধ্যায় পুরুষেরা করেন কীর্তন ধরনের গান। এখানের বিষয়বস্তু হল দেবী মহিমা। কীর্তনের পর প্রতিদিন লুটও দেওয়া হয়। বিসর্জনের পর কাঁদাখেলাও এখানের এক ব্যতিক্রমী প্রথা। শ্রীহট্টে দুর্গাপুজোর পর দোল উৎসব না করলে এর নাকি পূর্ণতা পায় না বলে মানা হয়। দুর্গাপুজা যে গৃহে হয় সেখানে প্রথম দোল, পঞ্চম কিংবা সপ্তম দোল করতেই হয়। এও শাক্ত বৈষ্ণবের এক অদ্ভুত মিলন। বর্তমানে পারিবারিক বহু পুজো বারোয়ারী পুজায় রূপ নিয়েছে। তাই প্রথা আর আচার নিয়ম পালন হয় না তেমন। নামে মাত্রই পুজোটুকু হয়ে আসছে।

Related Articles

Back to top button
Close