fbpx
ব্লগহেডলাইন

প্রত্যেক নার্সরাই একেক জন ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল

মনোজ রায়:

সেবা পরম ধর্ম। কথাটা আমরা সকলেই শুনে আসছি ছোট বেলা থেকে। এই সেবা কথাটার সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত নার্স। আর নার্স বলতেই আজও আমাদের চোখের সামনে যে ছবিটি সবার আগে ভেসে উঠে তা হল, “প্রদীপ হাতে একটি মেয়ে” বা “The Lady with the Lamp” । হ্যাঁ, আমি সেই মহিয়সি নারী ফ্লোরেন্স নাইটিংগেলের কথাই বলছি। তাঁকে নার্সিং এর জননী বলা হয়। ১৯৭৪ সাল থেকে তাঁর জন্মদিন উপলক্ষে সারা পৃথিবী জুড়ে এই ১২ মে দিনটি আন্তর্জতিক নার্স দিবস বা বিশ্ব নার্স দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।

করোনাভাইরাসের ভ্রুকুটিকে উপেক্ষা করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নিরলস সংগ্রাম করে চলেছেন বিশ্বের প্রতিটি দেশের করোনা-যোদ্ধারা। তাঁদের মধ্যে নার্সদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চিকিত্‍সা পরিষেবার মেরুদণ্ডই বলা চলে নার্সদের। যে কোনও প্রতিকূল পরিস্থিতে ভয়াবহ বিপদের মুখোমুখি হয়েও মুমূর্ষুর সেবায় তাঁরা অটল, নির্বিকার। রোগশয্যা থেকে অপারেশন থিয়েটার, বরাবর তাঁরাই রোগী থেকে ডাক্তার সকলের প্রধান ভরসা। নিজেদের প্রাণসংশয়ের পরোয়া না করে গোটা বিশ্বজুড়ে মানুষের সেবায় ঝাঁপিয়ে পড়েছেন নার্সরা। আজ বিশ্ব নার্স দিবসে এটা আরও একবার প্রমাণ করল ভারতীয় নার্সরা।

শুধু দেশের গণ্ডীর মধ্যে থেকেই নয়, বিদেশে গিয়েও করোনা মোকাবিলার নজির গড়লেন ভারতীয় নার্সরা। করোনা মোকাবিলায় ভারতে থেকে এবার সাহায্য চেয়েছিল সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। সাহায্য চাওয়া মাত্রই ভারত ৮৮ জনের একটি নার্সের দল সেখানে পাঠিয়ে দিয়েছে। শনিবার রাতে বিশেষ বিমানে নার্সের দল দুবাইয়ে পৌঁছেছে বলে ইউএই তরফে জানানো হয়েছে। এই ৮৮ জন নার্সের দলটি কেরল, কর্ণাটক এবং মহারাষ্ট্রের অ্যাসিটার ডিএম হেলথ কেয়ার হাসপাতাল থেকে বাছাই করে পাঠানো হয়েছে। শুধু তাই নয়, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতীয় নার্সদের ছিল এক অপরিসীম ভুমিকা। ভারতের শরনার্থী শিবিরে অসহায় মানুষের চিকিতসা সেবা প্রদান বা ভারতে অবস্থিত ততকালীন বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতালে আহত মুক্তিযুদ্ধাদের চিকিতসা সেবা প্রদানে বিশাল ভুমিকা রেখেছে অসংখ্য ভারতীয় নার্স।

নার্সিং এর ইতিহাস লক্ষ করলে দেখা যায়, পেশাগতভাবে নার্সিং এর জন্ম হয়েছিল মূলত যুদ্ধক্ষেত্র থেকে। ক্রিমিয়াম যুদ্ধে আহত সেনাদের মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে নতুন জীবন দান করেছিলেন ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল। সেই ক্রিমিয়াম যুদ্ধক্ষেত্র থেকেই বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে নাইটিংগেলের সেই সেবা শুশ্রূষার কাজ। যা পরবর্তীতে মডার্ন নার্সিং এর রূপ নেয়। ১৮২০ সালের ১২ মে ইতালিতে বাবা উইলিয়াম এডওয়ার্ড নাইটিঙ্গেল এবং মা ফ্রান্সিস নাইটিঙ্গেলের ঘর আলো করে জন্ম গ্রহণ করেন ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল। জন্মস্থান ফ্লোরেন্স শহরের নামানুসারেই মেয়ের নামকরণ করেন বাবা-মা। সেই সময় নারী শিক্ষার প্রচলন না থাকলেও ফ্লোরেন্সের বাবা তাঁর দুই মেয়েকে তিনি বিজ্ঞান, গণিত, ইতিহাস ও দর্শন বিষয়ে শিক্ষার ব্যবস্থা করেন।

ফ্লোরেন্স বিশ্বাস করতেন স্রষ্টা তাকে সেবিকা বা নার্স হওয়ার জন্যই পাঠিয়েছেন। মাত্র ১৭ বছর বয়সেই এই উপলব্ধি করেন তিনি। তখন সেবিকা পেশাককে নিচু দৃষ্টিতে দেখা হতো বলে ফ্লোরেন্সের সিদ্ধান্ত মেনে নিতে চাননি বাবা-মা। অবশেষে হাল না ছাড়া মেয়েটির সিদ্ধান্তকেই গুরুত্ব দিতে বাধ্য হন। তারপর ১৮৫১ সালে নার্সের প্রশিক্ষণ নিতে জার্মানিতে পাড়ি দেন তিনি।  ১৮৫৩ সাল থেকে ১৮৫৪ সাল পর্যন্ত লন্ডনের ‘কেয়ার অব সিক জেন্টলওমেন ইনিস্টিটিউটের’ তত্ত্বাবধায়ক হিসাবে কাজ করেন। এরপর ১৯৫৪ সালে ব্রিটেন, রাশিয়া ও ফ্রান্সের যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ৩৮ জন সেবিকাকে নিয়ে যুদ্ধভূমিতে নিয়োজিত হন ফ্লোরেন্স। দুই বছর ধরে চলা ক্রিমিয়া যুদ্ধে ফ্লোরেন্স ও তার সেবিকারা আহতদের ক্লান্তিহীন সেবা শুশ্রূষার মাধ্যমে নতুন জীবন দান করেন।

১৮৫৫ সালে তিনি সেবিকা প্রশিক্ষণের জন্য তহবিল সংগ্রহের কাজ শুরু করেন। চার বছরে সংগ্রহ করেন প্রায় ৪৫ হাজার পাউন্ড। পরবর্তী সময়ে তিনি ভারতবর্ষের গ্রামীণ মানুষের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর গবেষণা চালান। যা ভারতবর্ষে উন্নত স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ইংল্যান্ডের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা উন্নয়নেও তিনি বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন। ১৮৫৯ সালে রয়্যাল স্ট্যাটিসটিক্যাল সোসাইটির প্রথম সারির সদস্য নির্বাচিত হন ফ্লোরেন্স। ১৮৬০ সালে তিনি লন্ডনের সেন্ট থমাস হাসপাতালে নার্সিংকে সম্পূর্ণ পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য প্রতিষ্ঠা করেন ‘নাইটিঙ্গেল ট্রেনিং স্কুল’ যার বর্তমান নাম ‘ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল স্কুল অব নার্সিং’।

ফ্লোরেন্সকে অসংখ্য পদক আর উপাধিতে সম্মানিত করা হয়েছে। ১৮৮৩ সালে রাণী ভিক্টোরিয়া তাকে ‘রয়েল রেডক্রস’ পদক প্রদান করেন। ১৯০৭ সালে প্রথম নারী হিসাবে খেতাব লাভ করেন ‘অর্ডার অব মেরিট’। ১৯০৮ সালে লাভ করেন লন্ডন নগরীর ‘অনারারি ফ্রিডম’ উপাধি। ক্রিমিয়ার যুদ্ধে আহত সৈন্যদের সেবার মাধ্যমে নার্সিংকে তিনি অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ায় তাকে ডাকা হতো ‘দ্য লেডি উইথ দ্য ল্যাম্প’। এই মহীয়সী নারী ১৯১০ সালের ১৩ অগাস্ট ৯০ বছর বয়সে মারা যান। এরপর ইংল্যান্ডের হ্যাম্পশায়ারে সেন্ট মার্গারেট চার্চে তাকে সমাহিত করা হয়।

ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলের জন্য একাধিক স্বীকৃতিও রাখা রয়েছে। তাঁর নামে চারটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা হয় ইস্তাম্বুলে। লন্ডনের ওয়াটারলু ও ডার্বিতে রাখা হয়েছে তার প্রতিকৃতি। লন্ডনের সেন্ট থোমাস হসপিটালে ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল নামে একটি মিউজিয়াম রয়েছে। ব্রিটিশ লাইব্রেরি সাউন্ড আর্কাইভে তার কণ্ঠস্বর সংরক্ষণ করা হয়েছে। যেখানে ফ্লোরেন্স বলেছেন- ‘যখন আমি থাকব না, সেই সময় আমার এই কণ্ঠস্বর আমার মহান কীর্তিগুলোকে মানুষের কাছে মনে করিয়ে দেবে এবং এসব কাজের জন্য উৎসাহ জোগাবে।’

ফ্লোরেন্স আজও বেঁচে আছেন বিশ্বের সকল নার্সদের সেবাকর্মের মধ্য দিয়ে। কিন্তু কালের বিবর্তনে বা সঠিক ইতিহাস রচনার অবহেলায় বা জাতী ভুলতে বসেছে নার্সদের সেই মহান আত্বত্যাগ আর অবদানের কথা। ভাবতে খুবই অবাক লাগে আমাদের দেশেই, যেখানে নারীকে মা, প্রেমিকা, বোন হিসেবে দেখা হয়, সেই ভারতবর্ষেই দিন কয়েক আগে নার্সদের অশ্লীল আক্রমণ করছিল তাবলীগ জামাতের কিছু বিকৃত রুচির পুরুষ। নার্সদের উপর থুতু দিচ্ছিলো, যা খুশি খাবারের দাবি করছিল, নিজেদের প্যান্ট খুলে নার্সদের নোংরা ইশারা করে বাজে বাজে মন্তব্য করছিল। একই সঙ্গে হাসপাতালের মধ্যে জোরে জোরে বাজে ভাষায় গান করার খবরও সামনে এসেছে। এছাড়াও বহু জায়গা থেকে খবর শোনা যাচ্ছে যে করোনা ছড়াতে পারে, এই আশঙ্কায় কিছু নার্সের বাড়িতে হামলাও হয়েছে।

শেষে একটা কথাই বলব, যুদ্ধে, শান্তিতে যেখানেই জীবনের স্পন্দন রয়েছে, সেখানে শক্তিতে, সেবাতে, প্রেরনায় উজ্জ্বল রয়েছে নার্সের অবদানের ইতিহাস আর চিরকাল থাকবেও। মনে রাখতে হবে, প্রত্যেক নার্সরাই একেক জন ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল।

Related Articles

Back to top button
Close