fbpx
অন্যান্যঅফবিটকলকাতাহেডলাইন

বেলাশেষে হোক বা শুরু শেষ পর্যন্ত তিনি হিরো

মনীষা ভট্টাচার্য: আমাদের স্কুল লাইফে (ন’য়ের দশক) বন্ধুদের মধ্যে হিন্দি সিনেমার নায়ক-নায়িকাদের নিয়েই বেশি দলাদলি হত। এর কারণ বাংলায় সেই সময় ঠিক ‘হিরো’ বলতে যা বোঝায়, তেমন কেউ ছিলেন না, অন্তত আমাদের কাছে। ফলত বাংলা ছবি নিয়ে আলোচনায় বসলে সেই অনাদি দু’ই পুরুষ উত্তমকুমার ও সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় নিয়েই তুমুল ঝড় উঠত। মেয়ে বলেই ছেলেদের মতো হাতাহাতি হত না বটে, তবে গলার শিরা-উপশিরারা প্রস্থে কিঞ্চিত বাড়ত, সেটা বলাই বাহুল্য। বলে রাখা ভাল, ব্যক্তি আমি সেই অর্থে কারও ফ্যান হতে পারিনি আজও। খারাপ-ভালোর দাড়িপাল্লায় নিজ বিচার-বুদ্ধির বাটখারাটিতেই আনন্দ পেয়েছি বেশি। সুতরাং আমায় পর্দায় উত্তমকুমার যে আনন্দ দিতেন, সৌমিত্রও সেই আনন্দই দিতেন। তবে আনন্দর রকম ফেরটা আলাদা, কারণ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে মঞ্চে দেখার সুযোগ ছিল, এখনও আছে। ফলত তিনি একটু এগিয়ে। সিনেমাতে শুধু তাঁর অভিনয়, কিন্তু মঞ্চে সর্বাঙ্গ তিনি। লিখছেন, অনুবাদ করছেন, পরিচালনা করছেন, অভিনয় তো করছেনই, তার পাশাপাশি তৎকালীন রঙ্গমঞ্চের কথাও তাঁকে মাথায় রাখতে হয়েছে।

অ্যাকশন-কাট দিয়েই শুরু নাকি দৃশ্যান্তর আগেই এসেছিল জীবনে? উত্তরে বিভিন্ন সময়ে বলেছেন, ছোটবেলাতে বাড়িতেই নাটকের পরিবেশ ছিল, তিনি অভিনয়ও করেছেন। পরবর্তীতে শিশিরকুমার ভাদুড়ীরর সান্নিধ্য পেয়েছেন, তাঁকে গুরু মেনেছেন। পরিচয় হয়েছে সাধারণ রঙ্গালয়গুলির সঙ্গে। স্বাধীনতার কিছু পরে পর্যন্তও পেশাদার রঙ্গমঞ্চের অবস্থা খুবই খারাপ ছিল। শিশির ভাদুড়ী তাঁর শ্রীরঙ্গম মঞ্চটিকেও ধরে রাখতে পারেন নি। সেই সময় স্টার থিয়েটারের ‘শ্যামলী’ নাটক দিনের পর দিন হাউসফুল দিয়েছে। এই ঐতিহাসিক ঘটনার সালটি হল ১৯৫৩। এরপর প্রায় ন’য়ের দশক থেকে একে একে পেশাদারী রঙ্গমঞ্চের অবসান হয়েছে। প্রায় অনেক থিয়েটারই পুরে গেছে, নয়তো বহুতল বাড়ি হয়ে গেছে। ১৯৫৯ সালে ‘অপুর সংসার’-এ তিনি এলেন, মানুষের ভালোবাসা পেলেন। তারপর চলচ্চিত্রের জগতে মাটি শক্ত করতে সময় লাগেনি, কিন্তু তাঁকে যে ডাকছে তাঁর প্রথম ভালোবাসা। মঞ্চ। খুব বেশি দেরি করলেন না, ১৯৬৩ সালে ‘তাপসী’ নাটকে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে যোগ দিলেন পেশাদার রঙ্গমঞ্চে। ৪৬৭ রজনী অভিনীত হয়েছিল এই নাটক। তৎকালীন যুগান্তরে লেখা হয়েছিল, ‘….সৌমিত্র চরিত্রটিকে (দীপক) একটি লক্ষ্যণীয় বৈশিষ্ট্য দান করেছেন এবং সাধারণ মঞ্চাভিনয়ের বিচারে এই অভিনয় নিঃসন্দেহে বিরল কৃতিত্বের পরিচায়ক।’ এই নাটক প্রসঙ্গে স্মৃতিচারণে সৌমিত্র বলেছেন, নাটকটির সত্বাধিকারী সলিল মিত্র তাঁকে পৌঁছে দিয়েছিলেন নির্দিষ্ট মেকআপরুমে, যেটি তাঁর প্রথাবিরুদ্ধ কাজ ছিল। সাজঘরের তালা খুলতে খুলতে বলেছিলেন, এই ঘরে বসে ছবি বিশ্বাস মেকআপ করতেন, তাঁর প্রয়াণের পর এটি তালা বন্ধ ছিল, সৌমিত্রের জন্যই পুনরায় খোলা হল।

soumitra

সেলুলয়েড এবং মঞ্চ দু’ইয়েই মানুষের সমর্থন পেলেন। সুতরাং এবার কিছু একটা করতে হবে। হাতে কলম তুলে নিলেন। জন্ম নিল ‘নামজীবন’। সালটা ১৯৭৮। মনে রাখতে হবে ততদিনে তিনি বউঠানের সাজা পান রিফিউজ করে, জীবনে পাওয়ার ভাবনা ভুলে, মেমারি গেমে জিতে, গোয়েন্দাগিরিতে হাত পাকিয়ে ফেলেছেন। ফলত মঞ্চে তাঁর উপস্থিতির একটা আলাদামাত্রা ছিল। কাশী বিশ্বনাথ মঞ্চে ‘নামজীবন’ মঞ্চস্থ করা সেই সময় ছিল এক চ্যালেঞ্জের ব্যাপার। উৎপল দত্ত এই প্রসঙ্গে বললেন, ‘আজকে বাংলা পেশাদার মঞ্চ রাসবিহারী-অসীমদের সীমাহীন ব্যভিচারে বিধ্বস্ত। এ অবস্থায় ‘’নামজীবন’’ এক চ্যালেঞ্জ, আপসহীনতার এক ইস্তেহার, আদর্শনিষ্ঠ এক সাধনা।’ এরপর তিনি নিয়ে এলেন তাঁর তৃতীয় নাটক ‘ফেরা’।

১৯৮৭-র জানুয়ারি থেকে ১৯৮৮-র ১৫ মে পর্যন্ত বিশ্বরূপায় এই নাটক চলেছিল। প্রচুর প্রশংসা পেলেন এতেও। তৎকালীন (আজও আছে) এক জনপ্রিয় বাংলা ম্যাগাজিনে লেখা হল, ‘সাতাশির শুরুতে শ্যামবাজারী মঞ্চে আমরা এমনি একটি নাটক পেয়ে গেলাম যা আমাদের অতীতের সমস্ত অক্ষমতা, নিঃস্বতাজনিত লজ্জাকে ঢেকে দেয়।’ এই নাটক আজও মঞ্চস্থ হয়, নতুন করে এর পরিচালনা করেছেন তাঁরই কন্যা পৌলমী চট্টোপাধ্যায়। ১৯৮৮ সালেই নিয়ে এলেন নতুন নাটক ‘নীলকণ্ঠ’। রঙমহল এবং পরে বিশ্বরূপায় এই নাটকের অভিনয় হয়েছে। ১৯৯০-এ হাসির নাটক ‘ঘটক বিদায়’ মঞ্চস্থ হল। ৩১৬তম অভিনয় শেষ হল যেদিন, সেদিন রাত দেড়টায় স্টার থিয়েটারে আগুন লাগে। পরবর্তীতে আরও কিছু শো হওয়ার পর এই নাটক বন্ধ ছিল। পৌলমীর পরিচালনায় নতুন করে এই নাটকও মঞ্চস্থ হচ্ছে এবং তাতে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় অভিনয়ও করছেন।

পেশাদারি মঞ্চের যুগে প্রায় একাই লড়াই করে গেছেন। দিয়ে গেছেন একদম অন্য রকম নাটকের স্বাদ। কিন্তু তাঁকেও কম্প্রোমাইজ করতে হয়েছে বলে অনেকেই মনে করেন। অনেকেরই বক্তব্য, যিনি ‘নামজীবন’, ‘রাজকুমার’, ‘ফেরা’ ইত্যাদির মতো নাটক করেছেন, তাঁকেই আবার করতে হয়েছে ‘চন্দনপুরের চোর’, ‘ঘটক বিদায়’-এর মতো নাটক। পেশাদারী মঞ্চ বন্ধ হয়ে গেলেও নাটক থামেনি তাঁর। ‘টিকটিকি’, ‘আত্মকথা’, ‘হোমাপাখি’, ‘কালমৃগয়া’, ‘দুটি কাপুরুষের কথা’ চলেছে, চলবেও। কিছুদিনের জন্য অভিনয় করেছিলেন মিনার্ভা রেপার্টারির আহ্বানে সুমন মুখোপাধ্যায়ের পরিচালনায় ‘রাজা লিয়ার’ নাটকেও।

সুমনের এক স্মৃতিচারণা দিয়ে এই লেখার ইতি টানব। সুমন বলছেন, রিহার্সালের জন্য জায়গা খোঁজা চলছে তখন, একদিন দক্ষিণ কলকাতার এক বাড়িতে কথা বলতে গিয়ে এক দারুণ অভিজ্ঞতা হয়। যাঁর বাড়ি তিনি জিজ্ঞেস করেছেন নাটকে কে অভিনয় করছেন? সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের নাম শুনে চিনতে না পারায়, তাঁর জনপ্রিয় ছবির নাম বলে অবাঙালি বাড়িওয়ালাকে সৌমিত্রকে চেনানোর চেষ্টা করা হচ্ছে যখন, তখন তিনি হঠাৎ বলে উঠলেন, ‘আচ্ছা আচ্ছা বিলাশেষে-ˆর হিরো যিনি…’।

সত্যিই তিনি হিরো…পর্দা হোক বা মঞ্চ, কিংবা ক্যানভাসের রং-তুলিতে, অথবা শব্দ জুড়ে জুড়ে কবিতা বিন্যাসে…।

 

Related Articles

Back to top button
Close