fbpx
অফবিটগুরুত্বপূর্ণহেডলাইন

চির নুতন রবি……

মনোজ রায়:

লোকটির অভ্যেস ছিল, তিনি যখনই কোনও উপন্যাস লিখতেন তখন সেটা গুণীজন সমাবেশে পড়ে শোনাতেন। তাঁর সেই আসরে মাঝে মধ্যেই যোগদান করতেন কথা সাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। একবার আসরের বাইরে জুতো খুলে আসার কারণে শরৎচন্দ্রের জুতো নাকি চুরি হয়ে যায়। উপায় না পেয়ে পরের দিন শরৎচন্দ্র জুতো দুটো কাগজে মুড়ে বগলে চেপে আসরে ঢুকলেন। লোকটি সেটা বুঝতে পেরে মুচকি হেসে শরৎচন্দ্রকে প্রশ্ন করলেন, শরৎ, তোমার বগলে ওটা কী পাদুকাপুরাণ? লোকটির মুখে এই কথা শুনেই আসরে উপস্থিত সকলে হাসতে শুরু করলেন।

এমনই বেশ রসিক পুরুষ ছিলেন লোকটি। তাঁর জীবনে এরকম বহু ঘটনাই রয়েছে। একবার তিনি ও গান্ধীজি একসঙ্গে খেতে বসেছিলেন। গান্ধীজি লুচি খেতে একেবারেই ভালোবাসতেন না। তাই গান্ধীজিকে ওটসে পরিজ খেতে দেওয়া হয়। আর লোকটি খাচ্ছিলেন গরম গরম লুচি। এটা দেখে গান্ধীজি তাঁকে বলে বসলেন, ‘গুরুদেব, তুমি জানো না যে তুমি বিষ খাচ্ছো।’  তার উত্তরে লোকটি মজা করে বলেছিলেন, ‘বিষ হবে, তবে এর অ্যাকশন খুব ধীরে। আমি বিগত ষাট বছর যাবৎ এই বিষ খাচ্ছি।’

এই রসিক পুরুষ আর কেউ নন। আমাদের বাঙালির তথা ভারতবাসীর আবেগ, ভালোবাসা কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। আজ ২৫ শে বৈশাখ। তাঁর জন্ম দিবস। এপার বাংলা ও ওপার বাংলা সহ বিশ্বের বহু জায়গায় তাঁকে স্মরণ করে চলে বিভিন্ন অনুষ্ঠান। কিন্তু এবারে লক ডাউনে সবকিছুই স্তব্ধ।

তাঁর সম্বন্ধে নতুন করে বলার কিছুই নেই। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে রবীন্দ্রনাথ বাঙালি তথা ভারতীয়দের আবেগ ও ভালোবাসার কেন্দ্রস্থল। তাই এত বছর পরও আজও তিনি রয়েছেন বাঙালির অন্তরে অন্তরে, সমগ্র ভারতবাসীর হৃদয় জুড়ে। আজও আমাদের মন থেকে হারিয়ে যায়নি ” ছোট খোকা বলে অ, আ।” আজও আমরা রোমান্টিক মুডে নিজেদের অজান্তেই গুনগুন করি ” আমার পরান যাহা চায়…….” কিংবা “পুরানো সেই দিনের কথা………।” আর আজও “চিত্ত যেথা ভয় শূন্য” কবিতা পড়েই বেড়ে ওঠে ছোটরা। তাঁকে ছাড়া আমাদের সংস্কৃতি অচল। অচল বাংলা সাহিত্য।

সাহিত্যের ক্যানভাসে তিনি জীবনের ছবি আঁকতেন। তিনি ছিলেন অনন্ত পথিক। জীবন যেন তাঁর কাছে পায়ে চলা পথ। কত প্রেম, কত নীরব বেদনা কত সৌন্দর্য ধরা পড়ে তাঁর মরমী চোখে। এক জীবনে বেঁচে থেকে তিনি সহস্র জীবন খুঁজতেন। প্রকৃতির রূপমাধুরী, নারীর অনন্ত রহস্য তাঁর কলমে যেন অনেক সহজেই ভাষা পেয়ে যেত আর রাতপাখি, বনজ হাওয়া উদাসী অরণ্য তাঁর কানে কানে যেন কথা বলত।

১৮৭৭ সালে “ভারতী” পত্রিকায় মাত্র ১৬ বছর বয়সে তাঁর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রচনা প্রকাশ হয়। সেগুলি ছিল ‘ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী’, ‘মেঘনাদবধ কাব্যের সমালোচনা’ এবং ‘ভিখারিণী’ ও ‘ নামে দুটো সুন্দর ছোটগল্প। এগুলির মধ্যে ‘ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী’ সবচেয়ে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল।

রবীন্দ্রনাথ ছিলেন স্বদেশ প্রেমের মূর্ত প্রতীক। তাঁর অনুপ্রেরণায় তৈরি হয়েছিল অনেক জাতীয়বাদী কর্মসূচী। তিনিই একমাত্র ব্যক্তি, যার লেখা গান তিনটি দেশের জাতীয় সঙ্গীত — ভারত, বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কা। তাঁর অজস্র দানে বিশ্বের সাহিত্য ভান্ডার সমৃদ্ধ। ভারতবাসীর কর্মে, চিন্তায়, সাহিত্য- সংস্কৃতিতে, ঐতিহ্যে তিনি এক নতুন প্রাণ সঞ্চার করেছেন। বিশ্ব মানব হৃদয়ে চিরকালই তিনি অমর থাকবেন, চির নুতন হয়ে।

Related Articles

Back to top button
Close