fbpx
আন্তর্জাতিকগুরুত্বপূর্ণবাংলাদেশহেডলাইন

হিন্দুদের ভয় দেখিয়ে বাংলাদেশ ত্যাগে বাধ্য করা হচ্ছে: রাণা দাশগুপ্ত

গত সাত মাসে ১৭ হিন্দু হত্যা, ৩০ জনকে ধর্ষণ, ২৩ অপহরণ, ৫০ মন্দিরে হামলা- মূর্তি ধ্বংস, ২৬ পরিবারকে বাড়ি-জমি থেকে উচ্ছেদ, ৩৪ জনকে দেশত্যাগের হুমকি, গ্রামছাড়া করা হয়েছে ৬০ পরিবারকে, ৭ জনকে জোরপূর্বক ধর্মান্তরকরণ, ৮৮ জনের বাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা ও অগ্নিসংযোগ।

যুগশঙ্খ প্রতিবেদন, ঢাকা: বাংলাদেশকে হিন্দুশূন্য করে সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে সংখ্যালঘু হিন্দুদের ভয়ে ভীত করে উচ্ছেদের মাধ্যমে তাদের দেশত্যাগে বাধ্য করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট রাণা দাশগুপ্ত। মঙ্গলবার সকালে চট্টগ্রামে প্রেসক্লাবে বিদ্যমান সংখ্যালঘু পরিস্থিতি নিয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন তিনি।

রাণা দাশগুপ্ত বলেন, ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে টার্গেট করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের পবিত্র ধর্মকে হেয় করে, তাদের ধর্মানুভূতিতে প্রতিনিয়ত আঘাত করে নানান অপপ্রচার বল্গাহীনভাবে চালানো হচ্ছে। শুধু কি তা-ই, রাষ্ট্র যখন সরকারি নানান সংস্থায় নিয়োগ, পদোন্নতিতে নাগরিকদের ধর্ম বিবেচনায় নয়, মেধা ও যোগ্যতাকে বিবেচনায় নেওয়ার চেষ্টা করতে শুরু করেছে তখন সাম্প্রদায়িক মহলবিশেষ এর বিরুদ্ধে বিভিন্নভাবে অপপ্রচার চালিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে নানান আজগুবী পরিসংখ্যান প্রচার করে। এখনও বলা হচ্ছে প্রতি রাষ্ট্র ভারত থেকে ২ লক্ষ হিন্দু বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। বাংলাদেশ সরকার তাদের নাগরিকত্ব দিয়েছে। আর ভারতীয় হাই কমিশনের তত্ত্বাবধানে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা র’-এর ইঙ্গিতে এরা সরকার, প্রশাসন ও পুলিশ বাহিনীর নানান গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ঠাই করে নিয়েছে। এরা ‘দেশপ্রেমিক’ লোকজন হয় ওএসডি নয়তো বা চাকুরিতে ঢুকতে পারছে না ইত্যাদি।

তিনি বলেন, অপপ্রচারকারীদের কেউ কেউ অন্যান্য স্পর্শকাতর বিষয়েও বল্গাহীন মিথ্যাচার করে চলেছে। লক্ষ্যনীয়, সংখ্যালঘু বিশেষ করে হিন্দু, ভারত ও বর্তমান সরকারকে একাকার করে সাম্প্রদায়িক প্রচার, প্ররোচনা এরা অব্যাহত রেখেছে। এর মধ্য দিয়ে তৃণমূলে সাম্প্রদায়িকতাকে অনেক বেশি প্রোথিত করে চলেছে ওরা ঠিক পাকিস্তানি আমলের মতো-ই। অথচ সরকার, প্রশাসন এক্ষেত্রে রহস্যজনক নীরবতা পালন করে চলেছে। এহেন সামগ্রিক পরিস্থিতিতে আমরা শঙ্কিত ও উদ্বিগ্ন।

রাণা দাশগুপ্ত আরও বলেন, ধর্ম-সম্প্রদায়-নির্বিশেষে সর্বস্তরের বাঙালী মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলো সন্ত্রাস, সাম্প্রদায়িকতামুক্ত অসাম্প্রদায়িক ধর্মনিরপেক্ষ বৈষম্যহীন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের জন্যে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট- পরবর্তীতে আমরা রাষ্ট্রীয়, রাজনৈতিক, সামাজিক- এ তিন ধরণের সাম্প্রদায়িক আগ্রাসনের মুখোমুখী হয়েছি। ১৯৯০, ১৯৯১, ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের রাষ্ট্রীয় সাম্প্রদায়িকতার কথা আমরা ভুলিনি। ২০০৮- পরবর্তী সরকারের আমলে রাষ্ট্র রাষ্ট্রীয় সাম্প্রদায়িকতাকে পেছনে ফেলে এগুনোর চেষ্টা করলেও ২০১১ থেকে অদ্যাবধি চলমান রাজনৈতিক ও সামাজিক সাম্প্রদায়িকতার মুখোমুখি আমরা।

তিনি বলেন, ফেইসবুক হ্যাক করে, বা ভুয়ো স্ক্রিনশট তৈরি করে উদ্দেশ্যমূলকভাবে ধর্ম অবমাননার মিথ্যা গুজব রটিয়ে কক্সবাজার-রামু-উখিয়া টেকনাফের সাম্প্রদায়িক ধ্বংসলীলা থেকে পাবনার সাঁথিয়া, দিনাজপুরের চিরিরবন্দর, ব্রাহ্মণবাড়ীয়ার নাসিরনগর, রংপুরের গঙ্গাচড়া, ভোলার বোরহানউদ্দীনের ধ্বংসলীলা বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করেছিল তা আমরা জানি এসব দুর্ষ্কের জন্য দায়ী যারা তারা আজও ধরা ছোঁয়ার বাইরে। কেউ কেউ বিচারের মুখোমুখি হলেও তা অনেকটা প্রহসনে পরিণত হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, শাহাবউদ্দিন কমিশন, যা গঠিত হয়েছিল ২০০১-২০০৬ সালের রাষ্ট্রে রাষ্ট্রীয় সাম্প্রদায়িকতার সঙ্গে যারা জড়িত তাদের সনাক্ত করার জন্যে, সুপারিশ সম্বলিত রিপোর্ট পেশ করেছিল ২০১১ সালের শেষের দিকে। আজ ৯ বছর শেষ হতে চলেছে। এর সুপারিশ বাস্তবায়ন দূরে থাকুক, রিপোর্ট এখনো আলোর মুখ দেখলো না-এটি রহস্যজনক। আজকের এ সংবাদ সম্মেলন থেকে আমরা আবারও শাহাবউদ্দিন কমিশনের রিপোর্ট জনসমক্ষে প্রকাশ ও এর সুপারিশবলী দ্রুততম সময়ে বাস্তবায়নের দাবি জানাই।

সংবাদ সম্মেলনে ঐক্য পরিষদের শীর্ষ এই নেতা বলেন, চলতি বছরে (২০২০ সালে) করোনাভাইরাস সৃষ্ট দুর্যোগপূর্ণ মহামারীতেও ধর্মীয়-জাতিগত-সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর উপর রাজনৈতিক ও সামাজিক সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস পূর্বেকার মতো অব্যাহত ছিল। এসব সন্ত্রাসের কোন কোনটির সঙ্গে সন্ত্রাসীরা সরকারি দল আওয়ামি লিগ ও বিএনপি’র নেতা-কর্মীর পরিচয় দিয়েছে। বিগত মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর-এ ৭ মাসের সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের শিকার হয়েছে হিন্দুরা।

বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের নিজস্ব সূত্র, বাংলাদেশ মাইনোরিটি ওয়াচ ও শীর্ষ গণমাধ্যম থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে বিগত সাত মাসের করোনাকালীন সময়ের এই সাম্প্রদায়িক চালচিত্র তুলে ধরে রাণা দাশগুপ্ত বলেন, গত সাত মাসে হত্যার শিকার ১৭ জন, হত্যাচেষ্টার শিকার ১০ জন, হত্যার হুমকি দেয়া হয়েছে ১১ জনকে, ধর্ষণের/গণধর্ষণের/নির্যাতনের শিকার ৩০ জন, ধর্ষণের চেষ্টা ৬ জনকে, শ্লীলতাহানীর কারণে আত্মহত্যা ৩ জন, অপহরণের শিকার ২৩ জন, অপহরণের চেষ্টা ২ জনকে, নিখোঁজ ৩ জন, প্রতিমা ভাংচুর ২৭টি, মন্দিরে হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগের ঘটনা ২৩টি, শ্মশান/ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সম্পত্তি দখলের ঘটনা ৫টি, বসতভিটি, জমিজমা, শ্মশান থেকে উচ্ছেদের ঘটনা ২৬টি, বসতভিটি, জমিজমা, শ্মশান থেকে উচ্ছেদের অপপ্রয়াসের ঘটনা ৭৩টি, দেশত্যাগের হুমকি দেয়া হয়েছে ৩৪ জনকে, গ্রামছাড়া করা হয়েছে ৬০টি পরিবারকে, ধর্মান্তরিত হওয়ার জন্য হুমকি ৪ জনকে, জোরপূর্বক ধর্মান্তরকরণ ৭ জনকে, বসত ভিটা/ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাটের ঘটনা ৮৮টি, দৈহিক হামলায় গুরুতর জখম ২৪৭ জন, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কর্তৃক ত্রাণ বিতরণকালে ইসলাম ধর্ম গ্রহণে আহ্বান জানানো হয়েছে ২০টি পরিবারকে, মহানবীকে কটুক্তির মিথ্যা অভিযোগে আটক ৪ জন।

তিনি বলেন, এ চালচিত্র সম্পূর্ণ চালচিত্র নয়, সমগ্র ঘটনার আংশিক মাত্র। আসলে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা বাংলাদেশে নিত্যদিনের স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর মূল লক্ষ্য হলো- ধর্মীয়-জাতিগত সংখ্যালঘুদের ভয়ে ভীত করে উচ্ছেদের মাধ্যমে তাদের দেশত্যাগে বাধ্য করা যাতে, দেশটি সংখ্যালঘুশূন্যে পরিণত হয়। পাকিস্তানি আমলের সাম্প্রদায়িক মহলবিশেষের এ ঘূণ্য চক্রান্ত স্বাধীন বাংলাদেশেও অব্যাহত রয়েছে। এ চেষ্টা ফলপ্রসূ হলে দেশ ও জাতি গভীর সঙ্কটে নিপতিত হওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।

আরও পড়ুন: হিন্দুদের নিরাপত্তা দিন… শেখ হাসিনাকে কড়া বার্তা ভিএইচপির

সাম্প্রতিক হিন্দু নির্যাতনের ঘটনা তুলে ধরে তিনি বলেন, ধর্ম অবমাননার জিগির তুলে দিনাজপুরের পার্বতীপুর ও কুমিল্লার মুরাদনগরের সংখ্যালঘু এলাকায় আক্রমণ, অগ্নিসংযোগ, নারীনির্যাতন; ছাত্রদের-ছাত্রীদের ছাত্রত্ব বাতিলের অপপ্রয়াস, অধ্যাপক কুশল চক্রবর্তীকে হত্যার হুমকি, ধর্মপ্রাণ শহিদুন্নবীকে পিটিয়ে পুড়িয়ে হত্যার প্রতিবাদে এবং গ্রেফতারকৃত ছাত্র-ছাত্রীদের আশু মুক্তি, শো-কজ নোটিশ প্রত্যাহার, সংখ্যালঘু সুরক্ষায় আইন প্রণয়ন, জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন ও সংখ্যালঘু মন্ত্রক গঠনের দাবিতে আগামী ৭ নভেম্বর’২০ শনিবার সকাল ১০টা থেকে বেলা ১২টা পর্যন্ত সারাদেশে জেলা, উপজেলা, মহানগর ও বিভাগীয় সদরের মূল সড়ক সংযোগস্থলে গণঅবস্থান ও অবস্থান শেষে বিক্ষোভ মিছিলের কর্মসূচী ঘোষণা করছি। ঢাকায় এ কর্মসূচী পালিত হবে শাহবাগ চত্বরে আর চট্টগ্রামে নিউমার্কেট চত্বরে।

Related Articles

Back to top button
Close