fbpx
পশ্চিমবঙ্গহেডলাইন

মাধ্যমিকে সব বিষয়ে লেটার মার্কস পেয়েও আর্থিক অনটনে উচ্চশিক্ষা অনিশ্চিত! পাশে দাঁড়াল বগুলার সেন পরিবার

শ্যামল কান্তি বিশ্বাস, বগুলা: মাধ্যমিকে এবছর ৬৬০ নম্বর পেয়েও শুভঙ্করের উচ্চশিক্ষা গ্ৰহনে অনিশ্চিত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। যার প্রধান প্রতিবন্ধকতা পারিবারিক অর্থনৈতিক সংকটময় পরিস্থিতি। দিন আনা দিন খাওয়া দিনমজুর পরিবার। একমাত্র উপার্জক শুভঙ্করের বাবা শিবু মন্ডল মিস্ত্রির কাজ করে। একজনের উপার্জনে ৫ টি পেট চালাতে হয়।।তার উপর আবার শুভঙ্কর সহ ছোট্ট বোন সংগীতার পড়াশোনা, মা, ঠাকুমা সহ বাড়ির যে কেউএর অসুখ-বিষুখ হলে চিকিৎসা খরচ, সকলের পোশাক পরিচ্ছদ আর পেরে উঠছেনা বগুলা গৌরনগরের শিবু মন্ডল। মাত্র দেড় কাঠা জমির উপর ছোট্ট একটি দোচালা টিনের ঘর, চারদিকে জীর্ণ, শীর্ণ মুলি বাঁশ ও টিনের বেড়া পাশে ছোট্ট একটি রান্না ঘর।

অপর প্রান্তে কেন্দ্রীয় সরকারি প্রকল্প স্বচ্ছ ভারত(নির্মল বাংলা)-র ছাঁদ বিহীন পাকা পায়খানা। সেখানেও কাটমানি খেয়ে যে ভাবে তৈরি করা হয়েছে, তা সত্যিই অস্বাস্থ্যকর এবং পাশে পানীয় জলের একটি টিউবয়েল। এই সব কিছু নিয়ে ই শুভঙ্করদের পরিবার এবং বেঁচে থাকা।স্কুলের শিক্ষক শিক্ষিকা দের যাবতীয় নির্দেশাবলী মেনে চলার পাশাপাশি দরিদ্র মা, বাবার মুখে হাসি ফোটাতে অদম্য ইচ্ছা শক্তির বহিঃপ্রকাশ, এবারের মাধ্যমিকে শুভঙ্করের চুরান্ত সাফল্য। প্রতিটি বিষয়ে লেটার মার্কস। ৯৪.২৮ শতাংশ নম্বর পেয়ে এলাকায় সর্বাধিক মার্কসের অধিকারী।

শুভঙ্কর এখন রাতারাতি পরিচিতির আলোকে আসলেও উচ্চ শিক্ষা গ্ৰহণের ক্ষেত্রে প্রধান প্রতিবন্ধকতা, পারিবারিক আর্থিক সংকট এবং অসচ্ছলতা। মা এবং বাবা শুভঙ্করের পরীক্ষার ফলাফলে গুলিতে আত্মহারা হলেও আর্থিক দুঃশ্চিন্তায় পাহাড় ভেঙ্গে পড়েছে তাদের মাথার উপর। কি ভাবে শুভঙ্করের স্বপ্ন, ডাক্তার হয়ে সমাজের অসহায় প্রান্তিক মানুষের সেবা করার ব্রত পূরণ করা সম্ভব! সেই চিন্তায় বিভোর। কোন পথ খুঁজে না পেয়ে শেষ পর্যন্ত শুভঙ্করের মা মনিকা মন্ডল সোস্যাল মিডিয়ায় একটি আবেদন করেন। কোন সহৃদয় ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠান যদি এগিয়ে এসে অসহায় বাবা মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে শুভঙ্কর কে আর্থিক সহায়তা সহ পড়াশোনার দায়ভার গ্ৰহণ করেন। তাহলে চিরকৃতজ্ঞের পাশাপাশি মেধাবী ছাত্র শুভঙ্করের স্বপ্ন পূরণ হবে।

শুভঙ্করের মায়ের কাতর আবেদনে ইতিমধ্যে অনেকেই এগিয়ে এসে খোঁজখবর নিলেও সাড়া দিয়েছেন বগুলার ঐতিহ্যবাহী সেন পরিবার। স্বর্গীয় দীনেশ চন্দ্র সেনের সুযোগ্য পুত্র চিন্ময় সেন এগিয়ে এসেছেন সাহায্যের ডালি নিয়ে। শুভঙ্করের পড়াশোনার পুরো দায়িত্ব ভার গ্ৰহণ করতে চান, চিন্ময় বাবু। চিন্ময় বাবুর কাঙ্খিত মনের বাসনা অনেক আগেই ব্যক্ত করেছেন প্রিয়জনদের সঙ্গে।করোনা আবহে চিন্তাভাবনা বাস্তবায়নে কিছু টা বিলম্ব ঘটলেও , বর্তমান পরিস্থিতি সেই আবহ তৈরি করে দিয়েছে। চিন্ময় বাবু এখন কর্ম সূত্রে বগুলার বাইরে। তাই পুরো প্রক্রিয়াটি সুসমাধান সহ যোগসূত্র স্থাপনের জন্য একটি মাধ্যম খুঁজছিলেন।

তিনি নিজেই যুগশঙ্খ প্রতিনিধি শ্যামল কান্তি বিশ্বাস কে ফোন করে বিষয়টি জানান। চিন্ময় বাবুর প্রস্তাব কে সাধুবাদ জানিয়ে পত্রিকার পক্ষ থেকে শুভঙ্করের মা-বাবার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে উভয় পক্ষের সঙ্গে পরিচয় পর্ব সহ মত বিনিময়ের মাধ্যমে প্রক্রিয়া টি বর্তমানে সুসম্পন্নের পথে। চিন্ময় বাবুর একটাই শর্ত, শুভঙ্কর কে বগুলা উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হতে হবে। তাহলেই শুভঙ্করের এগারো এবং বারো ক্লাসের পড়াশোনা সংক্রান্ত যাবতীয় দায়িত্বভার গ্ৰহন করবেন চিন্ময় বাবু। স্কুলে ভর্তি, বইপত্র কেনা, প্রাকটিক্যাল খাতা, পেন, পেন্সিল, প্রাইভেট টিউটর, পোশাক পরিচ্ছদ অর্থাৎ চিন্ময় বাবুর বাবা স্বগীয় দীনেশ চন্দ্র সেনের নামে একটি স্কলারশীপ চালুর মধ্য দিয়ে পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে চান স্বগীয় দীনেশ বাবুর সুযোগ্য পুত্র।

কেন এই ধরনের ভাবনা? আমরা প্রশ্ন করেছিলাম চিন্ময় বাবুকে। উত্তরে চিন্ময় বাবু জানালেন, অভিজ্ঞতা থেকেই শিক্ষা নেওয়া। বগুলা উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন চিন্ময় বাবু। ক্লাসের ফার্স্ট বয় ছিলেন তিনি। ক্লাস এইট এবং ক্লাস টেন-এ হাঁসখালি ব্লকের মধ্যে বিশেষ স্কলারশিপ প্রাপক স্টুডেন্ট চিন্ময় সেন। মাধ্যমিকে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। উচ্চ মাধ্যমিকে ও প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হওয়ার রেকর্ড চিন্ময় বাবুর সাফল্যের পালকে। উচ্চমাধ্যমিক পাশ করার পর চরম আর্থিক সংকটে স্নাতক প্রথম বর্ষে ভর্তি হওয়াই অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। ওই সময় চিন্ময় বাবুর বাবার ব্যবসা বেশ মন্দা চলছিল। সেদিনের সেই মুহূর্ত গুলো আজ ও ভূলতে পারেন নি চিন্ময় বাবু।

চরম আর্থিক সংকটে দিন কেটেছে তখন, জানালেন চিন্ময় সেন। বিএসসি অনার্স প্রথমবর্ষে ভর্তি হওয়াই যখন অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। তখন খুব কাছের এবং প্রিয় বন্ধু অংশুমান কীত্তনীয়া এবং তার মা এবং বাবা, হাঁসখালির এক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক সৌরভ বিশ্বাস এবং ভবানীপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক বুদ্ধিমন্ত বিশ্বাস চিন্ময় বাবুর পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। ওনাদের সন্মিলিত প্রচেষ্টায় চিন্ময় বাবু কৃষ্ণনগর গভর্মেন্ট কলেজে বিএ অনার্স প্রথম বর্ষে ভর্তি হন। যদিও চিন্ময় বাবুর গ্ৰাজুয়েশন কমপ্লিট করা সম্ভব হয় নি। কারণ তার আগেই চাকরি পেয়ে যান তিনি।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, চিন্ময় বাবু কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিরক্ষা বিভাগে দায়িত্বপূর্ণ পদে কর্মরত। আজ বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেই বিষয়টি উপলব্ধি এবং সিদ্ধান্ত গ্ৰহন বলে জানালেন চিন্ময় সেন। তিনি আরও বলেন, আমি আমার সাধ্যমতো চেষ্টা করবো ছাত্র ছাত্রীদের পড়াশোনার জন্য আর্থিক ভাবে পিছিয়ে পড়া পরিবার গুলির পাশে দাঁড়ানোর। এব্যাপারে চিন্ময় বাবুর পরিবার সব সময় তাকে উৎসাহ জোগায় বলে তিনি গর্বিত।

Related Articles

Back to top button
Close