fbpx
অন্যান্যপশ্চিমবঙ্গহেডলাইন

করোনা আবহেও অবিভক্ত মেদিনীপুরজুড়ে শারদ সংখ্যার ঢল

ভাস্করব্রত পতি, তমলুক : কোরোনার ভ্রুকুটিও থামাতে পারেনি অবিভক্ত মেদিনীপুরের সাহিত্যচর্চাকে। সাহিত্য-সংস্কৃতি বহাল রেখেই জেলার বিভিন্ন প্রান্তে কিন্তু শারদীয়া পত্রপত্রিকা প্রকাশে খামতি নেই। অনেকেই হাত গুটিয়ে নিলেও বেশ কিছু পত্রিকা সম্পাদক অবশ্য এই মহামারীকে তুড়ি মেরেই ফি বছরের মতো পত্রিকা প্রকাশ করেছেন। মেলেনি বিজ্ঞাপন, মেলেনি অনুদান। স্রেফ নিজের গাঁটের টাকা খরচ করেই পূজো সংখ্যার জন্ম দিলেন এঁরা। তিল তিল করে জমিয়ে রাখা সঞ্চয় খরচ হয় পূজো সংখ্যার প্রকাশে। একরাশ রক্ত ও ঘামের মিশ্রনে পাঠক মহলে পৌঁছে গিয়েছে নব নব রূপের শারদ সংখ্যা।

কবি ঋত্বিক ত্রিপাঠি সম্পাদিত শারদ ‘জ্বলদর্চি’ র বিষয় ‘ছেলেবেলা’। কলম ধরেছেন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, পবিত্র মুখোপাধ্যায়, বাণী বসু, পি সি সরকার জুনিয়র, মিরাতুন নাহার, অনিতা অগ্নিহোত্রী, মন্দাক্রান্তা সেন, মনোজ মিত্র, জাহিরুল হাসান, সমরেশ মজুমদার, শাঁওলি মিত্র, অনুত্তম ভট্টাচার্য, প্রচেত গুপ্ত, জয়ন্ত ঘোষাল, দীপ মুখোপাধ্যায়, স্বপ্নময় চক্রবর্তী, ত্রিদিব চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ বিশিষ্ট লেখকগণ। জেলার একটি পত্রিকার শারদ সংখ্যায় রাজ্যের সেরা লেখকদের লেখা প্রকাশ, অভিনবত্বের পরিচয় দেয়। হলদিয়া থেকে ফি বছর প্রকাশিত হয় শারদীয়া ‘আপনজন’। বেশ বড় আকারের কলেবর নিয়ে এপার বাংলা ও ওপার বাংলার শিল্পী সাহিত্যিক কবি লেখকদের সমাগমে পাঠকের কাছে হাজির। পত্রিকা সম্পাদক সুদীপ্তন শেঠ জানান, পত্রিকার দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য বন্ধ করা যায়না। একসময় এই পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন কবি বিধায়িকা তমালিকা পণ্ডাশেঠ। তিনি প্রয়াত হলেও পত্রিকা তার অবয়ব ধরে রেখেছে আজও। ঘাটাল থেকে লক্ষণ কর্মকারের ‘সৃজন’ এবারেও বড় বপু নিয়ে হাজির।

এবার ১৬ তম বর্ষে শারদ সংখ্যা নিয়ে হাজির রাজর্ষী মহাপাত্র এবং কৃতিসুন্দর পালের ‘সাহিত্য সম্মেলনী’। তমলুক শহরের বুকে লোকসংস্কৃতি, আঞ্চলিক ইতিহাস সহ সাহিত্যচর্চা চাগিয়ে রাখতে এই মহামারীতেও থেমে নেই শারদ সংখ্যা প্রকাশে। রতনতনু ঘাঁটি, প্রদ্যোতকুমার মাইতি, ড. রঙ্গনকান্তি জানা, আরণ্যক বসু, আমিনুল আহসান, জয়দীপ পণ্ডা, অরবিন্দ সরকার, অরিন্দম প্রধান, গৌতম ভট্টাচার্যরা কলম ধরেছেন এখানে। খড়গপুর শহর থেকেও বেশকিছু পত্রিকার শারদ সংখ্যা পাঠকদের হাতে পৌঁছে গিয়েছে ইতিমধ্যেই। অমিতাভ চক্রবর্তী সম্পাদিত ‘সাহিত্য সমাজে’র পূজো সংখ্যার বিষয় ‘ভিখিরি’। অভিনব এবং দারুণ বিষয় এটি। এছাড়াও অভিষেক রায়ের ‘সাফকথা’, গোলাম আসিকের ‘আজকের দর্পণ’, ভবতোষ নায়েকের ‘কণিকা’, শান্তনু মণ্ডলের ‘নিউজ আপডেট’, এবং বিলাস বোসের ‘খড়গপুর টাইমস’ এর শারদ সংখ্যা পাঠকমহলে সমাদৃত হয়েছে। তপন তরফদার সম্পাদিত শারদ ‘পাঁচিল পাঁচালি’ প্রায় ষাট জন লেখকের লেখায় সমৃদ্ধ। ভারত থেকে অন্ধত্ব দূর করার দিশা দেখানো হয়েছে এই পত্রিকায়।

পশ্চিমবঙ্গ গনতান্ত্রিক লেখক শিল্পী সংঘের পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা সম্পাদক তথা বিশিষ্ট কবি ও লেখক কামরুজ্জামানের অভিমত, পৃথিবীতে কোনো সমস্যাই কখনও লেখকদের কলম বন্ধ করতে পারেনি। কোরোনাও পারেনি। তার জ্বলন্ত উদাহরণ জেলা জুড়ে অসংখ্য শারদ সংখ্যার উন্মেষ। ‘বালিচক সাহিত্য সংসদে’র মুখপত্র ‘বালিভূমি’র শারদ সংখ্যায় এবার বিদ্যাসাগরকে নিয়ে বিশেষ ক্রোড়পত্র। শতাধিক লেখকের লেখায় সমৃদ্ধ জেলার সাহিত্যপ্রেমীদের কাছে এক বিশেষ উপহার। মেদিনীপুর শহর থেকে পশ্চিমবঙ্গ গণতান্ত্রিক লেখক শিল্পী সংঘের বিজয় পাল সম্পাদিত ‘শব্দের মিছিল’, সুশান্ত আদকের ‘অন্তর্জাল’, বিদ্যুৎ পালের ‘নয়ন’, শ্রীকান্ত ভট্টাচার্যর ‘রঘুবংশ’, নিসর্গ নির্যাস মাহাতোর ‘ম্যাগাজিন’, নারায়ণচন্দ্র দাসের ‘সংবর্তিকা’ এই আবহতেও প্রকাশিত হয়েছে নানা ধরনের লেখা নিয়ে। তাপস মাইতি সম্পাদিত ‘উপত্যকা’ এবার ৪০ বছরে পা দিলো।

‘লকডাউন’ কেন্দ্রিক রচনার সম্ভারে এই পূজাসংখ্যা। সম্পাদকের কথায়, কোরোনার ক্রান্তিকালে জগৎজননী মায়ের আগমন ঘটেছে। অশুভ শক্তির বিনাশ করে জগতকে কালিমা কলুষহীন, বাসযোগ্য করে তুলবে। হলদিয়া থেকে নরেশ দাস সম্পাদিত ‘তকমিনা’র শারদ সংখ্যার বিষয়ও কোরোনা আবহে মানুষের অবস্থান। করোনার থেকে বাঁচতে মুখের মাস্কে কবিতার লাইন নিয়ে ঘাটালের কেশব মেট্যার সম্পাদিত ‘মহুল’ অভিনব কায়দায় প্রকাশিত হয়েছে।

পূর্ব মেদিনীপুরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে চৈতন্যময় নন্দের ‘মহাবিদ্যা’, মধুসূদন ঘাঁটির ‘টাপুর টুপুর’, জহরলাল বেরার ‘ল্যাকেটু’, অনুপম ভৌমিকের ‘সকলের কথা’, তপন কুমার মাইতির ‘প্রমিতাক্ষর’, হরপ্রসাদ সাহুর ‘লোককৃতি’, নীলোৎপল জানার ‘লোকপথ’, শিশিরবিন্দু দত্তর ‘লাইট অ্যাণ্ড শ্যাডো’, সুব্রত চক্রবর্তীর ‘প্রেক্ষাপট’, শেখর পালের ‘সাথী’, দুরন্ত বিজলীর ‘অপরা’, অঞ্জন দাস ও বিপ্লব ভুঁইয়ার ‘শব্দরঙ’, প্রদীপ্ত খাটুয়ার ‘শব্দপথ’, তাপস বৈদ্যর ‘শব্দমালা’ প্রকাশিত হয়েছে সমারোহেই। নন্দীগ্রাম থেকে আন্তর্জাতিক কবি অমৃত মাইতি সম্পাদিত ‘অক্ষরকর্মী’ও দুই বাংলার জনপ্রিয় কবিদের লেখা নিয়ে প্রকাশ করেছে শারদ সংখ্যা। অনিমেষ দত্তর সম্পাদনায় আনন্দপুর “মুক্তধারা”র শারদ সংখ্যার বিষয় ‘দুগ্গা দুগ্গা’। এই পত্রিকা থেকে প্রাপ্ত অর্থ দেওয়ালিতে গরিবদের জন্য ব্যায় হবে।

গতবছরই বিদ্যুৎ সংযোগ হয়েছে খাজরার প্রত্যন্ত গ্রাম মার্কুণ্ডাতে। এখান থেকেও এবার চিরোজিৎ মল্লিকের সম্পাদনায় ‘একটি শিশিরবিন্দু’র শারদ সংখ্যা প্রকাশিত হোলো। শালবনির রঞ্জিত ঘোষের ‘বিষন্ন’, চন্দ্রকোনার পূর্ণেন্দু শেখর মণ্ডলের ‘কৃষ্ণচূড়া’, ঘাটালের দুঃখানন্দ মণ্ডলের ‘কোরাস’, সবংয়ের নারায়ণ সামাটের ‘আলোর মেলা’, দাঁতনের সূর্য নন্দীর ‘এবং সায়ক’, ঝাড়গ্রামের কৃষ্ণ সৎপথির ‘মেঠোপথ’, চিঁচিড়ার সৌমেন সাউয়ের ‘চালচিত্র’, সাঁকরাইলের প্রদীপ মাইতির ‘লিপিকা’, তমলুকের জয়দেব মালাকারের ‘তাম্রলিপ্ত’, গড়বেতার কাশীনাথ সাহার ‘সোনার তরী’র শারদ সংখ্যা প্রকাশে বাধা হতে পারেনি কোরোনা ভাইরাসের সংক্রমণ।

জেলার অন্যতম জনপ্রিয় কবি আশিষ মিশ্র জানান, মহামারী কি সাহিত্য চর্চার পথে বাধা হতে পারে? কোরোনা পারেনি লেখক সম্পাদকদের সৃজনশীলতাকে হত্যা করতে। তাই প্রাথমিকভাবে পত্রিকা প্রকাশের সমস্যা এড়িয়েই জেলা জুড়ে এবার শারদ সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে নজরকাড়া। কিছু পত্রিকা পূজোর মুখে প্রকাশিত হয়েছে। কিছু পূজোর পরেই বেরোবে। কিন্তু শারদ পত্রিকার প্রতি অদম্য আগ্রহ আর ভালোবাসাই পত্রিকার আত্মপ্রকাশে অন্যতম মূলধন।

মেদিনীপুর লিটল ম্যাগাজিন আকাডেমীর সম্পাদক তথা ‘জ্বলদর্চি’ পত্রিকার সম্পাদক ঋত্বিক ত্রিপাঠি জানান, লিটল ম্যাগাজিন সময়ের সঙ্গে চলতে জানে। একই সঙ্গে আধুনিকতা ও ঐতিহ্য পরম্পরায় বিশ্বাসী। এই কোভিড পরিস্থিতিতে তাই অনেকেই ই-ম্যাগাজিন করে অস্তিত্ব বজায় রাখতে চাইছেন। তেমনি যাঁদের পক্ষে সম্ভব, তাঁরা মুদ্রণ মাধ্যমে ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছেন। লিটল ম্যাগাজিন জানে তার লড়াই নিজের সঙ্গেই। সময়ের সঙ্গে সে অভিযোজিত হতে জানে।

Related Articles

Back to top button
Close