fbpx
অন্যান্যঅফবিটকলকাতাপশ্চিমবঙ্গহেডলাইন

শুভ জন্মদিন সেই মেয়ে

মনীষা ভট্টাচার্য: বছর দুয়েক আগে সুচিত্রা মিত্রের মৃত্যুদিন উপলক্ষ্যে আপন মনেই লিখেছিলাম ‘সেই মেয়ে…’ শীর্ষক একটি নিবন্ধ। বছর দুই বাদে তাঁর জন্মদিনে আমার হাতে তাঁর ‘আমার না বলা কথা’। সেই বইয়ে ‘যখন রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে গেলাম,  তখন, একের পর আর এক পরিস্থিতির মধ্যে আমাকে টেনে এনে, আমার ভাগ্যবিধাতা আমাকে আরও কঠিনতম যন্ত্রণায় জড়িয়ে ফেললেন। বাধ্য হয়েই এই গানকেই জীবিকা হিসাবে গ্রহণ করতে হল। গত প্রায় পঞ্চাশবছর ধরে অর্থের বিনিময়ে গান বিক্রি করে যেতে বাধ্য হলাম।…নিজের আসল রূপ লুকিয়ে, নিজেকে ঠকিয়ে—অন্য আকৃতিতে, অন্য প্রকৃতিতে বিখ্যাত সুচিত্রা মিত্র সেজে…।’ – লাইনগুলো পড়ছিলাম, তখন মনে হল শুধু তাঁর গান শুনে যে অনুভূতি বেরিয়ে এসেছিল কলমে তাই আরও একবার ভাগ করেনি সকলের সঙ্গে। অনুভূতি আর কিছু কল্পনার আশ্রয়ে সেই মেয়েকেই জানাই আমার প্রণাম। জন্মদিনের শুভেচ্ছা।

আরও পড়ুন:পুরনো সুর নতুন প্রজন্মের কণ্ঠে

‘দুটি শীর্ণ বাহু তুলে, ও সে ক্ষুধায় জ্বলে জ্বলে, অন্ন মেগে মেগে, ফিরে প্রাসাদপানে চেয়ে। কী জানে হায় কোথায় বা ঘর, কী নাম কালো মেয়ে।’ মন কেমন করা এক উদাসী বিকেল। পৌষালী বিকেল। চারিদিক গুমোট। ট্রেন ছুটেছে বোলপুরের উদ্দেশ্যে। বোলপুর স্টেশনে নামতেই হাওয়া একটু উতলা হল। রিক্সা ধরলাম। গন্তব্য সোনাঝুরি গেস্ট হাউজ। যেতে যেতেই ‘উতল হাওয়া বাদল ঝড়ে।’ রাঙামাটির রাঙাধুলোয় বিশুদ্ধ জল মিলে কেমন একটা অন্যরকম পরিবেশ। তবে বেশিক্ষণ না। দু’এক ফোটা ঝরেই বন্ধ। শীতে আরও কিছুটা ঠান্ডা। আজ শুক্রবার, কাল শনিবারের হাট। বাউল গান। আদিবাসী গন্ধ। রাত ১২টা এখন। ‘দিদির শরীরটা ভালো না’– এসএমএস-টায় একটু মন খারাপ। ট্রেন জার্নির ক্লান্তিতে ইচ্ছে থাকলেও হল না গান শোনা। যদিও সকালবেলা ঘুম ভাঙল সেই দিদির গানেই। ‘তোমার কাছে এ বর মাগি, মরণ হতে যেন জাগি, গানের সুরে।’

নানা রঙের সুচিত্রা

গানের সুরে সুরেই সারাটাদিন ভালোই কাটল। বিকেল থেকে প্রায় রাত অবদি অনেক বাউলসুরের মধ্যে একটা সুরই গুনগুনালাম, ‘সুখে থেকো, ভালো থেকো, মনে রেখো এ আমারে।’ আমরা বড্ড তাড়াতাড়ি ভুলে যাচ্ছি আজকাল। আমাদের স্মৃতিতে ঘুণ ধরেছে। মন জুড়ে একটা বিষন্নতা। শনিবার পেরিয়ে রবিবার। রামকিঙ্কর বেইজ আর ঋত্বিক ঘটক নিয়ে আলোচনা হল অনেকক্ষণ। দুপুর গড়িয়ে বিকেল। এসএমএস-এর খবর দিদির শরীর আরও খারাপ। গেস্ট হাউজের ঘরে তখন দিদির কণ্ঠে একের পর এক ‘নহ মাতা নহ কন্যা’, ‘আমি চিত্রাঙ্গদা, আমি রাজেন্দ্রনন্দিনী’, ‘কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি’।

শরীর ক্রমাগত খারাপের দিকেই যাচ্ছে, তেমনই খবর। তারই জন্য দু’চোখে জল, তিনিই মুছিয়ে দিয়ে বলছেন, ‘তোমার অসীমে প্রাণ-মন লয়ে যত দূরে আমি ধাই।’ আছে আছে আছে, দিদি আছেন, আমাদের সবার মধ্যে আছেন, আছেন তাঁর অন্ধের যষ্টি রবিঠাকুরের গানে। ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, তবে একলা চল রে’-এই ডাক চার-পাঁচের দশকে যখন কণ্ঠে তুলেছিলেন তখন গণনাট্য আন্দোলনে সামিল দিদি। আজও যে সেই ডাক শুনতে পাই।

নাহ, আর বোধহয় কিছু করা যাবে না। হৃদয় অসহযোগিতা ঘোষণা করবে করবে করছে। তবু শেষ একটা চেষ্টা। আসলে ওই দুয়ারটুকু পার হতে সংশয়। আর কোনও সংশয় নয়, থামল হৃৎস্পন্দন।

আরও পড়ুন: থিমের রঙে শারোদৎসব

সোমবার, ৩ জানুয়ারি, কালো হরিণ চোখের মাদকতা রেখে চলে গেলেন দিদি। কারোর বন্ধু, কারোর মাসি, কারোর দিদি, কারোর মা, কারোর আবার শুধুই বিশিষ্ট রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী, কলকাতার প্রথম মহিলা শারিফ সুচিত্রা মিত্র।
রাজার চিঠি এলে তাঁকে ধরে রাখে কার সাধ্যি! কিন্তু মনে হল, এ যাওয়া তো যাওয়া নয়। রাঙামাটির পথে পথে, বাঁশ বাগানের ফাঁকে ফাঁকে নৃত্যের তালে তালে কৃষ্ণকলি এগিয়ে চলে। সারা বনের মায়ায় লাগে তাঁর সুরের রং। হঠাৎ দেখি সেই দূর কৃষ্ণকলির মাঝেই ব্যস্ত ব্যাকুল পদে আসছে সেই মেয়ে। ‘….কী জানে হয় কোথায় বা ঘর, কী নাম কালো মেয়ে।’

Related Articles

Back to top button
Close