fbpx
অফবিটহেডলাইন

সন্ধিপুজোই চণ্ডীপুজো

রণজিৎ ভট্টাচার্য: শ্রীশ্রী চণ্ডী দুর্গাপুজোর অঙ্গ, এটা সকলেরই জানা। মহালয়ার প্রভাতে রেডিওতে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের উদাত্ত কণ্ঠে ‘যা দেবী সর্বভূতেষু চেতনেত্যভিধীয়তে/ নমস্তস্যৈ, নমস্তস্যৈ, নমস্তস্যৈ নমো নমঃ’ দিয়ে শারদোৎসবের ঘণ্টা আজও বেজে ওঠে। তারপর থেকে আমজনতা তিথি দিয়ে দিন গোনেন যদিও বছরের অন্য সময়ে সেই তিথির কোনও খোঁজ রাখার প্রয়োজন বোধ করেন না। যাই হোক, পুজোর অঙ্গ হিসাবে শ্রীশ্রী চণ্ডীর আলাদা ঘট বসে এবং অন্ততঃপক্ষে সম্পূর্ণ শ্রীশ্রী চণ্ডী বইটি একবার পাঠ করা হয় পুজোর তিনদিন ধরে।

সন্ধিপুজোয় প্রজ্জ্বল্যমান ১০৮ প্রদীপ

জেনে রাখা ভালো সমগ্র তন্ত্রশাস্ত্রের সার চণ্ডীর মধ্যে নিহিত আছে। সেজন্য সমস্ত শাক্ত গ্রন্থের মধ্যে চণ্ডী অত্যন্ত সমাদৃত। বলা যায় গীতার মতই হিন্দুদের নিত্যপাঠ্য চণ্ডী। পাশ্চাত্যেও আজকাল শ্রীশ্রীচণ্ডীর সমাদর দিন দিন বেড়ে চলেছে। গীতা যেমন মহাভারতের অংশ, চণ্ডীও তেমন মার্কণ্ডেয় পুরাণের অংশ। চণ্ডী মার্কণ্ডেয় পুরাণে প্রক্ষিপ্ত নয়, বরং ৮১ থেকে ৯৩ অধ্যায় পর্যন্ত ১৩টি অধ্যায়ের নামই ‘চণ্ডী’। ‘যা দেবী সর্বভূতেষু শক্তিরূপেন সংস্থিতা’ – দেবী মহাশক্তি সর্বভূতে শক্তিরূপেই বিরাজিতা। মার্কণ্ডেয় পুরাণ অনুযায়ী দেবী মাহাত্ম্যই চণ্ডীতে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

মায়ের পায়ে নিবেদিত ১০৮ পদ্ম

 

‘নমো দেব্যৈ মহাদেব্যৈ শিবাইয়ৈ সততং নমঃ। নমঃ প্রকৃতৈ ভদ্রায়ৈ নিয়তাঃ প্রণতাঃ স্ম তাম॥’(৯ম শ্লোক, ৫ম অধ্যায়) মহামায়াকে দেবগণ এভাবে স্তব করলেন, দেবীকে, মহাদেবীকে প্রণাম। সতত মঙ্গলদায়িনীকে প্রণাম। সৃষ্টিশক্তিরূপিনী প্রকৃতিকে প্রণাম। স্থিতিশক্তিরূপিনী ভদ্রাকে প্রণাম। সমাহিত চিত্তে তাঁহাকে বারবার প্রণাম করি। ‘দুর্গায়ৈ দুর্গপারায়ৈ সারায়ৈ সর্বকারিণ্যৈ। খ্যাত্যৈ তথৈব কৃষ্ণায়ৈ ধূম্রায়ৈ সততং নমঃ॥’ (১২শ শ্লোক, ৫ম অধ্যায়)। দুস্তর ভব সমুদ্র পারকারিণী, শক্তিরূপিণী, সৃষ্টিকত্রী, খ্যাতিরূপিণী কৃষ্ণবর্ণা ও ধূম্রবর্ণা দুর্গাদেবীকে সতত প্রণাম করি। এমনিভাবে শ্লোকের পর শ্লোকে দেবীমহামায়াকে শ্রদ্ধা-প্রণাম জানানো হয়েছে শ্রীশ্রীচণ্ডীতে। দেবী মাহাত্ম্য ও দুর্গাসপ্তশতী চণ্ডীর অন্য দু’টি নাম। দুর্গা হোমে সপ্তশত আহুতিদানের জন্যই শ্রীশ্রীচণ্ডী সপ্তশত মন্ত্রে বিভক্ত হয়েছে।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতপূর্ব সংস্কৃতের অধ্যাপক এফইডেন পার্জিটার সাহেবের মতে চণ্ডী খ্রিষ্টিয় তৃতীয় শতাব্দীতে রচিত হয়েছে।  কোনও কোনও পণ্ডিত ব্যক্তির মতে চণ্ডী নর্মদা অঞ্চল বা উজ্জয়িনীতে লেখা হয়েছে কিন্তু অধ্যাপক দক্ষিণারঞ্জন শাস্ত্রী ঐতিহাসিক যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করতে চেয়েছেন সম্ভবত বাংলাদেশই চণ্ডীর জন্মস্থান। বাংলার অধিকাংশ ভূভাগ দীর্ঘকাল জঙ্গলে পূর্ণ ছিল, আর ওইসব জঙ্গলের আদিম অধিবাসীদের বলা হত ‘কিরাত’ বা ‘শবর’। কালিকাপুরাণ সহ বিভন্ন প্রাচীন গ্রন্থের অভিমত হলো ‘চণ্ডী’-তে বর্ণিত দেবতা কিরাত ও শবরদের উপাস্য দেবী চণ্ডী। সুতরাং কিরাত দেশই অর্থাৎ বাংলাদেশেই চণ্ডীর আবির্ভাব হয়েছিল বলে বলা যেতেই পারে। আর ‘গুপ্তবতী’ টিকা অনুসারে দুর্গাসপ্তশতী চণ্ডীদেবীর স্বরূপবাচক মন্ত্র শরীররূপে নানা তন্ত্রে প্রসিদ্ধ। তাই এর নাম চণ্ডী। চণ্ড+স্ত্রীলিঙ্গ ঈপ্-পরব্রহ্মমহিষী বা ব্রহ্মশক্তি। চণ্ড শব্দের অর্থ দেশকালাদির দ্বারা অপরিচ্ছন্ন পরব্রহ্ম। ব্রহ্মশক্তিই চণ্ডী। মহামায়া তত্ত্বই সমস্ত তন্ত্রশাস্ত্রের প্রতিপাদ্য বিষয়। চণ্ডীর ৪র্থ অধ্যায়ে দেবীস্তুতি ব্যাখ্যাত হয়েছে। আর ৫ম অধ্যায় জুড়েই দেবীমাহাত্ম্য, দেবীর সঙ্গে শুণ্ড দূতের কথোপকথনের মাধ্যমে বর্ণিত হয়েছে। রাজা সুরথ ও বৈশ্যপুত্র সমাধি জগন্মাতার সম্যগ দর্শনলাভের আশায় নদীর পাড়ে তপস্যা করেছিলেন। যাঁকে বৈদান্তিকগণ ব্রহ্ম বলেন, তান্ত্রিকগণ তাঁকেই জগজ্জননী মহামায়া রূপে আরাধনা করেন। ব্রহ্ম ও মহামায়া অভেদ। চণ্ডীতে উল্লিখিত দেবী চরিত্রকে প্রথম, মধ্যম ও উত্তর ভেদে তিনভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। মধুকৈটভধের কাহিনি নিয়ে ‘প্রথম চরিত্র’(১ম অধ্যায়)যেখানে অধিষ্ঠাত্রী দেবী মহাকালিকা, মহিষাসুর বধের বৃত্তান্ত নিয়ে দেবীর ‘মধ্যম চরিত্র’(২-৪র্থ অধ্যায়) দেবী মহালক্ষ্মী এবং শুম্ভ নিশুম্ভ, ধূম্রলোচন, চণ্ড-মুণ্ড, রক্তবীজ বধকাহিনি বর্ণিত হয়েছে ‘উত্তর চরিত্রে’(৫ম-১৩শ অধ্যায়),প্রতিপাদ্য দেবী মহাসরস্বতী।

‘জঘান রক্তবীজং তাং চামুণ্ডাপীতশোণিতম। স পপাত মহীপৃষ্ঠে শস্ত্রসংঘ সমাহতঃ

 

চণ্ডীতে বর্ণিতা দেবী কে? কী তাঁর স্বরূপ? ভারতীয় শক্তিবাদের পশ্চাতে কোন্ দার্শনিক তত্ত্ব নিহিত রয়েছে? এসব প্রশ্নের উত্তর চণ্ডীতে দেওয়া হয়েছে আর্ত এবং স্তুতিপরায়ণ ব্রহ্মা এবং দেবগণের মুখ দিয়ে। চণ্ডীতে বর্ণিতা দেবী নিত্যা। তিনি জগন্মূর্তি, সর্বব্যাপিনী, তথাপি দেবগণের কার্যসিদ্ধির জন্য তিনি আবির্ভূতা হন। তিনি অক্ষরা, তিনি স্বহা, তিনিই স্বধা। তিনিই সাবিত্রী, তিনিই দেবগণের আদিজননী, তিনিই সৃষ্টি, স্থিতি, লয়, তাঁরই ইচ্ছার অধীন সব। তিনিই শ্রী, তিনিই ঈশ্বরী, তিনিই চেতনা, বুদ্ধি, নিদ্রা, ক্ষুধা, ছায়া, শক্তি, তৃষ্ণা, জাতি, শ্রদ্ধা, কান্তি, স্মৃতি, দয়া, মাতা, ভ্রান্তি, লজ্জা, পুষ্টি, তুষ্টি, শান্তি, ক্ষান্তিরূপে সর্বভূতে বিরাজিতা (৫ম অধ্যায়)। শুধু তাই নয় মানবদেহের প্রত্যেক অঙ্গে এবং বিশ্বের প্রত্যেক বস্তুতে দেবী প্রকাশিতা। সেই মহামায়াই জীবকুলকে মোহগর্তে নিহত করেন, আবার প্রসন্না হলে তিনিই হন মুক্তিদাত্রী। জগতের যেখানে যত নারীমূর্তি আছে, তা দেবীরই বিগ্রহ, চণ্ডীর নারায়ণী স্তুতিতে (১১শ অধ্যায়) এভাবেই বলা হয়েছে। স্বর্গ এবং মোক্ষদায়িণী তিনিই, কলা-কাষ্ঠ প্রভৃতিরূপে তিনিই জগতের পরিণামদায়িণী মহাকালী। তিনি সনাতনী ও ত্রিগুণের আধারভূতা অথচ ত্রিগুণময়ী। তিনি দ্রংষ্ট্রাকরালবদনা, নৃমুণ্ডমালিনী, চামুণ্ডা।

চণ্ডীর অষ্টম অধ্যায়ে বর্ণিত হয়েছে রক্তবীজাসুরের রক্তজাত অসুরগণ দ্বারা সমগ্র পৃথিবী পরিব্যাপ্ত হওয়ায় দেবতারা অত্যন্ত ভীত এবং বিষণ্ণ হলেন। তা দেখে চণ্ডিকা কালীকা বললেন ‘উবাচ কালীং চামুণ্ডে বিস্তরং বদনং কুরু’(৫৩ শ্লোক) – চামুণ্ডে শীঘ্র বদন বিস্তৃত কর। এই বলে চণ্ডিকা রক্তবীজকে শূল দ্বারা আঘাত করলেন। তখন কালী ‘মুখেন কালী জগৃহে রক্তবীজস্য শোণিতম’(৫৭ শ্লোক)। সেই রক্ত মাটিতে পড়তে না দিয়ে মুখে গ্রহণ করলেন। তখন চণ্ডিকা দেবী রক্তবীজকে শূল, ব্জ্র, বাণ, অসি ও ঋষ্টি দ্বারা আঘাত করে বধ করলেন – ‘জঘান রক্তবীজং তাং চামুণ্ডাপীতশোণিতম। স পপাত মহীপৃষ্ঠে শস্ত্রসংঘ সমাহতঃ।। ’(৬১ শ্লোক)। মহাষ্টমী তিথির শেষ ২৪ মিনিট এবং মহানবমীর শুরুর ২৪ মিনিটে – দুই তিথির সন্ধিক্ষণে, চামুণ্ডার পুজো করার রীতি। সেই চামুণ্ডার পুজোই সন্ধিপুজো নামে খ্যাত।

দ্বাদশ অধ্যায়ে দেবীর মাহাত্ম্য বর্ণনার সূত্রে বলা হয়েছে ব্যপ্তং তয়ৈতৎ সকলং ব্রহ্মাণ্ডং মনুজেশ্বর/মহাকাল্যা মহাকালে মহামারীস্বরূপয়া।। সৈব কালে মহামারী সৈব সৃষ্টির্ভবত্যজা। স্থিতি করোতি ভূতানাং সৈবকালে সনাতনী।। ’(৩৮ও৩৯ তম শ্লোক)অর্থাৎ প্রলয়কালে সেই দেবী মহাকালী মহামারীরূপে সমগ্র বিশ্ব পরিব্যাপ্ত করেন। সেই জন্মরহিতা সনাতনী দেবীই সৃষ্টিকালে সৃষ্টিশক্তিরূপে (ব্রহ্মারূপে) প্রকাশিত হন এবং তিনিই স্থিতিশক্তিরূপে (বিষ্ণুরূপে) পালন করেন এবং তিনিই প্রলয়কালে সংহাররূপ (শিবরূপ) ধারণ করেন। সারা বিশ্ব আজ করোনা অতিমারি আক্রান্ত, সেই অবস্থায় এখানে এবারও দুর্গাপুজো হচ্ছে। আমাদের সকলের একমাত্র প্রার্থনা এই প্রলয়ের হাত থেকে তিনিই যেন আমাদের বাঁচান। তাই আসুন চণ্ডীতে বর্ণিত মতেই ফুল, ফল, ধূপ, দীপ, হোম ও নৈবেদ্যাদি দিয়ে দেবীর পু্জোয় সংযতভাবে তদগত চিত্তে দেবীর আরাধনা করে দেবী চণ্ডিকাকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করি। আশা করব আমাদের সকল প্রার্থনা তিনি পূরণ করবেন। দেবীপুজোর মূল তো চণ্ডীতেই বর্ণিত হয়েছে। তাই চণ্ডী ও দুর্গাপুজোর একই উৎসস্থল।

 

 

 

 

 

 

Related Articles

Back to top button
Close