fbpx
আন্তর্জাতিকগুরুত্বপূর্ণবাংলাদেশব্লগহেডলাইন

বাংলাদেশে দুর্গাপুজো এবং ‘অস্তিত্বের’ লড়াই

তাপস দাস, সোদপুর: দুর্গাপুজো এপার বাংলা এবং ওপার বাংলায় একটি সার্বজনীন ধর্ম নিরপেক্ষ উৎসব। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুর পর থেকে বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতি ইসলামীকরণের পথে ধাবিত হয়। রাজনীতির প্রভাব পড়ে সামাজিক স্তরেও, ফলত পুরোপুরি না হলেও সামাজিক উৎসব একটি রাজনৈতিক এবং সামাজিক অস্তিত্বের পরিবাহক হয়ে ওঠে। এই প্রক্রিয়া সার্বজনীন দুর্গোৎসবকে ধর্মনিরপেক্ষ থেকে ধর্ম পক্ষ অবলম্বন করতে বাধ্য করেছে।

ঐতিহাসিকদের মতে, বাংলায় দুর্গাপুজোর প্রচলন করেন সম্রাট অশোকের রাজত্বকাল রাজশাহী জেলার তাহিরপুরের রাজা কংস নারায়ণ মতান্তরে রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়। তবে জীমূতবাহন এর ‘দুর্গোৎসব নির্ণয়’, বিদ্যাপতির ‘ দুর্গা ভক্তি তরঙ্গিনী’, শুলপানির ‘দুর্গোৎসব বিবেক’, কৃত্তিবাস ওঝার ‘রামায়ণ’, বাচস্পতি মিশ্রের ‘ক্রিয়া চিন্তামণি’, রঘুনন্দনের ‘তিথি তত্ব’ ইত্যাদি গ্রন্থে দুর্গাপুজোর বিস্তৃত বর্ণনা থাকায় সঙ্গত কারণেই অনুমান করা যায় বাংলায় দুর্গাপুজোর প্রচলন ছিল। দশম থেকে একাদশ শতকেই। তবে এ কথা ঠিক জাকঁজমকের সঙ্গে দুর্গাপূজার প্রচলন রাজশাহীর তাহিরপুরের রাজা কংস নারায়ণের সময় থেকে। এটাই বহুল প্রচলিত। দুর্গাপুজো ছিল মূলত রাজসিক। (কাজল দেবনাথ, আমার পুজো উৎসব সবার।) তাছাড়াও আমরা তানভীর মোকাম্মেলের জীবনঢুলী’ সিনেমায় দেখেছি কিভাবে দুর্গাপুজোর সময় জাতিগত বৈষম্যের কারণে হিন্দু এবং মুসলমানদের খেতে দেওয়ার স্থান ছিল বাড়ির বাইরে তবে বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষ আবহাওয়া এই উৎসবকে করে তুলেছিল একটি সার্বজনীন জাতীয় উৎসব তবে ১৯৭৫ পরবর্তী রাজনীতি এই উৎসব হিন্দু সনাতন ধর্মালম্বী মানুষের অস্তিত্বের অন্যতম প্রতীক হয়ে ওঠে বা উঠছে।

কার্যত হাজার ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের পর রাষ্ট্রক্ষমতায় দক্ষিণপন্থী প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে ধর্মীয় সংখ্যালঘু জনগণের আস্থার জায়গায় নতুন করে চিড় ধরে। তাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তা নতুন করে সংকটের মুখোমুখি হয়ে পড়ে দেখা যায় অনিশ্চিয়তা। শুরু হয় পুনরায় দেশত্যাগ। বিরাজমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে হিন্দু সমাজের কিছু সংখ্যক বিশিষ্ট ব্যক্তি সনাতন ধর্মালম্বীদের সামাজিক-অর্থনৈতিক ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সমঅধিকার মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় আন্দোলন গড়ে তোলা ও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে প্রাথমিকভাবে পুজো -পার্বণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ধর্মীয় সংগঠন সংযুক্ত করার মধ্যে দিয়ে নিজেদের অধিকার আদায়ের একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরির জন্য ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠা করে ‘কেন্দ্রীয় ও মহানগর সার্বজনীন পুজো কমিটি ‘পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় শব্দ বাদ দিয়ে নামকরণ করা হয় মহানগর সার্বজনীন পুজো কমিটি। এই কমিটির কার্যক্রমের পথ ধরে আন্দোলনের আরও বৃহত্তর পরিসরে সরিয়ে দেওয়া এবং এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে ১৯৮২সালে প্রতিষ্ঠা লাভ করে ‘বাংলাদেশ পুজো উদযাপন পরিষদ ‘ যার সাংগঠনিক ব্যাপ্তি বর্তমানে ইউনিয়ন পর্যন্ত বিস্তৃত।

১৯৮৫ সালে দুর্গাপুজোর ইতিহাস ছিল শোকাবহ। এবছর শারদীয় দূর্গোৎসবের প্রাক্কালে জগন্নাথ হলের মর্মান্তিক দুর্ঘটনা কারণে মহানগর পুজো কমিটি উৎসবের সব রকম আনুষ্ঠানিকতা বর্জন শোক পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। তবে এর পাশাপাশি এবছর মহামান্য রাষ্ট্রপতি ঢাকেশ্বরী মন্দিরে আসেন এবং মন্দিরের প্রথম দফা উন্নয়নের কাজে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন এই বছর প্রথমবারের মতো রাষ্ট্রপতি পুজো উপলক্ষে বাণী প্রদান করে।

তবে শেষ পাঁচ বছরে বাংলাদেশে দুর্গাপুজোর সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়ছে। ২০১৭ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী সারা বাংলাদেশ দুর্গাপুজো মন্ডপের সংখ্যা ছিল ২৮,৩৮৭টি, ২০১৮সালে সারাদেশে ২৯,০৭৪টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপুজো অনুষ্ঠিত হয় অর্থাৎ ২০১৭ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে ৬৮৭টি পুজো মন্ডপ সংখ্যা বৃদ্ধি ঘটে। সারা দেশে এ বছর ৩০ হাজার ২২৫টি মণ্ডপে দুর্গাপুজো হচ্ছে। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ৩১ হাজার ৩৯৮টি। গত বছরের তুলনায় এবার ১ হাজার ১৭৩টি মণ্ডপে পুজো কম হচ্ছে। অন্যদিকে ঢাকা মহানগরে এ বছর পুজোমণ্ডপের সংখ্যা ২৩৩টি। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ২৩৭টি। আর ঢাকা জেলায় এ সংখ্যা ৭৪০টি। গত বছরের চেয়ে এবার মাত্র দুটি মণ্ডপে পুজো কম হচ্ছে। এবার পুজো মণ্ডপের সংখ্যা কমে যাওয়ার মূল কারণ প্রধানত করোনা অতিমারীর প্রভাব।

তবে পুজো পরিসংখ্যান অনুযায়ী পুজোর সংখ্যা বাড়লেও আদমশুমারির পরিসংখ্যান বলছে পূজারীর সংখ্যা কিন্তু কমছে পূজারী অর্থাৎ বাংলাদেশে হিন্দু জনসংখ্যা হাজার ১৯৫১ সালে ২২ শতাংশ কমে হাজার ১৯৭৪ সালে ১৪ শতাংশ এবং সর্বশেষ আদমশুমারি অনুযায়ী ২০১১ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ৮.৪ শতাংশ এই সর্বনাশ হতে না পারলে বাংলাদেশের শুধু বৈচিত্র হারাবে না মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। জয় হবে অসুরকূলের।

তবে এই জাতীয় উৎসবের বৃদ্ধির পাশাপাশি বাংলাদেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘু নিরাপত্তা ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। ২০১৯ ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত হামলার ঘটনা ঘটেছে ১১টি। যদিও বাংলাদেশ উৎপত্তির ইতিহাসের সঙ্গে সংখ্যালঘু এবং সংখ্যাগুরুর কোনও ধারণা ছিল না। বাংলাদেশে ভোটার শতাংশ অনুযায়ী সংখ্যালঘু এবং সংখ্যাগুরুর পার্থক্য করা যেতে পারে। তবে ১৯৮৮ সালে ইসলাম বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ধর্ম হওয়ার মধ্যে দিয়ে ধর্মীয় সংখ্যালঘুর ধারণা পুরোপুরি আরোপিত হয় এবং তারা দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে পরিণত হয়ে।
তবে নিরাপত্তার প্রশ্নে একথা ঠিক যে বাংলাদেশের শেষ জাতীয় নির্বাচন ছিল একটি ঐতিহাসিক নির্বাচন যেখানে নির্বাচনের আগে এবং পরে সংখ্যালঘুদের ওপর কেনো হামলা হয়নি। তবে আজ বর্তমান সরকার মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের কান্ডারী হয়েও বাংলাদেশের সংবিধানকে পুনরায় ধর্মনিরপেক্ষ করে তুলতে পারেনি যার ফায়দা নিচ্ছে মৌলবাদী শক্তিগুলি আর সংখ্যালঘু নিরাপত্তার অবনতি ক্রমবর্ধমান হয়ে চলেছে। তবে এখনও পর্যন্ত কিন্তু সংখ্যালঘু জনগণকে নিরাপত্তার ঘেরাটোপে আনা যায়নি।

আরও পড়ুন: ৩০০বছরের ঐতিহ্যে ছেদ! হচ্ছে না গোবরডাঙার জমিদার বাড়ির দুর্গাপুজো

একটি সংবাদ সূত্রে খবর, করোনাকালে খুন, ধর্ষণ, দখলবাজি, চাঁদাবাজির পাশাপাশি সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা ও বাড়িঘর দখলের মাত্রাও বেড়ে গেছে। বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ ৭ অক্টোবর সন্ত্রাস-সহিংসতার যেসব তথ্য দিয়েছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। পরিষদের হিসাব অনুযায়ী, গত সাত মাসে (মার্চ-সেপ্টেম্বর) সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ১৭ জন হত্যার শিকার হয়েছেন, ১০ জনকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। এ সময় ধর্ষণ ও গণধর্ষণের শিকার হন ৩০ জন সংখ্যালঘু নারী। শ্লীলতাহানির কারণে আত্মহত্যা করেন ৩ জন, অপহৃত ২৩ জন ও নিখোঁজ ৩ জন। প্রতিমা ভাঙচুর করা হয়েছে ২৭টি, মন্দিরে হামলা-ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে ২৩টি, বসতভিটা, জমি ও শ্মশান থেকে উচ্ছেদের চেষ্টা হয়েছে ৭৩টি; গ্রামছাড়া করা হয়েছে ৬০টি পরিবারকে; বসতভিটা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুঠপাটের ঘটনা ঘটেছে ৮৮টি এবং হামলায় আহত হন ২৪৭ জন।

সুতরাং এবারেও বাংলাদেশ জুড়ে অনেক মণ্ডপ গড়ে উঠবে ঠিকই তার পাশাপাশি সংখ্যালঘু সনাতন হিন্দু ধর্মালম্বী জনগণ নিজেরদের অস্তিত্ব বাঁচিয়ে রাখার যুদ্ধে অবতীর্ণ হবে।

 

লেখক- তাপস দাস  গবেষক, প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়

(মতামত নিজস্ব)

Related Articles

Back to top button
Close