fbpx
অন্যান্যলাইফস্টাইলহেডলাইন

করোনার: প্লাজমা থেরাপির দু’তিনটি কেস সাফল্য পাওয়া মানে এটাই কিন্তু ‘চূড়ান্ত’ নয়, মত চিকিৎসকের

দোয়েল দত্ত: করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ যেমন বেড়ে চলেছে তার পাশাপাশি খুব ক্ষীণভাবে হলেও আশার আলো দেখা যাচ্ছে যে কিছু সংখ্যক মানুষ সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরছেন৷ করোনার চিকিৎসা কী, এক কথায় এর উত্তর দেওয়া কঠিন৷ বিভিন্ন দেশে অনেকরকম চিকিৎসা পদ্ধতিই অনুসরণ করা হচ্ছে৷ তার কয়েকটায় দীৰ্ঘমেয়াদি সাফল্য পাওয়া গেছে, আবার কোনওটা হয়তো আছে পরীক্ষামূলক পর্যায়ে। প্ৰায় প্ৰতিদিনই করোনার চিকিৎসায় নতুন নতুন সংযোজন হচ্ছে৷ এইসব নিয়ে জানতে চেষ্টা করে ‘যুগশঙ্খ’ হাজির হয়েছিল আমরি হাসপাতালের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. আশিস মিত্ৰ-র কাছে৷ সামনে দোয়েল দত্ত

করোনার চিকিৎসা বৰ্তমানে কীভাবে করা হচ্ছে? এর ট্ৰিটমেন্ট প্ৰোটোকলই-বা কী?

করোনার ক্ষেত্ৰে প্ৰথমেই যেটা দেখা হয় মৃত্যুহার কত৷ ধরা যাক এই রোগে ১০০ জন আক্রান্ত হলে তিন থেকে চারজন মারা যাচ্ছে৷ তবে এটা আমাদের দেশের হিসেব বললাম৷ দেশ থেকে দেশে এই সংখ্যাটা আলাদা হয়৷ এটা অনেকটা সাৰ্স ভাইরাসের মতো, তবে সাৰ্সে আক্রান্তদের মৃত্যুহার করোনার থেকে অনেক বেশি৷ আর করোনার যেটা সমস্যা তা হল এটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে৷ সেজন্যই এর বিরুদ্ধে লড়তে গেলে আমাদের সচেতনতা নিতে হবে৷ বিশ্বব্যাপী গ্ৰহণযোগ্য কোনও চিকিৎসাপদ্ধতি বা এর কোনও কপিবুক ট্ৰিটমেন্ট নেই৷ রিউম্যাটয়েড আরথ্রাইতিসে ব্যবহৃত ওষুধ হাইড্ৰক্সিক্লোরোক্যুইন দিয়ে করোনার চিকিৎসা করে তাতে ফলাফল পাওয়া গেছে৷ ম্যালেরিয়ার চিকিৎসার ক্ষেত্ৰে যে ক্লোরোক্যুইন ড্ৰাগটি ব্যবহার করা হতো, তারই উন্নততর সংস্করণ এটি৷ এর সঙ্গে অ্যান্টিবায়োটিক হিসাবে দেওয়া হয় অ্যাজিথ্ৰোমাইসিন৷ তবে করোনা চিকিৎসার একেবারে প্ৰথম দিকে এই কম্বিনেশন ড্ৰাগ দিয়ে চিকিৎসা করা দরকার৷

জ্বর এসে করোনা প্ৰমাণ করতে পাঁচ থেকে সাতদিন সময় এমনিতেই চলে যায়৷ এছাড়া নাক বা গলার ভিতর থেকে সোয়াব টেনে পরীক্ষা করলেও পরদিন বা দুদিনের মধ্যে রিপোৰ্ট চলে আসে৷ প্ৰথমে হয়তো অনেকের নেগেটিভ এল, কিন্তু উপসৰ্গ দেখে পরেরবার পজিটিভ আসলে তাঁকে এই ওষুধ দেওয়া হয়৷ আর জ্বর থাকলেও দুবারের পরীক্ষায় যদি নেগেটিভ আসে তাহলে রোগী কোভিড নেগেটিভ৷ রিপোৰ্ট পজিটিভ এলেই হাইড্ৰক্সিক্লোরোক্যুইন ও এজিথ্ৰোমাইসিন দেওয়া হয়৷

কিন্তু অনেকের তো এজিথ্ৰোমাইসিন কাজ করছে না৷ কেন? হাইড্ৰক্সিক্লোরোক্যুইন থেকেও তো অনেক পাৰ্শ্বপ্ৰতিক্রিয়া হয়?

আসলে আমাদের দেশে অনেকদিন ধরেই অ্যাজিথ্ৰোমাইসিন ব্যবহার করা হয়েছে যে অনেকের মধ্যে এটা রেসিস্ট্যান্স হয়ে গেছে৷ হাইড্ৰক্সিক্লোরোক্যুইন হল ইমিউনো মডিউলেটার৷ এটা আমাদের শরীরের ইমিউন সিস্টেমকে চাঙ্গা করে৷ কিন্তু কমবয়সিদের ক্ষেত্ৰে দেখা যাচ্ছে অনেকসময়েই এই ওষুধের প্ৰভাবে ইমিউন সিস্টেম অতিসক্রিয় হয়ে ওঠে এমন কিছু মলিকিউলকে সক্রিয় করছে যার ফলে ফুসফুসের ক্ষতি হচ্ছে৷ এবং এখান থেকে রোগী ভেন্টিলেশনে পৰ্যন্ত চলে যাচ্ছেন, এমন উদাহরণও আছে৷


তাহলে এই সমস্যার কীভাবে সমাধান করা যাবে?
এক্ষেত্ৰে টক্লিজুমেড নামক আরও একটি ইমিউনো মড্যুলেটর বেশ ভালো কাজ করছে৷ তবে এটি ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে দেওয়া হয়৷ এছাড়াও করোনার ক্ষেত্ৰে রক্ত ক্লট বাঁধার একটা সম্ভাবনা থাকে ফুসফুসে৷ সেটি যাতে না হয় সেজন্য রক্তকে তরল  রাখতে ব্লাডথিনার হিসাবে হেপারিনের প্ৰয়োগও হয়৷ মানে প্ৰথমে হাইড্ৰক্সিক্লোরোক্যুইন ও এজিথ্ৰোমাইসিন কম্বিনেশন দিয়ে রোগীকে মনিটরিং করা হয় এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে কাজ না হলে টক্লিজুমেড দেওয়া হচ্ছে৷ তবে রোগীর উপসৰ্গ মাইল্ড, মডারেট না সিভিয়র তা দেখেই চিকিৎসক ঠিক করেন কি ধরনের চিকিৎসা তাঁকে দেওয়া হবে৷

এর পাশাপাশি চলতে থাকে উপসৰ্গভিত্তিক চিকিৎসা৷ যেমন জ্বরের জন্য প্যারাসিটামল৷ শ্বাসকষ্ট হলে স্টেরয়েড৷ প্ৰয়োজনে হাই ফ্লো-র অক্সিজেন৷ রোগী যদি নিজের থেকে অক্সিজেন টানতে না পারেন তাঁকে তখন কৃত্ৰিমভাবে দিতে হবে, যাকে বলা হয় ভেন্টিলেশন৷ ভেন্টিলেশন দুরকমের হয় সাধারণভাবে রোগীর মুখে মাস্ক পরিয়ে বাইপ্যাপ যন্ত্ৰের সাহায্য নিয়ে ভেন্টিলেশন, একে বলে নন ইনভেসিভ ভেন্টিলেশন ও অন্যটি হল মেকানিক্যাল ভেন্টিলেশন৷ তবে কোভিডের রোগীর যদি মেকানিক্যাল ভেন্টিলেশনের প্ৰয়োজন হয়, তাহলে সেখান থেকে মৃত্যুহার প্ৰায় ৮০ শতাংশ৷

অ্যান্টি ভাইরাল রেমসিডিভির করোনা চিকিৎসার জন্য উপকারী কতটা? আর আমাদের মতো দেশে যদি আমেরিকা থেকে এটি আমদানি করতে হয়, তাহলে কতটা কস্ট এফেক্টিভ হবে?

রেমসিডিভির কিন্তু নতুন কোনও ওষুধ নয়৷ ইবোলা ভাইরাসের ক্ষেত্ৰেও এটি ব্যবহার করা হয়েছে৷ ট্ৰায়ালেও দেখা গেছে এটি ভালো কাজ করছে৷ আমেরিকার ফুড অ্যান্ড ড্ৰাগ অ্যাসোসিয়েশন ইতিমধ্যেই রেমসিডিভিরকে ছাড়পত্ৰ দিয়েছে৷
আর এটা কিন্তু খুব একটা দামি নয়৷ করোনার যেসব ওষুধ এখনও পৰ্যন্ত ব্যবহৃত হয়েছে তার মধ্যে খুব দামি সেরকম কিছুই নেই৷ সেক্ষেত্ৰে আনা যেতেই পারে৷

এছাড়াও ফ্ল্যাভিপাভির নামক আরেকটি অ্যান্টি ভাইরাল নিয়ে কাজ হচ্ছে৷ এখনও পৰ্যন্ত এর যতটুকু ট্ৰায়াল হয়েছে তাতে ভালোই কাজ হয়েছে৷ আশা করা যাচ্ছে, এ-বছরের শেষাশেষি নাগাদ আমরা ফ্ল্যাভিপাভির ব্যবহার করতে পারব৷

প্লাজমা থেরাপিতে রোগীদের সুস্থ হওয়ার কথা আমরা শুনেছি৷ এটা করোনা চিকিৎসার ক্ষেত্ৰে কতটা উপকারী অবদান রাখবে বলে আপনি মনে করছেন?
প্লাজমা থেরাপি বিদেশে হয়েছে, আমাদের এখানেও কেরালা, দিল্লিতে হয়েছে৷ তবে যে কটা কেস হয়েছে তাকে ইতিবাচক ফল মিলেছে৷ তবে এগুলি বড় করে প্ৰয়োগ করা হয়নি৷ মানে চিকিৎসার ভাষায় যাকে বলে Randomized Controlled Trial.এক বা একাধিক দেশে ৫-৬ টা সেন্টারে অনেক মানুষকে একসঙ্গে দিয়ে যদি ভালো সাড়া মেলে তবেই বলা যাবে এটি কাৰ্যকরী৷ দু-তিনটে বিচ্ছিন্ন কেস দিয়ে পুরোটাকে বিচার করা যাবে না৷

আর প্লাজমা থেরাপি ওভাবে খুব তাড়াহুড়ো করে দেওয়া যায় না৷ এর আগে অনেক কিছু পরীক্ষা করতে হয়৷ যদি শরীর নিতে না পারে তাহলে জ্বর, শ্বাসকষ্ট, রক্তচাপ কমে গিয়ে রোগীর অবস্থা আশংকাজনক হয়ে হিতে বিপরীত হবে৷

কয়েকদিন আগে সাধারণ অ্যান্টাসিড ফ্যামোটিডিন করোনার চিকিৎসায় খুব কাৰ্যকরী বলা হয়েছিল৷ কিন্তু তাতেও সাড়া জাগিয়ে উল্লেখযোগ্য ফল পাওয়া যায়নি৷ কেন?

আসলে এগুলি সবই রয়েছে এক্সপেরিমেন্টাল স্তরে৷ ফ্যামোটিডিন নিৰ্দিষ্ট মাপে ইঞ্জেকটেবল ডোজে দেওয়া হয়৷ দু-একটা সেন্টারে ভালো কাজ হয়েছে৷ অনেকের উপর একসঙ্গে প্ৰয়োগ হয়নি৷ একসঙ্গে প্ৰয়োগ করতে গেলে রোগীদের দুটো দলে ভাগ করতে হয়, একটা দলকে ওষুধটি দেওয়া হবে, অন্যদলকে দেওয়া হবে না৷ তারপরে ওষুধ গ্ৰহণকারী দলটির যদি খুব ভালো সাড়া মেলে তবেই একে কাৰ্যকরী চিকিৎসাপদ্ধতি বলা যাবে৷

করেনার চিকিৎসায় হোমিওপ্যাথি বা আয়ুৰ্বেদের আদৌ কি কোনও ভূমিকা আছে?

এটা বলাটা মুশকিল৷ করোনাতে ১০০ জনে ৯৬ জন ঠিক হয়ে যায়৷ তবে আবারও বলছি এর মূল সমস্যা হল রোগটি ছোঁয়াচে৷ করোনা দূর করতে ওষুধ তো আছেই৷ তবে সচেতন থাকুন আতংকে নয়, আর সেজন্যই গোড়া থেকে শরীরের যত্ন নিন, শরীরের ইমিউনিটি বাড়াতে হবে৷ তার জন্য ভিটামিন এ, ডি, সি যুক্ত খাবার বা সাপ্লিমেন্ট গ্ৰহণ করতে হবে৷ ধূমপান ও অ্যালকোহল নেওয়ার অভ্যেস থাকলে  ছাড়ুন।

এবং কো মরবিড অসুখ যেগুলি আগে থেকেই রোগীর শরীরে আছে যেমন ডায়াবেটিস, ক্রনিক কিডনি ডিজিজ এগুলির চিকিৎসা করাতে হবে, যাতে সেখান থেকে সংক্রমণ হয়ে করোনা না হয়৷ বিশেষ করে বলব ডায়াবেটিসের কথা৷ ডায়াবেটিস থাকলে যে কোনও সংক্রমণই খুব চট করে শরীরে ঢুকে পড়ে তা মাথায় রাখা প্ৰয়োজন৷

যোগাযোগ: ৯৮৩১৬৭১৫২৫

Related Articles

Back to top button
Close