fbpx
অন্যান্যঅফবিটকলকাতাহেডলাইন

তাঁর ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়তেও ছিল নান্দনিকতা

মনীষা ভট্টাচার্য: শৃঙ্গার রস – শব্দবন্ধটি কি শুধুই নারীদের জন্য? একটু তলিয়ে দেখলে মনে হবে, না, পুরুষেরাও সাজতেন। হাতে বালা, বাজুবন্ধ, গলায় হার, মাথায় মুকুট। কিন্তু এতো রাজাদের ছবি। সাধারণ পুরুষের ছবি কেমন ছিল? সেক্ষেত্রেও হাতে পায়ে বালা দেখা যেত। রূপকথার বাইরে এসে বাস্তব মাটিতে চোখ রাখলে দেখা যাবে শৃঙ্গার শুধুই মেয়েদের জন্য । সাজ-পোশাক-ফ্যাশন সবই নারীকে কেন্দ্র করে। সেই চিরাচরিত ভাবনাতে প্রথম আঘাত পড়ল ১৯৯১ সালে। আঘাত দিলেন এক অভিজাত বাঙালি ঘরের বউ শর্বরী। কবি অজিত দত্তের কন্যা শর্বরী দত্ত।

শুধু নারীদের জন্য ফ্যাশান নয়, পুরুষেরাও সাজতে পারে, পুরুষদেরও সাজলে ভালো লাগে এই কথা বিশ্বাস করতে বাধ্য করিয়েছিলেন শর্বরী। কেন পুরুষদের সাজানোর কথা ভাবলেন, এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে শর্বরী দত্ত বলেছেন, তিনি যে পরিবারে, পরিবেশে বড় হয়েছেন তাতে চিত্রকলা, সাহিত্য, সংগীত এসবের চর্চা হত। নিজের অবচেতনে সেইগুলোই রয়ে গেছে। কোনও প্রথাগত শিক্ষা নয়, নিজের মনের মতো করে পুরুষকে সাজাতে তিনি নিজেই নকশা বানিয়েছেন। পশ্চিমী পোশাক ছেড়ে প্রাচ্য সাজে তিনিই সাজিয়েছেন বাঙালি থেকে অবাঙালি সকলকেই।

তাঁর ভাবনায় বার বার এসেছে পুরোনো পোশাকের কথা। আর তাই তিনি তার ডিজাইনে নতুন করে ফিরিয়ে আনেন আচকান , আংরাখা প্রভৃতি। তাঁর পোশাকে তিনি বরাবর ব্যবহার করেছেন উজ্জ্বল রং। হালকা রঙের সঙ্গে গাঢ় রঙের যুগলবন্দি ভালো হয় এই চিরাচরিত ভাবনার থেকে বেড়িয়ে এসে তিনি দুটি গাঢ় রঙের ব্যবহার করেছেন। তাঁর পোশাকে টকটকে লাল, কমলা , কালো ,তুঁতে, নীল এই সমস্ত রঙের ব্যবহারের আধিক্য ছিল। তাঁর পোশাকে ডিজাইন সব সময় তিনিই করেছেন। তাই হয়তো প্রতিটি ডিজাইনই ইউনিক এবং দ্বিতীয়বার ব্যবহৃত হয়নি। তাঁর ডিজাইনে প্রাধান্য পেয়েছে ভারতীয় সভ্যতা। ধুতি যে রঙিন হতে পারে তার চোখও খুলে দিয়েছিলেন শর্বরী দত্ত। তিনি বলেছেন ১৯৯১ সালে যখন প্রথম প্রদর্শনী করেন তখন অন্য সব বিক্রি হলেও একটিও রঙিন ধুতি বিক্রি হয়নি। অথচ আজ রঙিন ধুতিতে অভ্যস্ত আধুনিক পুরুষেরা। কোনওদিন কোনও ডিজাইন তাঁকে মুছতে হয়নি ,আর ভুল হলেও তা থেকে নতুন ডিজাইন সৃষ্টি করেছেন। ফেব্রিকের ওপর হ্যান্ড এমব্রয়ডারি , আঁড়ি স্টিচ , কাঁথার কাজে জীবন্ত করে তুলেছেন তাঁর ডিজাইন।

তিনি সাজতে ভালোবাসতেন, সাজাতে ভালোবাসতেন। তাই শেষের দিকে তিনি মেয়েদের জন্যও ভেবেছিলেন। পুরুষ এবং নারী উভয়কেই রুচিশীল এবং নান্দনিকভাবে সাজাতেন তিনি । বিশ্বজুড়ে যখন অস্থির পরিস্থিতি চলছে, তারি মধ্যে অকালে, অসময়ে বিদায় নিলেন শর্বরী দত্ত। শূন্য থেকে শুরু করে যখন জীবনের অঙ্ক মেলাতে শুরু করেছিলেন, ঠিক তখনই থেমে গেল তাঁর লাইফ লাইন। পারিবারিক সমস্যা, জটিলতা, মৃত্যু নিয়ে রয়ে গেছে অজস্র বিতর্ক।

আরও পড়ুন:১৫১ তম জন্মবার্ষিকীতে গান্ধিজীর প্রতি শ্রদ্ধা প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর

করোনার পরিস্থিতিতে স্যোশাল ডিস্টেনসিং-এর সময় গত ২৬ সেপ্টেম্বর, শনিবার ৬ বালিগঞ্জ প্লেসে সদ্য প্রয়াত শর্বরী দত্তকে স্মরণ করল তাঁর গুণমুগ্ধ আপনজনেরা।অনুষ্ঠানের মূল আয়োজক তাঁর কন্যাসমা রেশমী। অনুষ্ঠানের সঞ্চালক, অভিনেতা, চিত্রনির্মাতা অরিন্দম শীল কথা প্রসঙ্গে জানালেন, কমপ্লিট লকডাউনের সময় শর্বরী দত্তকে অসহায় সময় কাটাতে হয়েছে। প্রয়োজন মত ঔষুধ, হর্লিক্স কিনে আনার মানুষ ছিলনা তাঁর পাশে। শেষে কলকাতা পুলিশের ‘প্রণাম’-এর উদ্যোগে সেই সব পৌঁছে দিয়ে আসা হয় তাঁর বাড়িতে।

কাছের মানুষ রেশমী বলেন, ‘আজ পর্যন্ত যে কোনও কারণেই হোক না কেন, নিজেকে তিনি শর্বরীদির মেয়ে হিসেবে পরিচয় দিতে পারেনি, তবে আজকে আর সেই বাধা নেই। তাঁর অঙ্গিকার জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি ‘শূন্যের’-র উত্তরণ ঘটাবেন। ‘ইন লাভিং মেমারি অব শর্বরীদি’ শিরোনামের এই অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করেন বিশিষ্ট সংগীতশিল্পী ঋদ্ধি বন্দ্যোপাধ্যায়। বক্তব্য রাখেন পরমা এবং উপস্থিত অন্যান্য গুণিজনেরা।

Related Articles

Back to top button
Close