fbpx
কলকাতাহেডলাইন

‘চির নূতনের দিল ডাক… ‘২৫ বৈশাখ

যুগশঙ্খ ডিজিটাল ডেস্ক:                     ‘তুমি রবে নিরবে হৃদয়ে মম…’ 

এবার ঘরে বসে সারতে হচ্ছে কবি প্রণাম। করোনার কাঁটায় ঘরবন্দি রাজ্যবাসী।  রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মজয়ন্তীতে কলকাতার জোড়াসাঁকোয়, শান্তিনিকেতনে বিশ্বভারতী প্রাঙ্গণে এবং বাংলার আরও অনেক স্থানেই রবীন্দ্রনাথের লেখা গানে, কবিতায় ছন্দে ছন্দে আন্তরিকতার সঙ্গে পালিত হয় রবি ঠাকুরের জন্মদিন৷ কিন্তু করোনার ধাক্কায় এবার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মজয়ন্তী অনুষ্ঠানে কাটা৷ চলছে তৃতীয় দফায় লকডাউন৷ তাই এবার ২৫ বৈশাখে রাজ্য সরকারও অনলাইনে কবি প্রণামের আয়োজন করেছে৷সরকারি স্তরে না বেসরকারি স্তরে। এমনকি রবীন্দ্রভারতী আর বিশ্বভারতীতেও হচ্ছে না কোনও অনুষ্ঠান। সর্বত্র কবির প্রতিকৃতীতে মাল্যদানের মধ্যে দিয়েই সীমাবদ্ধ করা হচ্ছে ২৫শের রবিস্মরণ, রবি বরণ।

৪৯ , পার্ক স্ট্রিট ঠিকানার বাড়ি। এই বাড়িতেই পালিত হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের প্রথম জন্মদিন। শেষ জন্মদিন পালিত হয়েছিল ১৪ এপ্রিল, ১৯৪১ এ শান্তিনিকেতনে। কিন্তু কখন যে শহরের বুক থেকে হারিয়ে গিয়েছে রবির প্রথম জন্মদিন পালনের স্মৃতিধন্য বাড়ি তা জানা যায়নি। রবীন্দ্র জন্মদিবসে সেজেগুজে হাজির হয় জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি। সেখানে কবির জন্মকক্ষে গিয়ে চলে রবীন্দ্রানুরাগীদের শ্রদ্ধাজ্ঞাপন। সঙ্গে জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি প্রাঙ্গণে চলে নানা প্রদর্শনী। আর চলে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের তরফে আয়োজিত নানা অনুষ্ঠান যা দেখতে ভিড় থাকে সকাল থেকেই। এবার সেই সব অনুষ্ঠান গিয়েছে বাতিলের তালিকায়। শুধুমাত্র রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের তরফে উপাচার্য কবির প্রতিকৃতীতে মাল্যদান করে এবছরের মতো রবিপ্রণাম সেরে ফেলবেন। এর বাইরেও রাজ্যজুড়ে কোথাও কোনও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, প্রভাতফেরী, প্রদর্শনী, জামায়েত, মেলা কোথাও কিছু করতে দেওয়া হচ্ছে না। এমনকি কবির স্মৃতিধন্য বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় বা শান্তিনীকেতনেও হচ্ছে না কোনও অনুষ্ঠান। কবির প্রয়াণের পর কবির জন্মদিন পালনে এই প্রথম ছেদ পড়ল সেখানে।প্রতিবছর এই দিনে উপাসনা মন্দিরে সংগীত ভবনের ছাত্রছাত্রীরা সংগীত পরিবেশন করেন। পরে রবীন্দ্রভবনের উদয়ন গৃহে রবীন্দ্র প্রতিকৃতিতে মাল্যদান করা হয়। পরে ঘন্টায়তলায় পাঠভবনের ছাত্রছাত্রীরা কবিতাপাঠ, রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশন-সহ বিভিন্ন অনুষ্ঠান করে থাকেন। এইবছর এসবেই পড়েছে দাঁড়ি। বিশ্বভারতী সূত্রে জানা গিয়েছে, এদিন ভোরে শান্তিনিকেতন বাড়ি থেকে বাজবে কবিকণ্ঠ। সকাল ৮টা নাগাদ উপাচার্য বিদ্যুৎ চক্রবর্তী উপাসনা মন্দিরে যাবেন। সেখান থেকে দু’-চারজন তাঁর সঙ্গে রবীন্দ্রভবনে রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতিতে ফুল দেবেন। এরপর সেখান থেকেই তাঁরা চলে যাবেন ছাতিমতলায়। সেখানে খুব ছোট্ট করে কোনও অনুষ্ঠান হলেও হতে পারে। তবে শান্তিনিকেতনের প্রাক্তনী থেকে আশ্রমিক, সকলেই ঠিক করেছেন নিজেদের মতো করে তাঁরা বাড়িতে রবীন্দ্রসংগীত গেয়ে, কবির কবিতা পাঠ করেই কবিগুরুকে স্মরণ করবেন।

 

রবীন্দ্রনাথ এক কথায় বলতে গেলে বাঙালি আবেগ। ছোট থেকে মৃত্যু পর্যন্ত তার লেখায় অনুপ্রানিত করেছে বাঙালিকে। তিনি সাহিত্যের সব শাখাতে দোর্দণ্ড প্রতাপে বিচরণ করলেও তার প্রথম ও শেষ পরিচয় তিনি ‘কবি। তিনি না থেকেও বার বার ফিরে আসেন আমাদের জীবনে, তিনি যেন মহাসাগর যা কোনও কোন শেষ নেই, অফুরন্ত। এক অসমাপ্ত উপন্যাস। আমার কখন মনে হয় তিনি ছোট গল্প, যা শেষ হয়ে তার রেশ  আমাদের জীবনে বিরাজ মান। প্রেমের মাদকতা তার লেখায় বারবার ধরা দিয়েছে।নারী মনস্তত্বকে বিশেষ প্রাধান্য দিয়েছেন তার লেখনীতে…নারীকে সম্মান করেছেন । নারী শুধু ভোগ্যপণ্য নয় তার আপন সত্তায় সে মহীয়ান হতে পারে সে কথা তিনি বহু কবিতায় গানে বলেছেন । প্রকৃতি প্রেম তাঁর কাব্য কবিতায় এমন সুন্দরভাবে সন্নিবেশিত হয়েছে যার কোনো তুলনা নেই ।

তীব্র কল্পনাপ্রবণতা, সুদূরের প্রতি আকর্ষণ, সূক্ষ্ম সৌন্দর্যবোধ, প্রকৃতির প্রতি বাঁধভাঙা আকর্ষণ রবীন্দ্র প্রতিভার প্রধানতম বৈশিষ্ট্য। এসব বৈশিষ্ট্য রবীন্দ্রনাথের প্রেমানুভূতিকে দারুণভাবে শাসন করেছে। ফলে প্রেমানুভূতির জন্য রবীন্দ্রনাথের কাছে নারীর প্রত্যক্ষ শারীরিক উপস্থিতির প্রয়োজন হয়নি। বরং নারীর শারীরিক উপস্থিতিকে তিনি প্রেমের অন্তরায় বলে মনে করতেন। রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন, কাঙ্ক্ষিত নারী যখন কল্পনা থেকে বাস্তবের মধ্যে চলে আসে, কল্পনার অসীম থেকে সংসারের সীমার মধ্যে চলে আসে, তখন প্রেম আর থাকে না। কারণ ‘অনন্ত আকাশের ফাঁক না পেলে বাঁশি বাজে না’। এ কারণে একসময় যে নারী ছিল সংসার-সীমার বাইরে কল্পনার মায়াঞ্জন মাখা, সে যখন সংসারের মধ্যে এসেছে তখন ওই নারী আবিষ্কার করেছে যে তাদের মধ্যে আগের সেই প্রেমের তীব্রতা নেই। নারী নিজেই তাদের প্রেম ফুরিয়ে যাওয়ার ব্যাখ্যা করেছে এভাবে,

‘এখন হয়েছে বহু কাজ, সতত রয়েছ অন্যমনে।

সর্বত্র ছিলাম আমি এখন এসেছি নামি

হৃদয়ের প্রান্তদেশে, ক্ষুদ্র গৃহকোণে।’ (‘নারীর উক্তি’, মানসী)

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রেমের প্রশ্নে ছিলেন আদ্যোপান্ত বিশুদ্ধতাবাদী। প্রেমের ক্ষেত্রে শরীরকে তিনি বরাবরই গৌণ মনে করতেন। এ কারণে উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য তাঁর রবীন্দ্রকাব্য-পরিক্রমা গ্রন্থে বলেছেন, ‘যে প্রেম বুভুক্ষিত দৃষ্টিতে দেহের চারিপাশে ঘুরিয়া মরে, ব্যক্তি-মানুষের বাস্তব দেহ-মন যাহার ভিত্তি, সেই আবেগময়, আত্মহারা, সাধারণ মানুষের প্রেম রবীন্দ্রনাথের প্রেম নয়।…প্রেম অসীম, অনন্তের ধন, আত্মার সম্পদ, দেহের সীমায় তাহাকে ধরা যায় না। দেহসম্বন্ধ বিরহিত, অপার্থিব সৌন্দর্যের নিবিড় অনুভূতি এক অনির্বচনীয় আনন্দরস।’

রবীন্দ্রনাথের কবিতা সুখ-দুঃখে, আনন্দ-বেদনায়, শান্তি-সংগ্রামে মানুষকে প্রেরণা দেয়। বাংলা ভূখণ্ডের বাইরে তথা পৃথিবীর দেশে দেশে আজো তার অগণিত কবিতা পাঠক রয়েছেন। রবীন্দ্র কবিতার সুধা যিনি একবার পান করেছেন তিনিই রবিপ্রেমে আকণ্ঠ নিমজ্জিত হয়েছেন। শুধু কবিতা নয়, রবীন্দ্রনাথের গানও বাঙালির চির আনন্দের ধন। রবীন্দ্রনাথের গান দোলা দেয় না- এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া ভার, প্রতি রাতে রবীন্দ্রনাথের গান শুনে আমি নিদ্রামগ্ন হই। প্রভাতে রবীন্দ্র সঙ্গীতেই ঘুম ভাঙে আমার। শুধু আমি নই, আমার মতো এ রকম কোটি কোটি ভক্ত আছেন রবীন্দ্র সঙ্গীতের। নানা বয়সের মানুষের জন্য সাহিত্যরস জুগিয়েছেন বাঙালি সন্তান রবি। মানব-মানবীর হৃদয়ের আবেগকে রবীন্দ্রনাথের মতো আর কোনো কবি শব্দে-ছন্দে-গানে রূপায়িত করেছেন বলে সাহিত্যের ইতিহাসে জানা যায় না।

আরও পড়ুন: রাষ্ট্রভাবনা- রবীন্দ্রনাথ ও রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ

বাংলার প্রকৃতি রবীন্দ্রনাথকে দিয়েছে অসীম প্রেরণা আর রবীন্দ্রনাথও সেই প্রেরণায় প্রাণিত হয়ে সৃষ্টি করেছেন তার শ্রেষ্ঠতম সাহিত্য সম্পদ। রবীন্দ্রনাথ নিজেকে ‘রবি বাউল’ বলে যে পরিচয় দিয়েছেন তার বাউল প্রীতির উৎস কিন্তু বাংলার শিলাইদহই। শিলাইদহে এসেই তিনিই পরিচিত হন লালন, গগন হরকরা, হাসন রাজার মতো বাউল কবিদের সঙ্গে। রবীন্দ্রনাথের গানে বাউলের সুর যুক্ত হওয়ার পেছনেও আছে শিলাইদহে বসবাসের প্রেরণা। বাংলা প্রীতি ও বাঙালি সংস্কৃতির প্রতি চিরদিনই দায়বদ্ধ ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। বাংলা সাহিত্যের প্রতিটি শাখায় রয়েছে তাঁর উজ্জ্বল উপস্থিতি । সোনারতরী, ক্ষণিকা, মানসী, পূরবী, চিত্রা, গীতালী, গীতাঞ্জলির মতো অজস্র কাব্য-কবিতা,  ডাকঘর, রাজা, রক্তকরবী, বিসর্জন, মুক্তধারা প্রভৃতি অসামান্য নাট্যসম্ভার, বৌঠাকুরানীর হাট, গোরা, চতুরঙ্গ, ঘরে বাইরে প্রভৃতির মত উপন্যাস, ছুটি, সুভা, দানপ্রতিদান, পোস্টমাস্টার, দেনাপাওনা অতিথির মতো অসংখ্য ছোট গল্প যা বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে । শিক্ষা, দর্শন, রাজনীতি, সমাজনীতি, বিজ্ঞান প্রভৃতি বিষয় নিয়ে লিখেছেন একাধিক প্রবন্ধ । আর সঙ্গীত— এখানে এর কোনো তুলনা করা যাবে না । রবীন্দ্রসংগীত বিশাল সমুদ্রের মতো । সংগীত রচয়িতা হিসাবে তিনি রাজাধিরাজ । প্রেম, প্রকৃতি, পূজা ঈশ্বরভাবনা সবকটি দিকেই রয়েছে অজস্র গানের ডালি ।রবীন্দ্রনাথ সামান্য একজন মানুষ নন— তিনি মহামানব । তাঁর মধ্যে মানবপ্রেম, প্রকৃতিপ্রেম, ভগবৎপ্রেম সব কিছুই এত সুন্দর ভাবে ও এমন পরিপূর্ণভাবে প্রকাশ পেয়েছে যা সত্যি অতি বিস্ময়কর ।  মানবপ্রেমিক কবি আমাদের শিখিয়েছেন মানুষকে ভালোবাসতে, ক্ষমাসুন্দর চোখে দেখতে । মানুষেরে ভালোবাসলে ভাগবানকে ভালবাসা হয়

” যেথায় থাকে সবার অধম দীনের হতে দীন

সেইখানে যে চরণ তোমার রাজে

সবার পিছে, সবার নীচে সবহারাদের মাঝে ।”

 

রবীন্দ্রনাথের কবিতায় ও গানে তরুণদের সর্বদা কবি উদ্দীপিত করেছেন—

 

” ওরে নতুন যুগের ভোরে\

দিসনে সময় কাটিয়ে বৃথা

সময় বিচার করে ।

চলায় চলায় জাগবে জয়ের ভেরী

পায়ের বেগে পথ কেটে যায়

করিস না আর দেরী । ”

প্রতিটি ঋতু— গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত, বসন্ত যেন এক একটি জীবন্ত চরিত্র ।  ‘এসো হে বৈশাখ’,  ‘শরৎ তোমার অরুণ আলোর অঞ্জলি’  প্রভৃতি গানের মধ্যে দিয়ে প্রতিটি ঋতুর সুন্দর বৈশিষ্ট্য যেভাবে পাই আর কোথাও সেভাবে পাওয়া যায় না ।

ঈশ্বরচিন্তা বা পূজাপর্যায়ের গানের মধ্যে দিয়েই তিনি দেখিয়েছেন যে, দেবতা কোনো বদ্ধ ঘরে আবদ্ধ থাকেন না যেখানে

” তিনি গেছেন যেথায় মাটি ভেঙ্গে করছে চাষা চাষ

পাথর ভেঙ্গে কাটছে যেথায় পথ, খাটছে বারো মাস

রৌদ্রে জলে আছেন সবার সাথে ।”

এত বছর পরেও রবীন্দ্রনাথের জীবনদর্শন ও সৃষ্টি দারুন ভাবে আজকের সমাজে প্রাসঙ্গিক । কারণ রবীন্দ্রনাথের জীবনদর্শন ও সৃষ্টি আমাদের এই অস্থিরময় জীবনে সঠিক পথের দিশা দেখাতে পারে, পারে আত্মগ্লানির হাত থেকে মুক্তি দিতে ।  দমবন্ধকর আবহাওয়া থেকে একটু খোলা হাওয়া এনে দিতে পারে রবীন্দ্রসংগীত । ‘ আলোকের এই ঝর্ণা ধারায় ‘ কিছুক্ষণের জন্যে হলেও মানুষ একটু স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতে পারে । ২৫শে বৈশাখের এই সকালে কবিগুরুকে প্রণাম ……

Related Articles

Back to top button
Close