fbpx
অন্যান্যঅফবিটহেডলাইন

তরঙ্গ কথা…

পর্ব- ৯

মনীষা ভট্টাচার্য: উত্তরে হাওয়া বইতে শুরু করেছে। রাতের দিকে কিংবা ভোরের দিকে একটু শিরশিরানি হচ্ছে। খুব ভোরে ঘাসের ডগায় শিশির বিন্দু দেখা যেতেও শুরু করেছে। হেমন্তের দুপুর অথবা বিকেল কারোর অলসতায় ভরে ওঠে আবার কারোর ঘরের এমন কাজে, যাতে রয়েছে শৈল্পিক নিপুণতা। সেদিন ঠাকুমা পা ছড়িয়ে বসে দাদুর পাতলা ধুতিতে দিচ্ছে বিউলির ডালের বড়ি। আমি কিসের ভূমিকায় নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন। কাক তাড়ানো। আর বাজছে রেডিও। বড়ি দিতে দিতে সেদিন রেডিও নিয়ে কত গল্প করেছিল ঠাকুমা। সে যাই হোক।

হিন্দুস্থানী সংগীতের বিশিষ্ট শিল্পী উস্তাদ আমির খান ও সহশিল্পীবৃন্দ
আকাশবাণীর স্টুডিওতে।

আজ এ লেখা স্মৃতিরস্মরণী বেয়ে রেডিও সংক্রান্ত নানা কথায় সাজানো। বিশিষ্ট সংগীতশিল্পী ও প্রশিক্ষক বিমান মুখোপাধ্যায়ের স্মৃতিকথায় পাওয়া যায় বেশ কিছু মজার ঘটনা। তখন আকাশবাণীর অফিস ১ নং গারস্টিন প্লেসে। কোনও এক অনুষ্ঠানে আঙুরবালা দেবী, ইন্দুবালা দেবী, কৃষ্ণচন্দ্র দে, কমলা ঝরিয়া প্রমুখ শিল্পীরা রয়েছেন। হঠাৎ দেখা গেল ইন্দুবালা দেবী স্টুডিওতে যেতে নারাজ। কারণ আঙুরবালা দেবীর জন্য মোটরগাড়ি গেছে আর ওঁনার জন্য ঘোড়ারগাড়ি। এমন বৈষম্য তিনি মানবেন না। যাই হোক অনেক অনুনয়, বিনয় করে ইন্দুবালাকে সেবার স্টুডিওতে নিয়ে আসা হয়েছিল। তবে এই রাগ কিন্তু অনুষ্ঠানে কোনও ছায়া ফেলেনি।

                                                       আরও পড়ুন: তরঙ্গ কথা

সরাসরি অনুষ্ঠান, কী করা যায়। বীরেনবাবু ঘোষণা করলেন শিল্পীর যন্ত্রের তারটি ছিড়ে গেছে, উনি এখন তারটি বাঁধছেন। বাঁধা সম্পূর্ণ হলেই আপনারা শুনতে পাবেন শিল্পী রাজেন সেনগুপ্তর সরোদবাদন। এ বলা যেন অনেকটা খেলার মাঠের রানিং কমেন্ট্রি। নির্ধারিত শিল্পীর অনুপস্থিতিতে কিংবা নির্ধারিত সময়ের কিছু পরে উপস্থিতির জন্য অনেক অপ্রস্তুত মুহূর্ত সৃষ্টি হয়েছে। রেডিওতে তবলা বাজাতেন আরেক বিখ্যাত শিল্পী অসিতবরণ মুখোপাধ্যায়। একদিন ওনাকে বলা হল নির্ধারিত শিল্পী এখনও এসে পৌঁছননি, সুতরাং তবলা বাজাতে বাজাতে ওনাকেই গানও গাইতে হবে।

ঘোষক ঘোষণা করলেন, ‘নির্ধারিত শিল্পীর অনুপস্থিতিতে এখন গান গেয়ে শোনাচ্ছেন অসিতবরণ মুখোপাধ্যায়।’ শুরু হল তবলা বাজাতে বাজাতে শিল্পীর গান। সবে মাত্র দু’লাইন গেয়েছেন, স্টুডিওতে প্রবেশ করলেন নির্ধারিত শিল্পী বেচু দত্ত। আকাশবাণীর প্রাক্তন ঘোষক দিলীপ ঘোষের কাছেও জানা যায় এমনই নানা ঘটনা। ধ্রুপদশিল্পী প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায় একবার স্টুডিওতে ঢুকতে দেরি করেছেন। সেদিন সকালে অনুষ্ঠান করে গেছেন। পরের অনুষ্ঠান সেদিনই রাত ৯টায়। শিল্পীর সঙ্গে তবলায় শ্যামল বসু, সারেঙ্গিতে সাগিরুদ্দিন খাঁ। অন্যান্য শিল্পীরা সময়ের মধ্যেই এসেছেন। কিন্তু প্রসূনবাবু তখনও পৌঁছননি। অনুষ্ঠান ঘোষণার দায়িত্বে ছিলেন দিলীপবাবু। ঠিক রাত ৯টা। ঘোষকের স্টুডিওর আলো জ্বলে উঠল।

১ নং গারস্টিন প্লেসের স্টুডিওর ছাদে পঙ্কজকুমার মল্লিক, বীরেন্দ্রকৃষ্ণ
ভদ্র, বাণীকুমার সহ আরও অনেকে।

‘অনুষ্ঠান প্রচারিত হচ্ছে আকাশবাণী কলকাতা থেকে। একটু পরেই শুনতে পাবেন পরবর্তী ঘোষণা’-এই বলে ঘোষক গানের স্টুডিওর আলো জ্বালিয়ে দিলেন। তবলা ও সারেঙ্গিতে যুক্তি করে বাজতে থাকল এক সুর। এ শুধুই অপেক্ষা, যদি প্রসূনবাবু চলে আসেন, কারণ ওঁনার গান শোনার জন্য অনেক শ্রোতাই অপেক্ষা করে থাকতেন। তবে যদি সত্যিই শিল্পী এসে না পৌঁছতে পারেন তবে তো আটাত্তর আর পিএম আছেই। মিনিট দু’য়েকের মধ্যেই শিল্পী প্রায় দৌড়তে দৌড়তে এসে পৌঁছলেন। ডিউটি অফিসার এসে ঘোষককে দিয়ে গেলেন একটি চিরকূট, তাতে লেখা আছে শিল্পী কোন রাগ গাইবেন। হাঁপাতে হাঁপাতে মাইক্রোফোনের সামনে বসলেন শিল্পী। তারও কিছু পরে ধরলেন গান। রেডিওর ওপার থেকে যাঁরা শুনলেন তাঁরা কেউ বুঝতেও পারলেন না কয়েক মিনিট কী ঝড়টাই না বয়ে গেল সবার ওপর দিয়ে।

নিয়ম রীতির বাইরে গিয়ে আকাশবাণী কখনই কিছু করতে পারেনি, আজও পারে না। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায় মারা গেছেন। ঘোষক দিলীপ ঘোষ রাস্তাতেই এই সংবাদ শুনে, এক ঝলক বিধানবাবুর বাড়ি ঘুরে এসে অফিসে ডিউটি অফিসারকে জানিয়েছেন সে কথা, কিন্তু তাঁর কথায় বিশ্বাস করে সেই সংবাদ সবাইকে রেডিও মারফত জানানোর নির্দেশ দিতে পারছেন না তিনি। সংবাদ বিভাগ পিটিআই-এর সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হল না। বিধান সভা, রাইটার্স বিল্ডিং, লালবাজার কোথাওই কারোর সঙ্গে যোগাযোগ করা গেল না। অনুমদিত কোনও সংবাদ সংস্থা থেকে খবরটি না পাওয়ায় শোকপ্রণত ঘোষণা করার নির্দেশও পেলেন না দিলীপবাবু। সব থেকে দুঃখের কথা এবং লজ্জাজনক এই যে এইসব ঘটনা যখন চলছে কলকাতার অফিসে, তখন দিল্লিকেন্দ্র থেকে বাংলা সংবাদে খবরটি জানানো হল। পাকা খবর কিছুতেই পাওয়া গেল না বলে, এত বড় খবর কলকাতাবাসীকে জানতে হল দিল্লি সংবাদের মাধ্যমে।

ঢাকে অনেকদিনই কাঠি পড়েছে। এই প্যান্ডেমিকেও আনন্দে মুখর কল্লোলিনী। কালীপুজো শেষে শহর মেতেছে জগদ্ধাত্রীপুজো নিয়ে। আগামিকাল তাঁরই আরাধনা। এই আনন্দের মুহূর্ত যাপনই তো জীবন যাপন। তাই সেই মুহূর্তের মালাই অতি সযত্নে গেঁথে রাখতে চাই আমরা সবাই। সেই মালাতেই আজকের বেতার কথা সাজালাম। এমন আরও মজার, দুঃখের অনেক গল্পই আছে, সে সব জানাব অন্য কোনওদিন। তবে আজকের লেখা শেষ করব দুর্গাপুজোর রেশ ধরে। গত শতাব্দীর পাঁচের দশকে শারদোৎসবের পর দুর্গাপ্রতিমা বিসর্জনের ধারাভাষ্যও বেতারে শোনা যেত। ধারাবিবরণী শুরু হতো এইভাবে, ‘আমরা এখন শোভাবাজার ঘাটে আছি। এরপর মাঝগঙ্গায় চলে যাব।’

 

দুটো নৌক জুড়ে প্রতিমা নিয়ে যাওয়া হত মাঝগঙ্গায়। নৌক দুটো দুপাশে সরে গেলে প্রতিমা পড়ে যেত নদীতে। প্রায় এক ঘণ্টা ধরে চলত এই ধারাভাষ্য। তৎকালীন শহরের বিখ্যাত পুজোগুলোরই বর্ণনা দেওয়া হতো। আজও ভাসানের সেই ধারাভাষ্য শোনা যায় বিভিন্ন এফ এম স্টেশনে, দেখা যায় সরকারি বেসরকারি টিভি চ্যানেলেও। তবে এ কথা বলা বোধহয় অপরাধ হবে না, সেই সময় শুধুমাত্র রেডিওতে ধারাবিবরণী শুনে শিশু ও কৈশোর মন যে কল্পনার জগতে স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়ানোর ছাড়পত্র পেত, সেটি আজ আর পাওয়া যায় না। কালের নিয়মে সেই ছাড়পত্রের যেন সলিল সমাধি ঘটেছে।

(ক্রমশ চলবে…)

Related Articles

Back to top button
Close