fbpx
অফবিটব্লগ

“টম অ্যান্ড জেরি ছিল দেখতাম, খুব ভালো লাগত“ একান্ত সাক্ষাৎকারে জনপ্রিয় কমিকস চরিত্রের স্রষ্টা নারায়ণ দেবনাথ

জনপ্রিয় কমিকস চরিত্রের সৃষ্টিকর্তা প্রবাদ প্রতীম নারায়ণ দেবনাথ-এর সঙ্গে মুখোমুখি কথোপকথনে অন্তরা মুখোপাধ্যায়।

যুগশঙ্খ ডিজিটাল ডেস্কঃ  হাওড়া শিবপুর। নারায়ণ দেবনাথের নিজের বাড়ি। যাঁর হাতে তৈরি হয়েছে জনপ্রিয় মজাদার দুই কিশোর চরিত্র নন্টে আর ফন্টে। একে অন্যের পিছনে লাগা অনবরত। তাদের নানা রকম ফন্দি-ফিকির। নন্টে-ফন্টে কে সুপারিনটেনডেন্ট স্যারকে দিয়ে বকা খাওয়ানো। আর এই মহত্ কাজ করার পিছনে ছিল কেলটু। কিন্তু সবশেষে নন্টে-ফন্টের জুটত প্রশংসা আর কেলটুর কপালে মার। সেই নন্টে-ফন্টে এবার পা রেখেছে ৫০-এ।
শিবপুর পাবলিক লাইব্রেরির কাছে একটা দোতলা বাড়ির একতলা। বাড়িতে ঢুকতেই ডান হাতে তাঁর ছোট্ট ঘর। পড়ার টেবিলে ১২টা নাগাদ জ্বলছিল হলুদ টেবিল ল্যাম্প। সেই খানেই চেযারে বসে বর্তমান কাগজ পড়ছিলেন নারায়ণ বাবু। পঁচানব্বই বছর বয়সী নারায়ণ বাবুর সঙ্গে কথা বলতে গেলে এখন একটু জোরে কথা বলতে হয়।
কেমন আছেন? জিজ্ঞাসা করতেই একগাল হাসি মুখে নিয়ে বলেন, “এই তো ভালোই আছি। নন্টে ফন্টের ৫০ আমার খুব ভালোই লাগছে।“
আজও নন্টে ফন্টের দুষ্টুমি বাঙালিকে একইভাবে মাতিয়ে রেখেছে, “ দ্যাখো বাঙালির ভালো লেগেছে তাই। গুরুগম্ভীর কিছু না। বিশেষত বাচ্চাদের আনন্দ দেওযার জন্যই সবকিছু।“

দস্যি চরিত্রগুলোর কথা মাথায় আসতো কী করে? “যেমন গল্পকাররা গল্পভাবে ঠিক সেরকমই আমার মাথায় এসেছিল। অত কিছু ভেবে তো লিখিনি। প্রথমে নন্টে-ফন্টে, তারপর বোর্ডিং, তারপর সুপারিনটেনডেন্ট এদের নিয়ে গল্প তৈরি আর এদের নিয়েই কাহিনী।“
অনবদ্য তিন সৃষ্টি – নন্টে -ফন্টে হাঁদা-ভোঁদা আর বাঁটুলের মধ্যে সবথেকে সিনিয়ার কে? “হাঁদা-ভোঁদা অনেক সিনিয়ার বাকিদের থেকে। প্রায় আটান্ন বছর হাঁদা-ভোঁদার। ২০১২ সালেই হাঁদা-ভোঁদা ৫০ পার করেছে। ১৯৬২ তে হাঁদা-ভোঁদার পরই ১৯৬৫তে আসে বাঁটুল। ২০১৫ সালে বাঙালির সুপার হিরোও ৫০ পেরিয়েছে।হাঁদা ভোঁদা র মধ্যে ভোঁদার জন্ম হাঁদার জন্মের বেশ কয়েক বছর আগে। ভোঁদার জন্ম ১৩৫৮-র শুকতারার কার্তিক সংখ্যায়। হাঁদা ওর সঙ্গে যোগ দেয় ১৩৬৯এর শুকতারার আষাঢ় সংখ্যায়। হাঁদা-ভোঁদার জয়, সেই থেকেই ওদের জয় যাত্রার শুরু। আগে আমরা হাঁদা ভোঁদার যে চেহারা দেখি, আগে কিন্তু মোটেই তা ছিল না। হাঁদা-ভোঁদার চুলোচুলি-তে বিবর্তন লক্ষ্য করা যায়।“

আপনার প্রিয় কমিকস কোনটা? “ উত্তরে হেসে বলেন, সবই তো আমারই। লোকের অনুযায়ী বললে বাঁটুল আমার কাছে সেরা। জানো তো, বাটুল হল সুপার হিরো।“
আপনার সময় যাঁরা কাটুন আঁকতেন, তাদের মধ্যে কার কার কথা বলবেন? “আমার সময় রাজনৈতিক কার্টুন আঁকত চন্ডী ছিল।“
হাঁদা-ভোঁদার গল্পে এই চরিত্রগুলো কি এই শিবপুরেরই? “ হ্যাঁ, তা ওই আমার পাড়ার মোড়ের ছেলেদের, যারা ছোটোবেলায় সব খেলাধুলা করত, দুষ্টুমি করত, যা হয় বাচ্চারা যা করে আর কি! ওই..ওইটা দেখেই আঁকতাম। যখন আমার কাছে প্রস্তাব এল তখন ওই সমস্ত ঘটনাগুলোকেই গল্পাকারে সাজিয়ে ছবি এঁকে দিলাম। হয়ে গেল আর কি!”

কমিকস্ এর বাইরে বইয়ে অলংকরণও করেছেন? “অনেক অলংকরণ করেছি। বিদেশি অনুবাদের প্রচ্ছদ করেছি। সেই সময় আমাকে দিয়ে করানো হত। বইয়ে প্রচ্ছদ, অলংকরণ সবই করেছি।“
শুটকি-মুটকি-র কাজ শুরু করেছিলেন, বন্ধ করে দিলেন যে—
“ করলাম না মানে, ওই আপত্তি এল আর কি। মেয়েদের থেকেই আপত্তি এল যে করা যাবে না। যে রকম শুনেছি আমি। ওটা আর ওঁরা করলেন না। আপত্তির কোনো চিঠি দেখিনি। ওই শুনেছি আর কি!”
সময় পেলে এই দস্যি চরিত্রগুলো নিয়ে আবার লিখবেন?
“এই বয়সে আর…”

আজকের দিনে টিভিতে বিভিন্ন কার্টুন প্রোগ্রাম হয় দেখেন? “ না, সেরকম দেখি না। সেরকম হয় না, তাই ভালো লাগে না দেখতে। টম অ্যান্ড জেরি ছিল দেখতাম। খুব ভালো লাগত।“
কী খেতে ভালোবাসেন? এখন তো নিশ্চয়ই অনেক বারন ডাক্তারের… “হ্যাঁ, বারন কিন্তু তাও তো খাই। এক সময় মিষ্টি খেতে খুব ভালোবাসতাম। কিন্তু এখন তো অনেকবার হাসপাতাল ঘোরা হযে গেছে (বেলভিউ)। কালো জাম (মিষ্টি) খেতে ভালোবাসি।“
কাগজে কার্টুনিস্টদের কাজ দেখেন? “ হ্যাঁ দেখি তো। সেন্টু, উদয় দেব, দেবাশিষ দেব এদের কার্টুন তো কাগজে বেরোয়, তখন দেখি আমি।“
দেব সাহিত্য কুটিরের সঙ্গে আপনার তো অনেকদিনের সম্পর্ক…”তখনকার যিনি কর্ণধার ছিলেন দেব সাহিত্য কুটিরের সুবোধ চন্দ্র মজুমদার, তার সঙ্গে পরিচয় হয়ে মন খুব খুশি হয়েছিল। যেটা চেয়েছি সেটা হয়েছে। শুরু হয়েছিল ইলাস্ট্রেশনের কাজ।“
একা হাতে পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় ধরে কমিকসের ছবি এঁকেছেন, যোগ্য সম্মান পেয়েছেন? আমার দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন, “ আমার চরিত্র নন্টে-ফন্টে, বাঁটুল এখনও পাঠকদের কাছে প্রিয়। মানুষের থেকে অনেক ভালোবাসা পেয়েছি। “

 

নারায়ণবাবুর ঘরে ঢুকতেই চোখ যাবে দেওয়ালের দিকে। হাঁদা-ভোঁদা, নন্টে-ফন্টে, বাঁটুল সহ আরও নানান কমিকস লিখে, ছবি এঁকে যা পুরস্কার পেয়েছেন তা সবই রাখা আছে। কোনো পুরস্কার নিজের হাতে নিয়েছেন আবার কোনো কোনোটা বিশেষ কারণে নিতে যেতে পারেননি। তাঁর নিজের তৈরি চরিত্রদের নিয়ে সেরকম কথা বলেন না কারও সাথেই। তাঁর বউমা বলেন, বাবা এখন বেশিরভাগ সময়তেই শুয়ে থাকেন। দুপুরে শুধুমাত্র বারোটা থেকে খবরের কাগজ পড়েন ১টা অবধি। কাছেই স্কুল। ছোটো ছোটো বাচ্চারা মাঝে মধ্যেই আসে প্রোজেক্টের জন্য। স্কুল ড্রেস পড়ে বাবার সঙ্গে ছবিও তুলে যায় তারা। এক সময় উনি গল্প করতে ভালোবাসতেন। খেতে ভালোবাসতেন। ডাক্তারের চার্ট মানেন না। মশলাদার খাবারই এখনও তাঁর পছন্দ।

কিছুক্ষণ সময় নিযে নারায়ণ বাবু বলে ওঠেন, –
“ আমার কাকার এবং বাবার সোনার দোকান ছিল পাড়ার মোড়ে। সেই দোকানে মাঝে মধ্যেই যেতাম। আর সেখানেই ওই ছেলেমেয়ে পাড়ার রকে দুষ্টুমি করতো। সেগুলো থেকেই হাঁদা ভোঁদার কান্ডকারখানা লিখেছিলাম।“
অনেকেই বলেন, মনোহর আইচকে দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে আপনি বাঁটুল চরিত্র তৈরি করেছেন। আপনি কি সেই সময়কার কোনো ব্যযামবীর কে দেখে করেছেন? না। এ কথা একেবারেই সত্য নয়। কখনও তা বলিনি। অনেক আগে একজন সাংবাদিক জিজ্ঞাসা করেন, এটা কি মনোহর আইচকে দেখে? উত্তরে বলেছিলাম, না কাউকে দেখে নয়। বাঁটুল ক্যারেকটার পুরোপুরি আমার কল্পনাপ্রসূত। এর সঙ্গে বাস্তবের কোনো মিল নেই। ভুল ঘটনা একটা ইতিহাসকে বিভ্রান্ত করে।

দীর্ঘদিন ওঁনাকে নিয়ে গবেষণা করেন শান্তনু ঘোষ। তিনি বলেন, হাঁদা- ভোঁদা চরিত্রটা উনি যে সময়ে করেছেন ১৯৬২ সালে তার প্রায় ১১ বছর আগে এই চরিত্র তৈরি হয়েছিল। প্রতুল বন্দ্যোপাধ্যায় করেছিলেন। ছদ্মনাম নয় ওটা ছদ্ম-ছবি। ওখানো কোনো বোলতার নাম থাকত না। ছবি থাকত। যেমন, মৌমাছি বিমল ঘোষ, লেখক বিমল ঘোষের ছদ্ম নাম ছিল মৌমাছি। সেটা আলাদা কথা। কিন্তু এখানে হুলওলা একটা বোলতার ছবি থাকত। পরবর্তী কালে নারায়ণ বাবুর থেকে জানা গেছে, প্রতুল বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছবিতে ছদ্ম ছবি ছিল। কিন্তু নারায়ণ দেবনাথ কোনোদিন ছদ্মনামে লেখেননি বা আঁকেননি।

কমিকসে যে আলাদা করে লেখকের নাম উল্লেখ করতে হবে এই আইডিয়াটা তখনও গড়ে ওঠেনি। পত্রিকা প্রকাশনা সংস্থা তাঁকে সম্মান করতেন। একটা সময় কমিকস শিল্পীদের কোনো সম্মান সেরকমভাবে দেওয়া হত না। যখন প্রথম হাঁদা-ভোঁদা ও বাঁটুল দি গ্রেট বেরোয় তখন কমিকস শিল্পীদের আলাদা করে সম্মান দেওযা হত না। সূচীপত্রে লেখা থাকত হাঁদা-ভোঁদা পাশে পৃষ্ঠা সংখ্যা। অন্যান্য গল্পে লেখা থাকত, ওমুক গল্প তমুক লেখক। শিল্পীর নামই উল্লেখ থাকত না কমিকসে। শেষে ওঁনার একটা শর্ট সিগনেচার করা থাকত না তা থেকেই বোঝা যেত। বইয়ে সূচীপত্রে নাম উল্লেখ না থাকলেও ওই শর্ট সিগনেচার থেকে বোঝা যায় নারায়ণ দেবনাথ কাজগুলো করতেন।

নারায়ণ বাবু কখনওই চান না ওঁনার মৃত্যুতে বা ওঁনার অসুস্থতাতে অন্য কোনো শিল্পী ওঁনার চরিত্রের ছবিতে হাত দেয়। কারণ, বাঁটুলের জীবনে প্রেমের আঘাত দেখাবে না, বাঁটুলকে দিয়ে এমন অনেক কান্ডকারখানা করাবেন যা নারায়ণ বাবু কখনও করাননি। নারায়ণ বাবু জানেন এটা অন্য শিল্পী যেই কাজ করবে তাঁর মধ্যে অনেক পাঁক, ময়লা থাকতে পারে যা ক্যারেকটারের নেচারের বাইরে। সেই আতঙ্ক থেকেই উনি চান না আগামী দিনে ওঁনার চরিত্রতে অন্য কেউ হাত দিক।

এখন আর ওঁনার কাছে বিশেষ কেউ যান না। একটা অভিমান আজও কাজ করে তাঁর।
নারায়ণ দেবনাথ ফাউন্ডেশন বলে কিছু করা যেতে পারে। যেখানে এটা নিশ্চিত করবে যে ওনার অবর্তমানে ওঁনার যে কাজ, তাতে কেউ হাত দেবে না। এই ব্যাপারটাকে আইনত দেখবে। যেভাবে একার হাতে ৫০ বছরের ও বেশি সময় ধরে কমিকসের ছবি এঁকেছেন, এমন আর কজন আছে! নারায়ণ দেবনাথ এমন একজন অলংকরণ এবং কমিক শিল্পী যিনি নিজের কাজের গুণগত মান নিযে কোনোদিন কম্প্রোমাইজ করেননি। যার মধ্যে বাংলার অলংকরণ শিল্পীদের মধ্যে যে সামগ্রিক গুণ দেখা গেছে সেই গুণ একক একটি মানুষের হাত দিযে প্রকাশিত হয়েছে। আমার স্বপ্নের নায়ক নারায়ণ দেবনাথ।

Related Articles

Back to top button
Close