fbpx
অন্যান্যআন্তর্জাতিকবাংলাদেশহেডলাইন

অতিমারীকালে বাংলাদেশের দুর্গাপুজো ২০২০

আবুল হাশিম: বাঙালির আবহমান সংস্কৃতির ধারক দুর্গাপুজো এবার বাংলাদেশের সর্বত্র উদ্‌যাপিত হতে যাচ্ছে সীমিত পরিসরে। করোনাকালীন এই সময়ে দুর্গোৎসবকে ‘দুর্গাপুজো’ বলেই বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে, এবারের পুজোতে থাকছে না কোন জাঁকজমক, কেবল আন্তরিকতায় পালন করা হবে এবারের দুর্গাপুজো।

প্রতিবছর গোটা বাংলাদেশ জুড়ে প্রায় পঁয়ত্রিশ হাজার পুজো মণ্ডপ হয়। এইবার সেই সংখ্যাটা কমে গিয়ে ৩০ হাজার ২৩১টি মণ্ডপে পুজো হবে। পুজো সংক্রান্ত সরকারি নির্দেশনা রয়েছে প্রায় ২৬টির মতো। সেসব নির্দেশনা মোতাবেক পুজোর আনন্দ এবার কেবল হৃদয়ের ভক্তি নিবেদনেই সীমাবদ্ধ থাকবে। হবে না কোন আড়ম্বরপূর্ণ আয়োজন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কিংবা প্রতিযোগিতামূলক আয়োজন। ২২ অক্টোবর থেকে পুরোদমে শুরু হতে যাওয়া দুর্গাপুজোর বিসর্জন হবে ২৬ অক্টোবর।

গত বছরের ঢাকেশ্বরী মন্দিরের প্রতিমা

ঢাকেশ্বরী দুর্গা মন্দিরের আয়োজন প্রসঙ্গে বাংলাদেশের পুজো উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক নির্মল কুমার চ্যাটার্জির বক্তব্যেও শোনা যায় একই কথা। সরকারি নির্দেশনা ছাড়াও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেই তাঁরা এবারের পুজোকে খুব সীমিত আকারেই পালন করার প্রয়াসে অঙ্গীকারবদ্ধ। জানিয়েছেন এবারের পুজোয় হবে না কোন ভিড় বাড়ে এমন কাজকর্ম। জন সমাগম এড়ানোর জন্য বাংলাদেশের এবারের পুজোয় বিতরণ করা হবে না কোনও রকম প্রসাদ। সন্ধ্যা হতেই দর্শনার্থীদের ফিরে যাওয়ার জন্য বলা হয়েছে। রাত ন’টার মধ্যেই বন্ধ হয়ে যাবে মন্দির-মণ্ডপ।

গানবাজনার আয়োজন, মাইক-পিআরের ব্যবস্থা, সিঁদুরখেলা বা এ জাতীয় কোনো ঝুঁকিপূর্ণ আয়োজন রাখা হয়নি এবার। এ যেন এক অচেনা রূপ বাঙালির চিরচেনা উৎসবের। তবুও সব জঞ্জাল যেন দূরীভূত হয়ে যায় সেই মনস্কামনা নিয়ে পুজোয় রাখা হবে ভক্তিগীতির আয়োজন। স্বাস্থ্যবিধি মেনেই মানুষের সুস্থতার কামনায় এবারের এই নিয়মের কড়াকড়ি। বাঙালির চিরায়ত এই উৎসব বছর ঘুরে বারবার ফিরে আসবে- আর তাই বেঁচে থাকাকেই প্রাধান্য দিয়ে পুরো দেশেই এবার পুজোর সংখ্যা কমে গিয়েছে।

গত বছরের শিকদার বাড়ির ৮০১ প্রতিমা

বাগেরহাটের শিকদারবাড়ির বিখ্যাত দুর্গাপুজোও অনুষ্ঠিত হবে না এবার। প্রতিবছর অসাম্প্রদায়িকতার মূর্ত এক প্রতীক হয়েই শিকদারবাড়ির এই পুজো শান্তির বার্তা ছড়িয়েছে। দেশ-বিদেশ থেকে প্রচুর দর্শনার্থী ভিড় জমান শিকদার বাড়ির সেই এলাহি আয়োজনকে উপভোগ করার জন্যে। চট্টগ্রাম বিভাগের কুমিল্লা জেলায় পুজো হতো প্রতিবার হাজার খানেকের কাছাকাছি প্রায়। এবার সেই পরিমাণ কমে এসেছে ৮০০ এর কাছে। এভাবে বাংলাদেশের প্রতিটা জেলাতেই হ্রাস পেয়েছে পুজোর সংখ্যা। কমেছে মণ্ডপের পরিমাণ। মানুষের মনে এতে হাহাকার নামলেও স্বাস্থ্যের কথা ভেবে মানিয়ে নিয়েছেন সবাই।

আরও পড়ুন:ষষ্ঠী থেকে খুলে যাচ্ছে কালীঘাট মন্দির, কোভিড বিধি মেনে গর্ভগৃহে প্রবেশ করতে পারবে ভক্তরা

অন্য সব আয়োজন কমবেশি ঠিক থাকলেও সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রতিমা শিল্পীরা। গতবার যেসব প্রতিমা ১লাখ ২০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে, এবার সেসব ৬০হাজারেও বিক্রি হচ্ছে না বলে আক্ষেপ করেছেন শিল্পীরা। কারিগরদের হাতের কাজও কমে গেছে প্রতিমার বায়না কম থাকার জন্য। যেখানে গতবার শতাধিক প্রতিমা বানিয়েও ক্ষান্তি দিতে পারতেন না, এবার সেই জায়গায় ২০-২৫টা প্রতিমা বানিয়েই কারিগরদের কাজ ফুরোচ্ছে। মানুষজন আকারে ছোট প্রতিমা নিয়ে যাচ্ছেন এই বছর। করোনাকালীন আবহে পুজো হচ্ছে বিধায় বাংলাদেশের মানুষজন প্রতিবারের মতন আনন্দ-উৎসবের বাতিকে ব্যত্যয় ঘটিয়েছেন।

প্রতিমা তৈরি থেকে পূজা সমাপ্তি পর্যন্ত প্রতিটি মন্দিরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ভক্ত-পূজারি ও দর্শনার্থীদের জীবাণুমুক্ত করার ব্যবস্থা রাখা, সকলে বাধ্যতামূলকভাবে মাস্ক পরা, দর্শনার্থীদের মধ্যে ন্যূনতম তিন ফুট শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা, পূজামণ্ডপে নারী-পুরুষের যাতায়াতের আলাদা ব্যবস্থা করা, বেশি সংখ্যক নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবক রাখার এবং ব্যক্তিগত সচেতনতার পাশাপাশি এবারের পুজো যেন নির্বিঘ্নে কেবলই সাত্ত্বিক আয়োজনের মাধ্যমে পালন করা যায়, সেই দিকেই দৃষ্টি রেখে উদযাপিত হবে বাংলাদেশের এই বছরের সার্বজনীন দুর্গাপুজো।

 

Related Articles

Back to top button
Close