fbpx
অন্যান্যগুরুত্বপূর্ণশিক্ষা-কর্মজীবনহেডলাইন

কর্মযোগের পূজারি গীতা ঘোষ

অরিজিৎ মৈত্র: করোনা, লকডাউন, বর্ষার আকাশের মুখ ভার। স্বভাবতই মনও ভারাক্রান্ত। তবুও তাই মাঝে অলস সময় মনে পড়ে গেল একজন মানুষের কথা। তিনি শিক্ষা সমাজের আপনজন। মনে করতেন বিশ্ববিদ্যাতীর্থ প্রাঙ্গণ হল জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে এবং বিলিয়ে দেওয়ার স্থান। নিজের স্বার্থে কিছু সংগ্রহ করে রাখার জায়গা নয়। রাষ্ট্রপতি পুরস্কার প্রাপ্ত শিক্ষিকা গীতা ঘোষ মনে প্রাণে বিশ্বাস করতেন তাঁর জীবনদেবতা সত্য সাই বাবার কথা, ‘শিক্ষার পরিসমাপ্তি চরিত্র গঠনে’। সেই আদর্শেই তৈরি করতেন ছাত্র-ছাত্রীদের। বলতেন ‘পঞ্চমূল্যবোধকে আরও সরলভাবে বোঝানোর জন্য তিনটি এইচের প্রয়োজন। ‘হেড’, ‘হ্যান্ড’এবং ‘হার্ট’।

মস্তক, হস্ত ও হৃদয়।  মস্তক থেকে উদ্ভূত হবে চিন্তা-ভাবনা,  হাত করবে কর্ম আর হৃদয়ের কাজ অনুভূতি ও উপলব্ধি।এই তিনের সমন্বযে ঐক্যে মিলিত হযে একে পরিণত হবে। এই কারণে পূর্ণ পবিত্র চরিত্র গঠনে প্রয়োজন চিন্তা,  বাক্য ও কর্মের পূর্ণ মিলন এবং ঐক্য।’

ফুলব্রাইট স্কলারশিপ যে কজন মুষ্টিমেয় ব্যক্তি পেয়েছেন, তাঁদের মধ্যে গীতা ঘোষ অন্যতম। বিংশ শতাব্দির প্রথম ভাগে গান্ধিজি যখন অর্থ সংগ্রহ করতে যশোর ও খুলনায় যান, তখন এক গৃহবধূ তাঁর সমস্ত স্বর্ণালঙ্কার দান করে দেন। তাঁর নাম লীলাবতী বসু। তাঁরই সুযোগ্যা কন্যা গীতা ঘোষ চিরজীবন সেই আদর্শ পালন করে গেছেন। শৈশবে ছিলেন দক্ষ সাঁতারু। কলকাতায় এসে ভাই-বোনেদের মায়ের আদর্শে মানুষ করার দায়িত্ব তুলে নেন নিজের হাতে। ইতিহাসে এম-এ পাশ করে চাকরিতে যোগ দেন। প্রথমে কর্মরত ছিলেন প্রেস সিন্ডিকেটে, পরে ইতিহাসের শিক্ষিকা হিসেবে যোগ দেন দক্ষিণ কলকাতার কমলা গার্লস হাইস্কুলে। আরও পরে ওই স্কুলেরই প্রধান শিক্ষিকা হয়েছিলেন। চাইতেন পড়াশোনার সঙ্গে সঙ্গে ছাত্রীরা যাতে নিজেদের চিনতে পারে,  প্রকৃত আপনসত্ত্বা সম্পর্কেও অবহিত হয়। স্কুল,  কলেজের পুঁথিগত শিক্ষালাভ করেও জীবনে তা সঠিকভাবে প্রতিফলিত হয় না,  যতক্ষণ না তা নিজেদের কর্মে প্রতিফলিত হয়। সৎকর্মে যতক্ষণ না বাস্তবায়িত হয়,  ততক্ষণ তো শিক্ষাই অসম্পূর্ণ, অসমাপ্ত। দৃশ্যময় জগৎ সন্বন্ধে জ্ঞান থাকলেও এডুকেয়ারের অভাবে আত্মজ্ঞান অর্থাৎ উইসডাম হয় না।

আরও পড়ুন:চেনা ছকে অপরাধ জগতের গল্প  

প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে বিভিন্ন দায়িত্ব দিয়ে বিদ্যালয়ের অন্যান্য শিক্ষিকা এবং ছাত্রীদের বলতেন,  ‘কোনও ভয় নেই,  তোমরা নিশ্চযই পারবে।’ এরই মধ্যে যোগ দেন সত্য সাই সেবা সংস্থায়।

দায়িত্ব পান শিশুদের জন্য গঠিত নীতিশিক্ষা ও মানবিকতা প্রণয়নের জন্য গঠিত বালবিকাশের ন্যাশনাল কো-অর্ডিনেটারের। সেই কাজে তাঁর সহযোগী ছিলেন সরলা শাহ। বার্ধক্য ও বয়সজনিত অসুস্থতার কারণে পদ থেকে অব্যাহতি চাইলেও সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা সত্য সাই বাবা বলেছিলেন, ‘আমি যতক্ষণ না বলব, ততক্ষণ তুমি এই বিষযে কিছু ভাববে না।’ আমৃত্যু গীতাদি সেই পদে ছিলেন। বাবা তাঁকে ডাকতেন ‘ভাগবত’ নামে। অগাধ পাণ্ডিত্ব ও জ্ঞানের অধিকারী গীতা ঘোষের বক্তব্য শোনার সৌভাগ্য হয়েছিল বালবিকাশের রজতজয়ন্তী বর্ষের অনুষ্ঠানে ব্যাঙ্গালোরের হোযাইটফিল্ডে। শিক্ষার সঙ্গে আধ্যাত্মিকতাকে মিলিয়ে সেদিন সত্য সাই বাবার উপস্থিতিতে অসম্ভব সুন্দর ভাষণ দিয়েছিলেন।

ছাত্রীদের শিক্ষার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক চর্চার বিষয়েও তাঁর ছিল প্রবল উৎসাহ। জাতীয় শিক্ষিকা গীতা ঘোষকে সম্মানিত করে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ফাকরুদ্দিন আলি আহমেদ। প্রবল ব্যক্তিত্বময়ী,  কড়া ধাঁচের মহিলা গীতা ঘোষের সব আদর আর স্নেহ পেয়ে ধন্য হয়েছিলাম। একদিকে তাঁর নিকট আত্মীয়া বিশিষ্ট সংগীতশিল্পী সুপ্রীতি ঘোষের পরিবারের সঙ্গে ছিল আমাদের ঘনিষ্ঠতা। আর অন্যদিকে সত্য সাই সংস্থার (রাসবিহারী, কলকাতা) সার্ভিস কো-অর্ডিনেটার, কলকাতা এবং দক্ষিণ ২৪ পরগণার ইউথ ইনচার্জ হওয়াতে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ ছিল নিবিড়। আমাকে মজা করে বলতেন, ‘তুই হচ্ছিস ‘মধ্যমণি’| একবার পূট্টাপর্ত্তির প্রশান্তিনিলয়ম আশ্রমে সত্য সাই বাবার ৭৪তম জন্মদিনে আয়োজিত হযেছিল সর্ব ভারতীয যুব সম্মেলন। সেখানে গিয়ে ঠান্ডা লেগে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে গীতাদি আশ্রমের রাউন্ড বিল্ডিং চত্ত্বরে নিয়ে গিয়ে ডাক্তার দেখিয়ে এবং প্রয়োজনয় ঔষুধ খাইয়ে সুস্থ করে বকাঝকা দিযে রোজ ইউথ কনফারেন্সে যোগ দিতে  পাঠাতেন। এমনই ছিল তাঁর স্নেহ-ভালোবাসা।

আরও পড়ুন:বিজেপির চা-চক্রে তৃণমূল সিপিএম থেকে যোগদান পুরুলিয়ায়

অবসর জীবনে আর্য ও ভারতী মিত্রের অনুরোধে শান্তিনিকেতনে ‘নব নালন্দা’স্কুলের দায়িস্ত নেন। সেই অনুরোধ এড়িযে যেতে পারেননি। তাঁর জন্মশতবর্ষে নব নালন্দার উদ্যোগে তৈরি একটি আলেখ্য অত্যন্ত প্রশংসনীয়।

পরিণত বয়সেও শান্তিনিকেতনে একাই থাকতেন। ঈশ্বরে বিশ্বাস ছিল প্রবল। একা থাকার কথা বললে, বলতেন, ‘আমি তো একা থাকি না, সঙ্গে থাকে আরও একজন কিন্তু তাঁকে দেখা যায না। এমন একজন নারীর জন্মশতবর্ষে তাঁকে তাঁরই এক প্রিয শ্লোকের মাধ্যমে শ্রদ্ধা নিবেদন করি। ‘ওঁ পূর্ণমদঃ পূর্ণমিদং পূর্ণাত্ পূর্ণমুদচ্যতে। পূর্ণস্য পূর্ণমাদায় পূর্ণমেবাবশিষ্যতে॥ আসতো মা সদগময় তমসো মা জ্যোতির্গময মৃত্যোর্মা অমৃতংগময়।’

 

 

 

Related Articles

Back to top button
Close