fbpx
আন্তর্জাতিকগুরুত্বপূর্ণবাংলাদেশহেডলাইন

বাংলাদেশে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ‘গ্যাং ওয়ার’, ৮ জন নিহত

যুগশঙ্খ প্রতিবেদন, ঢাকা: বাংলাদেশের কক্সবাজারের কুতুপালং ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে এক সপ্তাহে অন্তত আট জন নিহত হয়েছে। যৌথ অভিযান চালিয়েও সংঘর্ষ থামানো যাচ্ছে না। সাধারণ রোহিঙ্গা শরণার্থী ও বাংলাদেশি নাগরিকরা রয়েছেন আতঙ্কে। ক্যাম্প থেকে পালিয়ে যাচ্ছে অনেকে।

স্থানীয় সূত্রের, মাদকসহ নানা ধরনের অবৈধ ব্যবসার আধিপত্যকে কেন্দ্র করেই এই সংঘাত। এই গ্রুপগুলোর সঙ্গে স্থানীয় মাদক ব্যবসায়ীদের যোগাযোগ থাকার দাবি করেছেন কেউ কেউ। এর পিছনে মায়ানমারের সামরিক বাহিনীর ইন্ধন আছে এবং রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর অস্ত্রের প্রধান উৎস মায়ানমার-এমন দাবিও করেছে একাধিক সূত্র। উখিয়ার কুপালং ক্যাম্প সবচেয়ে বড় রোহিঙ্গা ক্যাম্প। কুতুপালং ও টেকনাফের নয়াপাড়া- এই দুটি ক্যাম্প রেজিষ্টার্ড হলেও মোট ক্যাম্প ৩৪টি।

বাংলাদেশ পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জ পুলিশের ডিআইজি মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, এই সপ্তাহে মোট আট জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের লাশ স্থানীয় হাসপাতাল মর্গে আছে। ক্যাম্প এলাকায় যৌথ বাহিনী অভিযান চালাচ্ছে। এখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে। ক্যাম্পে গোলাগুলি বন্ধ হলেও পরিস্থিতি থমথমে।

তিনি জানান, এই ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের মুন্না ও সাদেক গ্রুপ নামে সন্ত্রাসীদের দুইটি বাহিনী আছে। তবে এখানে বিষয়টি হলো, মুন্না এবং অ্যান্টি মুন্না। তাদের মধ্যেই সংঘর্ষ চলছে। সংঘর্ষের মূল কারণ ক্যাম্পের আধিপত্য। ক্যাম্পের আধিপত্য যাদের নিয়ন্ত্রণে থাকে, তারাই অবৈধ ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে।

তবে স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ক্যাম্পে দ্বন্দ্বের নানামুখী কারণ আছে। রেজিষ্টার্ড এবং নন-রেজিষ্টার্ড রোহিঙ্গাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব অনেক পুরনো। এছাড়া জঙ্গি গোষ্ঠী আরসারও প্রভাব আছে। আর মায়ানমার সামরিক বাহিনীর পক্ষে কাজ করে এমন কয়েকটি গ্রুপও রয়েছে।তারা এখান থেকে তথ্য সরবরাহ করে। তারাও সশস্ত্র।

জানা গেছে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পভিত্তিক মাদক ব্যবসা অর্থের একটি বড় উৎস। মায়ানমার থেকে আসা ইয়াবা ট্যাবলেট ক্যাম্পে মজুত করে এখান থেকেই বন্টন করা হয়। এছাড়া ক্যাম্প এলাকা এবং আশপাশে অনেক দোকানপাট থেকে চাঁদা আদায় হয়। আর রোহিঙ্গাদের পাওয়া উদ্বৃত্ত ত্রাণ সামগ্রীর বড় একটি মার্কেট আছে। ক্যাম্পের ভেতরে ৬-৭টি বাজার আছে। সেখান থেকেও অনেক অর্থ আদায় হয়। মুন্না অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা আর সাদেক নিবন্ধিত রোহিঙ্গা। সাদেকের সাথে গোষ্ঠী আরসার যোগাযোগের অভিযোগ আছে। উখিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান হামিদুল হক চৌধুরী বলেন, এখন অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা অনেক বেশি। নিবন্ধিতরা আগে এসেছে এবং তারা সংখ্যায় কম। ফলে আধিপত্যের দ্বন্দ্ব তীব্র হচ্ছে। আর এই আধিপত্য প্রয়োজন নানা উপায়ে অর্থ আয়ের জন্য।

তার মতে, গত চার বছরে যেসব রোহিঙ্গা এসেছে, তাদের মধ্যে ইয়াবা ব্যবসায়ীও আছে। তারা ইয়াবা তৈরি করতে পারে। ক্যাম্পের ভেতরে তারা এ ধরনের কারখানা তৈরি করেছে বলে আমরা ধারণা করি। আবার কিছু রোহিঙ্গা আছে, যারা ক্যাম্পে থাকলেও নিয়মিত মায়ানমারে আসা-যাওয়া করে। তারা অস্ত্র এবং ইয়াবা চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত। গত একমাসে রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে ২০ লাখ ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে।

গত ২ অক্টোবর কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পাশে পালংখালিতে একটি অস্ত্র তৈরির কারখানার সন্ধান পায় র‌্যাব। সেখান থেকে দুটি আগ্নেয়াস্ত্র, দুই রাউন্ডগুলি এবং অস্ত্র তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। এসব মজিদ ও রবি নামের দুই ব্যক্তিকে আটকও করা হয়। তাদের বাড়ি মহেষখালী এবং তারা অস্ত্র তৈরির কারিগর। এলিট ফোর্স র‌্যাব জানিয়েছে, তারা অস্ত্র তৈরি করে রোহিঙ্গাদের কাছে বিক্রি করে আসছিলো।

কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবুল মোরশেদ খোকা দাবি করেন, মায়ানমার থেকেও মাদকের সাথে অস্ত্র আসে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে। আমাদের কাছে তথ্য আছে এই সময়ে মায়ানমার সেনাবাহিনীর চররাও সক্রিয় আছে। তারা অস্ত্র দিচ্ছে। তারা চায় এখানকার পরিস্থিতি ঘোলাটে করতে। এখানে আরসাসহ আরো কিছু গ্রুপও সক্রিয় আছে। সব মিলিয়ে এক জটিল পরিস্থিতি।

তবে ডিআআইজি আনোয়ার হোসেন বলেন, মায়ানমার থেকে অস্ত্র আসে কিনা আমাদের জানা নেই। তবে সংঘর্ষে যারা লিপ্ত, তারা তো সশস্ত্র। তাছাড়া ক্যাম্পের মধ্যে মাদকের কারখানা আছে। ক্যাম্পে অনেক ঘটনা ঘটে যা জানা যায় না। সন্ত্রাসীদের কারণে তারা জানাতে সাহসও পায় না।

হামিদুল হক চৌধুরী বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাস্প একটি সোনার ডিম পাড়া হাঁস। আর তার নিয়ন্ত্রণ নিয়েই এই সংঘর্ষ। এর সঙ্গে জড়িত আছে এ দেশীয় স্থানীয় মাদক ব্যবসায়ী, চোরাকারবারি ও অস্ত্র ব্যবসায়ীরা। শুধু কুতুপালং কাম্পেই পাঁচ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা রয়েছে। সবচেয়ে বড় ক্যাম্প হওয়ায় সেখানকার কোনো ঘটনা অন্য ক্যাম্পেও প্রভাব ফেলে। সার্বিক পরিস্থিতি জানতে কুতুপালং ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের মুখপাত্র ইউনূস আরমানকে বার বর ফোন করলেও তিনি ফোন ধরেননি।

Related Articles

Back to top button
Close