fbpx
অন্যান্যঅফবিটপশ্চিমবঙ্গহেডলাইন

জনমানবশূন্য কল্যাণীর চারটি স্টেশন! এ যেন কোনও ভূতুড়ে গল্পের সাজানো প্লট

অভিষেক আচার্য, কল্যাণী: এক সময়ে নদিয়ার কল্যাণী, কল্যাণী শিল্পাঞ্চল, কল্যাণী ঘোষপাড়া ও কল্যাণী সীমান্ত স্টেশনগুলোতে ভোর হওয়ার আগেই শুরু হয়ে যেত কোলাহল। আর আজ এই চারটি স্টেশন জনমানবশূন্য। নেই ট্রেন, আসে না যাত্রী। দেড় মাসের শূন্যতায় স্টেশনগুলিতে নেমে এসেছে অন্ধকার। জরাজীর্ণতায় আজ ভূতুড়ে রূপ নিয়েছে কল্যাণীর চারটি স্টেশন।

কোনও এক সময়ে রেল স্টেশনের ফলকে লেখা থাকত ‘চাঁদমারি হল্ট’। পরে তার নামকরণ হয় কল্যাণী।

সূত্র অনুযায়ী, পরাধীন ভারতের সামরিক উপনিবেশ হিসাবে গঙ্গার ধারে নদিয়ার ৪৫টি গ্রাম নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট নিজের নামেই ‘রুজভেল্ট নগর’-এর গোড়াপত্তন করেছিলেন। মূলত বিশ্বযুদ্ধের কথা মাথায় রেখেই এই সামরিক শহরের জন্ম হয়েছিল। বিশ্বযুদ্ধ থামলে আমেরিকান সেনা বাহিনীর কাছে রুজভেল্ট নগরের প্রয়োজন মিটে যায়। তাই শেষমেশ মার্কিন সেনারাও এই এলাকা ছেড়ে চলে যায়।

জনমানবহীন সামরিক শহর এক সময়ে পরিত্যক্ত জনপদের চেহারা নেয়। যুদ্ধের বহু নিদর্শন ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছিল শহর জুড়ে। কিন্তু ইতিহাসের চিহ্ন বুকে নিয়ে রুজভেল্ট নগর তখন ক্রমশ জঙ্গলে পরিণত হচ্ছিল।

রুজভেল্টের সামরিক শহরকে নববধূ রূপে সাজিয়ে তোলেন স্বাধীনোত্তর ভারতে এ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায়। পরিত্যক্ত সামরিক শহরের নাম হয় কল্যাণী। ১৯৫০ সালে এই শহরের মাস্টার প্ল্যান তৈরি হয়। ১৯৫১ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি এই শহরের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপণ করেছিলেন তৎকালীন রাজ্যপাল কৈলাশনাথ কার্টজু। ১৯৫৪ সালে চাঁদমারি হল্ট স্টেশনের নাম মুছে ফেলা হয়। সেখানে লেখা হয় ‘কল্যাণী’।

কল্যাণীর উন্নয়নের ক্ষেত্রে ১৯৭৯ সালের ৭ এপ্রিল রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর উপস্থিতিতে তৎকালীন রেলমন্ত্রী মধু দণ্ডবতে কল্যাণী মেন স্টেশন থেকে কল্যাণী সীমান্ত পর্যন্ত রেলপথের উদ্বোধন করেন। সেই থেকে শিয়ালদহ-কল্যাণীগামী ‘কল্যাণী লোকাল’ হল ‘কল্যাণী সীমান্ত লোকাল’।

সেই শুরু। রেল সূত্রের খবর, ট্রেন সংখ্যা বাড়তে বাড়তে আজ কল্যাণী সীমান্ত স্টেশন থেকে মোট ১৩টি ট্রেন শিয়ালদার উদ্দেশ্যে রওনা হয়। আর শিয়ালদা থেকে মোট ১৬ টি ট্রেন কল্যাণী সীমান্ত আসে।

কিন্তু লকডাউন হওয়ার পর বন্ধ রেলপথ। কলকাতার সঙ্গে বিচ্ছিন্ন যোগাযোগ। দেড় মাসের ওপর স্টেশনে পা রাখেননি যাত্রী থেকে হকাররা। খোলেনি স্টেশনের দোকানগুলি। ফলে স্টেশনগুলি আজ খাঁ খাঁ করছে।

একটা সময় এই স্টেশনগুলির চিত্র ছিল এরকম। হকারদের চিৎকার, অফিস যাত্রীদের কোলাহল, প্রেমিক যুগলদের প্রেমের কথোপকথন, ছাত্র-ছাত্রীদের টেনশন, ভবঘুরে, ভিখারিদের আর্তনাদ, দোকানগুলোতে ক্রেতাদের ভিড় সবই ছিল ছবির মতন।

কিন্তু আজ সে সব অতীত। স্টেশনের দিকে পা বাড়ান না কেউ। বন্ধ দোকানপাট। সন্ধ্যে হলেই নেমে আসে অন্ধকার। শুনশান স্টেশন চত্বর। নিঃস্তব্ধ, কেউ কোথাও নেই, জনমানবশূন্য, ক্ষীণ আলো, চোখে পড়ে দু-একটি সারমেয়দের ইতিউতি ঘোরাঘুরি, পিন পড়লেও শোনা যাবে তার শব্দ। দূর থেকে দেখলে মনে হয় কোনও ভূতুড়ে গল্পের সাজানো প্লট। ভবিষ্যতে নিজেদের নতুন রূপে সাজাতে অপেক্ষায় কল্যাণী ও তার তিন সাথী ঘোষপাড়া, শিল্পাঞ্চল ও সীমান্ত।

Related Articles

Back to top button
Close