fbpx
কলকাতাগুরুত্বপূর্ণহেডলাইন

শূন্য বিধানভবন, ফাঁকা পড়ে রইল ‘ছোড়দা’র চেয়ার…

মমতাকে বলেছিলেন, ‘আমি অতুল্য ঘোষ হব, তুমি বিধান রায় হও'

যুগশঙ্খ ডিজিটাল ডেস্ক:   চলে গেলেন সোমেন মিত্র। আর ফেলে রেখে গেলেন এক নস্ট্যালজিয়া। কলকাতার দাপুটে নেতা থেকে রাজ্যের কংগ্রেসি রাজনীতির ‘শেষ কথা’। সোমেন মিত্রর রাজনৈতিক জীবন কম বর্ণময় নয়। দীর্ঘ ৫ দশকের রাজনৈতিক জীবনে বহুবার জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হলেও, সেভাবে প্রশাসনিক ক্ষমতা কোনওদিনই পাননি। সোমেন মিত্রের জন্ম ১৯৪১ সালে। আসল নাম ছিল সোমেন্দ্রনাথ মিত্রে। প্রয়াত কংগ্রেস নেতা বরকত গনিখান চৌধুরর শিষ্য বলা হত তাঁকে। ষাটের দশকে ছাত্র রাজনীতি দিয়েই পথচলা শুরু। তাঁর রাজনৈতিক জীবন ছিল দীর্ঘ। আর সেই রাজনৈতিক জীবনে এসেছে অনেক উত্থান-পতন। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মানুষের কাছে ছোড়দা হিসেবেই থেকে গেলেন তিনি। কংগ্রেস ছেড়ে এসেছিলেন তৃণমূলে, আবার ফেরেন কংগ্রেসে। তবে সোমেন মিত্র বরাবরই দাবি করেছেন, তিনি ক্ষমতার লোভে কোনোদিনই কিছু করেননি।

অধুনা বাংলাদেশের যশোহর জেলায় ১৯৪৭ সালে জন্মগ্রহণ করেছিলেন সোমেনবাবু। ষাট এবং সত্তরের দশকে প্রভাবশালী এবং আগুনে রাজনীতিবিদ হিসেবে তাঁর উত্থান। ছাত্র রাজনীতির হাত ধরে ষাটের দশকের শেষভাগে যোগ দিয়েছিলেন কংগ্রেসে। ১৯৭২ সালে শিয়ালদহ বিধানসভা আসন থেকে জয়ী হয়েছিলেন। তারপর আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। সেই আসন থেকে সাতবার জিতেছিলেন। রাজনীতির ‘ছোড়দা’ সোমেনবাবু তিনবারের প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি হয়েছিলেন। প্রথম দফায় ১৯৯২ থেকে ১৯৯৬ সাল, দ্বিতীয় দফায় ১৯৯৬ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত প্রদেশ কংগ্রেসের শীর্ষপদে ছিলেন তিনি। ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে ফের তাঁকে রাজ্যে কংগ্রেসের সভাপতি হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছিল।

সালটা ২০০৮। সিঙ্গুর আন্দোলন ঘিরে বঙ্গ রাজনীতি তখন উত্তাল। রাজ্যে পরিবর্তনের হাওয়া ইতিমধ্যেই বইতে শুরু করেছে। সিঙ্গুরে তৎকালীন বাম সরকারের শিল্পায়ন নীতির বিরুদ্ধে ধরনায় বসেছেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মমতার পাশে ছোট্ট একটা মঞ্চে ধরনায় বসতে দেখা যেত সোমেন মিত্রকেও। ‘ছোড়দা’ তখনও তৃণমূলে যোগ দেননি। প্রগতিশীল ইন্দিরা কংগ্রেসের নেতা তিনি। ধর্মতলার সেই ধরনামঞ্চে তখন সারা বাংলার কংগ্রেস-তৃণমূল কর্মীরা আসতেন। অনেককেই দেখা যেত সোমেন মিত্রর সঙ্গে কথা বলতে।

 

আরও পড়ুন: সোমেন মিত্রের প্রয়াণে শোকস্তব্ধ মুখ্যমন্ত্রী, টুইটে শোকজ্ঞাপন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের

আসলে, সেসময়ই মমতার সঙ্গে কাধে কাধ মিলিয়ে লড়াই করার অঙ্গীকার করে ফেলেছিলেন তিনি। পরে তৃণমূলে যোগ দেন। কিন্তু, সেখানে বেশিদিন স্থায়ী হতে পারেননি। মমতা যখন ক্ষমতার মধ্যগগনে, তখন স্রোতের বিপরীতে গিয়ে তৃণমূল ছাড়েন সোমেন মিত্র। আসলে, তৃণমূলে থাকাকালীন সম্মান পেলেও সাংগঠনিক ক্ষমতার কেন্দ্রে ছিলেন না। আর সোমেন মিত্র কখনও প্রশাসনিক ক্ষমতার বৃত্তে পৌছাতে না পারলেও, সাংগঠনিক ক্ষমতা থেকে নিজেকে বেশিদিন দূরে রাখতে পারতেন না। সেজন্যই হয়তো কংগ্রেসে থাকাকালীন অধীর চৌধুরী, প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সীদের সঙ্গে মতবিরোধ হয়েছে সোমেন মিত্রর।

একেবারে রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকেই সাংগঠনিক কাজ, সাংগঠনিক ক্ষমতা  দুটোই বেশি পছন্দ করতেন সোমেন। সাতের দশকে বঙ্গ রাজনীতি যখন উত্তাল তখন সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের হাত ধরে লাইমলাইটে আসেন। সেসময় গোটা উত্তর ও মধ্য কলকাতা দাপিয়ে বেড়াতেন সোমেন। তৎকালীন ‘ভদ্র’ কংগ্রেসি নেতাদের অনেকেই সোমেনের কাজের ধরন পছন্দ করতেন না। কিন্তু সেটা তাঁর রাজনৈতিক কেরিয়ারে অন্তরায় হয়নি। আসলে সোমেনকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন বরকত গণিখান চৌধুরি । ১৯৭২ থেকে ২০০০৬ সালের মধ্যে সাতবার শিয়ালদহ কেন্দ্রের বিধায়ক হয়েছেন ‘ছোড়দা’। অবশ্য বিধায়ক হওয়ার পরও বিধানসভার থেকে সাংগঠনিক কাজেই বেশি দেখা যেত তাঁকে।

 

তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে একসঙ্গে সংগ্রাম রয়েছে তাঁর রাজনৈতিক অতীতে। কংগ্রেস ছেড়ে এসেছিলেন তৃণমূলে, আবার ফেরেন কংগ্রেসে।দ্বিতীয়বার কংগ্রেস ফেরার পর বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে সোমেন মিত্র বলেন, তিনি ক্ষমতার লোভে ফিরতে চাননি বলেই তৃণমূল সরকারে থাকাকালীন দল ছাড়েন। তাঁর বক্তব্য ছিল, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাইটার্সে প্রবেশ করার পরই দল ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। এক সংবাদমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে সোমেন মিত্র বলেছিলেন, দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার লোভ তিনি কখনই দেখাননি। এমনকি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সামনে রেখে তিনি পিছন থেকে লড়াই করার পক্ষেই ছিলেন। তিনি নাকি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বলেছিলেন, ‘আমি অতুল্য ঘোষ হব, তুমি বিধান রায় হও।’ অতুল্য ঘোষ ছিলেন কংগ্রেসের একজন দক্ষ সংগঠক। আর সেটাই হতে চেয়েছিলেন সোমেন মিত্র। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন মমতাকেই। যখন একথা বলেছিলেন, তখন তিনি প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি ছিলেন। অথচ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন কংগ্রেস ছেড়েছিলেন, তখন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি ছিলেন সোমেন মিত্র। সেইসময় নাকি সভাপতি নির্বাচনের ভোটে মমতাকে হারিয়ে দিয়েছিলেন সোমেন। এরপরই সরে আসেন মমতা।

আরও পড়ুন: সোমেন মিত্রের প্রয়াণে দিলীপ থেকে মুকুল-রাহুল জানালেন শ্রদ্ধার্ঘ্য

 

একটা সময় বাংলার প্রতিটি বুথের কংগ্রেস কর্মীদের নাম ধরে চিনতেন তিনি। সেই সাংগঠনিক দক্ষতার জোরে নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে দলের সাংগঠনিক নির্বাচনে মমতাকেও টেক্কা দেন তিনি। রাজ্যজুড়ে তুমুল জনপ্রিয়তা সত্বেও প্রদেশ সভাপতির নির্বাচনে সোমেনের কাছে হেরে যান মমতা। পরে আলাদা দল তৈরি করে মমতা আজ রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান। কিন্তু সোমেনকে প্রশাসনিক ক্ষমতা ততটা টানত না। তাঁকে টানত সাংগঠনিক ক্ষমতা। সেজন্যই হয়তো, ১৯৯৮ সালে প্রদেশ সভাপতির পদ ছাড়ার পর কংগ্রেস কার্যালয়ে যাওয়া একপ্রকার বন্ধই করে দিয়েছিলেন। সেজন্যই হয়তো প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সীর সঙ্গে বিবাদ। সেজন্যই হয়তো রাজনৈতিক অনুগামী অধীর চৌধুরির সঙ্গে মতের মিল হয়নি। অধীর প্রদেশ সভাপতি থাকাকালীন সোমেন বিধান ভবনে একেবারেই যেতেন না। ২০১৮ সালে পুনরায় প্রদেশ সভাপতি হওয়ার পর প্রবেশ তিনি করেছিলেন বিধানভবনে। আজীবন সংগঠন ভালবেসেছেন। আর রাজ্যে দলের সাংগঠনিক শীর্ষপদে থাকাকলীনই মৃত্যু হল তাঁর। অনেকে বলছেন, ‘সোমেনদা’র রাজনৈতিক জীবনের একটা বৃত্ত সম্পূর্ণ হল।

বাংলার রাজনীতিতে একসময়ের দাপুটে নেতাকে কোনঠাসা আর অপমান করতে করতে সহ্যের শেষ সীমায় নিয়ে গিয়েছিলেন। এমনকি দিল্লিতে প্রণব মুখোপাধ্যায়ের অশোকা রোডের বাড়িতে কলকাতা কর্পোরেশনের এক কাউন্সিলর রাজ্য কংগ্রেসের অনেক নেতার উপস্থিতিতে এবং ইন্ধনে সোমেন মিত্রকে কু‍ত্‍সিত ভাষায় শাসিয়েছিলেন। একের পর এক অপমানজনক ভাষা প্রয়োগ করেছিলেন। ওই বৈঠকে একসময়ে তাঁর হাত ধরে বাংলার রাজনীতিতে যারা পুনর্বাসন পেয়েছিলেন, শক্ত ভিতের উপরে দাঁড়িয়েছিলেন, সেই নেতারা একসময়ের রাজনৈতিক গুরুর অপমান তারিয়ে-তারিয়ে উপভোগ করেছিলেন। ওইদিনই রাজনীতি ছেড়ে দিতে চেয়েছিলেন সোমেন মিত্র। বুঝতে পেরেছিলেন মূল্যবোধ কিংবা কৃতজ্ঞতা শব্দ দুটি রাজনীতি থেকে উধাও হয়েছে। কিন্তু বাকি অনুরাগীদের বিশেষ আর্জিতে সেই সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু এতটাই প্রিয় শিষ্যদের বিশ্বাসঘাতকতায় এতটাই মানসিক আঘাত পেয়েছিলেন যে সেই ধাক্কা আর সামলে উঠতে পারেননি।

 

 

 

Related Articles

Back to top button
Close