fbpx
একনজরে আজকের যুগশঙ্খগুরুত্বপূর্ণবাংলাদেশব্লগহেডলাইন

বাংলাদেশের হিন্দু: এক হতভাগ্য জনগোষ্ঠী

তথাগত রায়: বাংলাদেশের কুমিল্লা জেলার, মুরাদনগর উপজেলার কোরবানপুর গ্রামে যে হিন্দুনির্যাতন নতুন করে আরম্ভ হয়েছে তা এই লেখকের মতো আরও কয়েকজনকেও একটি প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে : বাংলাদশের হিন্দুরাই কি পৃথিবীর সবচেয়ে হতভাগ্য জনগোষ্ঠী? এ নিয়ে দ্বিমত থাকতে পারে, কিন্তু এ বিষয়ে সন্দেহ নেই যে তারা অন্যতম হতভাগ্য জনগোষ্ঠী তো অবশ্যই! ১৯৪৬ সাল থেকে নিজেদের প্রতিবেশী মুসলমানের পদাঘাত খেয়ে, বাড়ির মেয়েদের চোখের সামনে ধর্ষিতা হতে দেখে, একেবারে নিরুদ্দেশ হওয়াও সহ্য করে, পুরুষদের নৃশংসভাবে খুন হতে দেখে, ঘর-বাড়ি-পুকুর-ক্ষেত বেহাত হতে দেখে অনেক ক্ষেত্রে প্রায় একবস্ত্রে যাঁরা পশ্চিমবাংলা অসম বা ত্রিপুরায় শরণার্থী হয়ে হাজির হয়েছেন তাঁরাই পূর্ববাংলা, পূর্ব পাকিস্তান বা বাংলাদেশের হিন্দু| পঞ্জাবের উদ্বাস্তুরা ভারতে এসে পলায়মান মুসলমানদের ফেলে-আসা সম্পত্তি পেয়েছেন, সরকারি ব্যবস্থাপনায় দিল্লির কালকাজি, লাজপত নগর বা রাজিন্দর নগরের মতো জায়গায় বাসস্থান পেয়েছেন, পিলিভিটের মতো জায়গায় চাষের জমি পেয়েছেন| আর বাঙালি উদ্বাস্তুরা (কতিপয় দূরদর্শীদের বাদ দিলে) পেয়েছেন অবহেলা, বিদ্রুপ, ঘৃণা, এবং অনেকক্ষেত্রে পুলিশের গুলি| আরও পেয়েছেন বামপন্থীদের নির্লজ্জ রাজনৈতিক সুবিধা-নেওয়া, এবং পরে তাদেরই হাতে মরিচঝাঁপির মতো গণহত্যার শিকার হওয়া। পূর্ববাংলায় যে-অত্যাচার তাঁরা সহ্য করেছেন ভারতে আসবার পরে তা নিয়ে তাঁদের মুখ থেকে যেমন কোনও কথা বেরোয় নি, তেমনি যে-স্বজাতিকে তাঁরা ফেলে এসেছেন তা নিয়েও তাঁরা নির্বাক থেকেছেন| ইতিমধ্যে অত্যাচার, নারীধর্ষণ, ধর্মস্থান অপবিত্রকরণ, নির্যাতন সমানে চলেছে, চন্দ্রকলার মতো তা কখনও বেড়েছে, কখনও কমেছে।

মুরাদনগরের ঘটনা অনেকেই কাগজে পড়েছেন বা টিভিতে দেখেছেন এ নিয়ে সবিস্তারে বলবার কোনও দরকার নেই| ফ্রান্সে একটি চেচেন মুসলমান ছেলে (সেও রাশিয়া থেকে আসা শরণার্থী) তার শিক্ষকের শিরশ্ছেদ করেছিল, কারণ তিনি হজরত মহম্মদের একটি কার্টুন তাকে দেখিয়েছিলেন|এর প্রতিবাদে গোটা ফ্রান্স ফেটে পড়ে এবং শার্লি এবদো নামক ওয়েবসাইটটি এই কার্টুন বার বার দেখাতে থাকে, এই কার্টুন প্রকাশ্যেও দেখানো হয়| এতে নাকি মুরাদনগরের কোনও হিন্দু ছেলে বা মেয়ে ‘লাইক’ মেরেছিল, তারই ফলশ্রুতিতে ইসলামী জনতা এই অঞ্চলের হিন্দুদের বাড়ি বেছে বেছে জ্বালিয়ে দেয়, তার মধ্যে স্থানীয় ইউনিয়ন প্রধান বনকুমার শিব-এর বাড়িও জ্বালানো হয়| পুলিশ অবশ্যই এই মত্ত জনতার বিরুদ্ধে কোনও পদক্ষেপ নেয়নি, কিন্তু ধর্মবিশ্বাসে আঘাত করার জন্য দুটি হিন্দু ছেলেকে গ্রেফতার করে| ব্যাপারটা লুকোবার কোনও অবকাশ নেই (যা আগে করা হত) কারণ এই অগ্নিসংযোগের ঘটনার ভিডিও ভাইরাল হয়ে গেছে।
কিন্তু কোনও হিন্দু ছেলের ‘লাইক’ মারার গল্পটা কি বিশ্বাসযোগ্য? যে সব ভারতীয় বাঙালি বাংলাদেশের হিন্দুদের সঙ্গে মিশেছেন তাঁরা জানেন

বাংলাদেশের হিন্দুরা কতদূর ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে আছে! আজকে বাংলাদেশের সংখ্যাগুরু যুবসম্প্রদায়ের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ বিশ্বাস করে যে বাংলাদেশ মূলতঃ মুসলমানের দেশ এবং এখানে হিন্দুরা নেহাতই যদি থাকতে চায় তাহলে তাদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক বা ধিম্মি হয়েই থাকতে হবে| এই যুবদের মধ্যে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের সংখ্যা কিছু কম নয়| আর জামাত বা শিবিরপন্থী যারা আছে তারা তো সরাসরি হিন্দুদের খুন বা ধর্ষণ বা নিদেনপক্ষে বিতাড়ন করার জন্যই মুখিয়ে আছে! এই পরিস্থিতিতে কি কোনও হিন্দুর সাহস হবে এইরকম একটি স্পর্শকাতর বিষয়ে ‘লাইক’ মারার?

উত্তর, হবে না| তাহলে এই মুরাদনগরের ব্যাপারটা কি? আর কিছু নয়, যখন প্রচুর বেকার যুববাহিনীর কিছু করার থাকে না তখন তারা সুযোগ খোঁজে এরকম একটা ‘মজা’ করার! শুধু একটা অজুহাত দরকার| তারপর চ্যাঁচাতে হবে “ইসলাম বিপন্ন” এবং আক্রমণ করতে হবে ভীতসন্ত্রস্ত, নিঃসহায় দরিদ্র হিন্দুদের| এদের আগে থেকে তো চেনাই আছে, যেরকম ১৯৮৪ সালে ভারতে চেনা ছিল শিখদের! এই কাজ সম্পূর্ণ ঝুঁকিবিহীন, কারণ একবার কোনও অজুহাত আশ্রয় করে “ইসলাম বিপন্ন” জিগির তুলতে পারলে হিন্দু-নির্যাতনকারীরা জিহাদি হিসাবে চিহ্নিত হবে –এবং কে না জানে, জিহাদের চেয়ে পবিত্র কাজ আর নেই!

অতএব সমস্যা শুধু অজুহাত পাওয়া| আজকের সামাজিক সংবাদমাধ্যমের রমরমার দিনে এই কাজটাও খুব সোজা হয়ে গেছে| প্রথমে একটা কাল্পনিক হিন্দু নাম খাড়া করে একটা ফেসবুক একাউন্ট খুলতে হবে| তারপর সেই অ্যাকাউন্ট থেকে ইসলাম বা তাদের নবীর নামে অপমানজনক কিছু লিখতে হবে| তারপরেই আক্রয়| এই জিনিস কিছুদিন আগেই, ২০১৬ সালে হয়েছিল কুমিল্লার পার্শ্ববর্তী জেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে| অভিযুক্ত হয়েছিল রসরাজ দাস নামে একটি প্রায়-নিরক্ষর হিন্দু মৎস্যজীবী যুবক, যে ফেসবুক কি পদার্থ তাই জানে না| ধ্বংস হয়েছিল উনিশটি হিন্দু মন্দির, শ’তিনেক হিন্দুর বাসস্থান, আহত হয়েছিল শ’খানেকের উপর হিন্দু।

আরও পড়ুন: প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভূয়ষী প্রশংসায় আমেরিকার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা

আর এগুলি হচ্ছে শেখ হাসিনার সরকার থাকাকালীন ঘটনা| খালেদা জিয়ার আমলে কি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছিল এই হিন্দুনির্যাতন তা অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে লিপিবদ্ধ করেছেন শাহরিয়ার কবিরের নেতৃত্বে একটি টিম, যার ফলশ্রুতি তিন খন্ডে বিশাল শ্বেতপত্র, “বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতনের ১৫০০ দিন”| তা ইসলামী মৌলবাদীদের গভীর অপছন্দ, যেজন্য তারা শাহরিয়ার কবিরকে ‘মুরগি কবির’ বলে ডাকে |
এই প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, যাঁরা বাংলা ভাষা নিয়ে উচ্ছ্বাস করে বোঝাতে চান যে দুই সম্প্রদায়ের বাঙালিই ভাষার বন্ধনে আবদ্ধ, তাঁরা মনে রাখলে ভাল করবেন যে মুরাদনগর এবং নাসিরনগর, দুই জায়গাতেই এবং শাহরিয়ার কবির বর্ণিত সমস্ত জায়গাতেই আক্রমণকারীরাও বাঙালি, আক্রান্তরাও বাঙালি| এবার তাঁরাই সিদ্ধান্ত করে নিতে পারেন, ভাষার বন্ধন বড় না ধর্মের বন্ধন বড় ? বস্তুত, আজকে উত্তরপূর্বের বাঙালি-হিন্দুর কাছে এটাই সবচেয়ে মৌলিক প্রশ্ন | এও মনে রাখতে হবে যে ময়মনসিং থেকে চোরাপথে আগত বাঙালি মুসলমানেরা কিন্তু লোকগণনার সময়ে নিজেদের ভাষা অসমিয়া বলে ঘোষণা করেছিল, যদিও তারা এক অক্ষরও অসমিয়া বলতে পারত না| মুসলমানের রাজনৈতিক চেতনা চিরকালই হিন্দুদের চেয়ে অনেক বেশি প্রখর, বাঙালি-হিন্দু শুধু আবেগে ভেসে যায়।

এবার প্রশ্ন: বাংলাদেশে বাঙালি হিন্দুর কি কোনো ভবিষ্যৎ আছে? তারা আর কতদিন সেদেশে থাকতে পারবে?

এই জনগোষ্ঠীর অনেক সমস্যা| প্রথমত, তাদের কোনও উল্লেখযোগ্য নেতৃত্ব নেই, সংগঠনও আদৌ জোরদার নয়| ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পরে বড় নেতারা বেশিরভাগই ভারতে পালিয়েছিলেন| যাঁরা সাহস করে থাকবার চেষ্টা করেছিলেন, যেমন সতীন্দ্রনাথ সেন, ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত, সমর গুহ, লীলা রায়-অনিল রায়, প্রভাস লাহিড়ী, চিত্তরঞ্জন সুতার প্রভৃতি তাঁদের হয় পাকিস্তান সরকার মেরে ফেলে, আর না হলে জীবন দুর্বিষহ করে দিয়ে ভারতে পালাতে বাধ্য করে| বাংলাদেশ হবার পর নতুন কোনো নেতা তৈরী হননি| সংগঠন বলতে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ আছে, রানা দাশগুপ্ত প্রমুখ কিছু নেতৃস্থানীয় মানুষ আছেন, এই পর্যন্ত | বরঞ্চ তাঁদের সমস্যা জোরগলায় বলেছেন কিছু বিবেকবান মুসলমান লেখক-গবেষক-সাংবাদিক, যেমন মুনতাসির মামুন, শাহরিয়ার কবির, সালাম আজাদ, আবুল বারকাত এবং অবশ্যই, তসলিমা নাসরিন|

আমি যখন ত্রিপুরার রাজ্যপাল এবং প্রয়াত সুষমা স্বরাজ ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তখন আমি তাঁর সঙ্গে এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছিলাম | সুষমাজির সঙ্গে আমার অত্যন্ত প্রীতির সম্পর্ক ছিল, এবং তাঁর মধ্যে একটা সহজাত মাতৃভাব ও মানবিকতা ছিল যেটা আমি খুম কম মহিলা বা পুরুষ রাজনৈতিক নেতার মধ্যে লক্ষ্য করেছি | সুষমাজি আমাকে বলেছিলেন বাংলাদেশের হিন্দুদের সুরক্ষার জন্য আমাদের আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার দিকে চেয়ে থাকা ছাড়া গত্যন্তর নেই | আমি আরো বিস্তারিত আলোচনা করেছি শেখ হাসিনার অন্যতম উপদেষ্টা গওহর রিজভি এবং ভারতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত প্রয়াত সৈয়দ মুয়াজ্জেম আলীর (ইনি আমার অন্যতম প্রিয় বাংলা গদ্যলেখক সৈয়দ মুজতবা আলীর ভাইপোও বটে)।

এই বিষয়ে আমি বহুদিন যাবৎ কিছু চিন্তাভাবনা করছি| দুঃখের বিষয়, আমার মতো ছোট মাপের রাজনীতিক বা প্রাবন্ধিক ছাড়া আর বাঙালি হিন্দুর কেউ এবিষয়ে গভীরভাবে ভেবেছেন আঙুলে গোনার মত কিছু লোক মাত্র| পূর্ববাংলা থেকে হিন্দু বিতাড়নের বিষয়ে একমাত্র পূর্ণাঙ্গ ইংরেজি বই আমারই লেখা “My People, Uprooted”, যার বাংলা সংস্করণ “যা ছিল আমার দেশ” | বাংলায় অবশ্য সুখরঞ্জন সেনগুপ্ত, দীনেশচন্দ্র সিংহ প্রমুখ কয়েকজন বেশ কিছু লিখেছেন। আমার ব্যক্তিগত উপলব্ধি, যতক্ষণ বাংলাদেশের হিন্দুদের নিকটতম আত্মীয় পশ্চিমবাংলার হিন্দুরা এ সম্বন্ধে সজাগ না হচ্ছেন এবং বাংলাদেশের হিন্দুদের উপর অত্যাচারের বিরুদ্ধে আওয়াজ না তুলছেন ততক্ষণ বাকি ভারতের হিন্দুরা, এমনকি বিশ্ব হিন্দু পরিষদের মত সংস্থাও এই বিষয়ে কিছু করবে না।কেন করবে না? কারণ তারা জানতেই পারবে না বাংলাদেশে কি হচ্ছে| তা ছাড়া তাদের তো স্বাভাবিকভাবেই মনে হবে, বাঙালি-হিন্দুরাই যখন এই বিষয়ে সজাগ নয় তখন উত্তরপ্রদেশ মহারাষ্ট্র পাঞ্জাবের হিন্দুর কি দায় পড়েছে এই নিয়ে মাথা ঘামাবার?

আরও পড়ুন: হাসিনাকে হটাতে বিরোধীদের আন্দোলনের প্রস্তুতি! ঢাকায় ৯ বাসে আগুন

সুতরাং পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি-হিন্দু যদি ভিয়েতনাম নিকারাগুয়া চিলি কিউবা ইরাক ইত্যাদি নিয়ে একটু কম মাথা ঘামিয়ে নিজের নিকটতম আত্মীয়, অর্থাৎ বাংলাদেশের হিন্দুদের দুরবস্থা নিয়ে একটু বেশি ঘামায় তা হলে বাংলাদেশের হিন্দুদের কিছু ভবিষ্যৎ থাকলেও থাকতে পারে| আর যদি “আমরা সাম্প্রদায়িক নই, আমরা বিশ্বভ্রাতৃত্বে বিশ্বাসী” বলে নিজের প্রেমে নিজেই মজে থাকে তাহলে বাংলাদেশী হিন্দুরা ধ্বংস হয়ে যাবে| প্রথমে তাই হবে| তারপর পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি হিন্দুও ধ্বংস বা বিলুপ্ত বা ধর্মান্তরিত হয়ে যাবে।

(মতামত নিজস্ব)

Related Articles

Back to top button
Close