fbpx
অন্যান্যকলকাতাহেডলাইন

সুচিত্রা মিত্রের ছাত্রী হয়েও নিজস্বতায় মন জয় করেছেন তিনি

অরিজিৎ মৈত্র: একটা সময় ছিল যখন রবীন্দ্রনাথের গান গাওয়ার জন্য আবিষ্কৃত হত নিত্যনতুন কণ্ঠস্বর।রবীন্দ্রজন্মশতবার্ষিকীর আগে এবং পরেও শ্রোতারা পরিচিত হয়েছিলেন বহু নবীন কণ্ঠস্বরের সঙ্গে।  কনক দাস, অমিয়া ঠাকুর, সাহানা দেবী, মেনকা ঠাকুরের পরের প্রজন্ম মায়া সেন, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, সুচিত্রা  মিত্র, রাজেশ্বরী দত্ত প্রমুখ। এরপরে কবির গান সর্বসাধারণের কাছে পৌঁছে দিতে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন পূরবী মুখোপাধ্যায়, চিত্রলেখা চৌধুরী, পূর্বা দাম, সুমিত্রা সেন, গীতা ঘটক,ঋতু গুহ। বাংলা আধুনিকগানের  শিল্পীরাও রবীন্দ্রসংগীত গাইবার জন্য এগিয়ে এসেছিলেন। লতা মঙ্গেশকরও ছিলেন এই তালিকায়। তৃতীয় প্রজন্মের তালিকার অন্যতম  বিশিষ্ট শিল্পী পূর্বা দাম। তাঁর কণ্ঠে রাবীন্দ্রিক আবেদন ছাড়াও ছিল এক দৃপ্তভঙ্গি। তার সঙ্গে মিলেছিল সফিসটিকেশন। সেই আভিজাত্য কিন্তু রবীন্দ্রনাথের গানকে কলকাতার অভিজাত আবাসনের বাইরেও  হাটে, মাঠে, বাটে পৌঁছে দিয়েছিল।

সুচিত্রা মিত্র’র সঙ্গে শিল্পী

রবিতীর্থ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার বহু আগেই পূর্বা দাম, সুচিত্রা মিত্রের কাছে গান শিখতে শুরু করেন। সুচিত্রা মিত্র  ধারার গায়কী অসাধারণ দ্রুততার সঙ্গে রপ্ত করলেও পূর্বা দাম কিন্তু নিজের স্বতন্ত্রতা বজায়  রেখেছিলেন চিরকাল।  বেশ কিছু গানকে অনায়াসেই পূর্বা দামের গান হিসেবে অভিহীত করা যায়। সেই সব গান অবশ্যই  রবীন্দ্রনাথের গান কিন্তু সেই গানগুলোতে অত্যন্ত যত্ন সহকারে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন শিল্পী। যেমন- ‘এবার আমায় ডাকলে দূরে’, ‘সীমার মাঝে অসীম তুমি’,‘যাদের চাহিয়া তোমারে ভুলেছি’, ‘আমারে যদি জাগালে আজি নাথ’, ‘ওহে সুন্দর মম গৃহে আজি’, ‘আকাশ আমায় ভরল আলোয়’, ‘উতল ধারা বাদল ঝরে’, ‘আমার বিচার তুমি করো’, ‘না বুঝে কারে তুমি ভাসালে আঁখি জলে’, ‘রয় সে কাঙাল’ ইত্যাদি গানগুলি বহুশ্রুত  হলেও, পূর্বা দামের কণ্ঠে প্রতিবারই নতুনভাবে রূপ পেত কারণ তাল, ল্য় এবং সুরের সঙ্গে ভাবের  সংযোগ ঘটানোর কাজটা সঠিকভাবে বুঝেই করতেন শিল্পী।

তাঁর টাইমিং ছিল অতুলনীয়। ভয়েস ক্রুনিং অর্থাৎ মিনমিন করে রবীন্দ্রসংগীতকে কখনও উপস্থাপন করার প্রয়োজনবোধ করেননি। তিনি মনে করতেন পরিষ্কার উচ্চারণের মাধ্যমে রবীন্দ্রসংগীতের আইডেনটিটি ধরে রাখা ভীষণ প্রয়োজন। উদাত্ত কণ্ঠে গান গাইলে, সেই গানের মর্যাদা কোনওভাবেই খর্ব হয় না। নিজের ছাত্রীদেরকেও সেইভাবেই সুচিত্রা মিত্রর ঘরানার রবীন্দ্রসংগীতে তালিম দিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনৃত্যনাট্য ও রবীন্দ্রগীতিনাট্যের যে সব রের্কড প্রকাশিত হয়েছে এখনও পর্যন্ত, তাতে হয়ত লিড সিঙ্গারের ভূমিকায় পূর্বা   দামকে তেমনভাবে দেখা যায়নি, কিন্তু সম্মেলক সংগীতেও নিজের স্বা্ক্ষর রেখেছেন প্রতিবারই। এতো  গেল শিল্পী পূর্বা দামের কথা।

আরও পড়ুন: বাড়ছে সংক্রমণ, আক্রান্ত ছাড়াল ৫৯ লাখের গণ্ডি

অন্যদিকে মানুষ পূর্বা দামের কথা বলার লোভ সামলানো যায় না। নাম, যশ, খ্যাতি থাকা মানুষটি প্রকৃত অর্থেই ছিলেন মাটির মানুষ এবং আপাদমস্তক ভদ্রলোক। অহংকারের কোনও অংশ তাঁকে কোনওভাবেই  ছোঁয়নি। ওপার বাংলার সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম। পূর্বা সিনহার দাদা অধ্যাপক সুরজিৎ সিনহা এক সময় ছিলেন  বিশ্বভারতীর উপাচার্য। ইতিহাসবিদ নরেশ সেনগুপ্তদের সঙ্গে ছিল তাদের আত্মীয়তা। রবিতীর্থ গঠনে দ্বিজেন চৌধুরীর মত  তাঁরও অবদান কম ছিল না। সুচিত্রা মিত্রর প্রিয় ছাত্রীদের অন্যতম হয়েও কোনও এক কারণে দীর্ঘ সময় তাঁদের ভেতর যোগাযোগ তেমনভাবে ছিলনা। চিরকাল যাত্রীদলের পেছনে থেকেই তিনি রবীন্দ্রসংগীত চর্চা করে গেছেন। কখনও খালি হাতে তাঁর কাছ থেকে কারুকে ফিরতে হয়নি। মুখের হাসিটি বজায় রেখে চেষ্টা করতেন সাধ্যমত সাহায্য করতে। পারিবারিক পরিচয়ের বৃত্তের বাইরে গিয়ে তাঁর কাছে যখনই কোনও  অনুষ্ঠানে গান গাইবার অনুরোধ করেছি, তখনই কোনও পারিশ্রমিক ছাড়াই এক কথায় গাইতে রাজি হয়ে গেছেন। যাক, ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণের সময় নয়। মনের সঞ্চিত কথা মনেই থাকুক।

একই মঞ্চে শিল্পী সুমিত্রা মুখার্জির সঙ্গে

আরও পড়ুন: পুলিশের নিরপেক্ষ তদন্তের অভাবে মাদকের রমরমা ব্যবসা নিয়ে রাজ্যকে সতর্ক হাইকোর্টের

গত কয়েক বছর ধরেই অ্যালজাইমারে ভুগছিলেন। স্মৃতি বিশ্বাসঘাতকতা করছিল। চেনা মানুষের অবয়ব অচেনার রূপ ধরে চোখের উপর ভেসে উঠত। বছর ছয়েক আগে একবার তাঁর বাড়িতে গেলে বলেছিলেন,  জানিস, গলাটাই  খারাপ হয়ে গেছে, যেটা  খুবই দুঃখজনক।  শিল্পী যদি গান গাইতে না পারেন, তার থেকে সত্যিই দুঃখজনক কিছু হতে পারে না। শুনলাম মাস খানেক আগে তাঁর একমাত্র জামাই করোনায় আক্রান্ত হয়ে চলে গেছেন। সেই দুঃখের রূপ প্রত্যক্ষ করার মত অনুভূতি পূর্বাদির ছিল কিনা জানি না। আপাতত রোগ-ব্যাধির উর্দ্ধে তাঁর বাস। সীমার মাঝে অসীমে তাঁর অবস্থান। সেখানে তাঁর মুক্তি আলোয় আলোয়, যেখানে আকাশ তাঁকে আলোয় ভরিয়ে রেখেছে।

Related Articles

Back to top button
Close