fbpx
অফবিটঅসমহেডলাইন

ইন্ডিয়া ক্লাব : শিলচরের খেলাধুলার আঁতুড়ঘর

তাজ উদ্দিন, শিলচর : বর্তমান শিলচর শহরের বুকে যেখানে গোলদিঘি মল রয়েছে, একসময় সেখানে ছিল একটি দিঘী। সেই স্মৃতি এখনও শহরের অনেকেরই রয়েছে। কিন্তু এই গোলদিঘিতেই একসময় ওয়াটার পোলো খেলার জমজমাট আসর বসতো। সেটা ক’জনই-বা জানেন? প্রাক স্বাধীনতার সময়ে শিলচরের ঐতিহ্যবাহী ইন্ডিয়া ক্লাব সেখানে নিয়মিত ওয়াটার পোলো আয়োজন করত।

 

শিলচরের ক্লাবগুলির তালিকায় প্রথম শ্বাসে যে কয়েকটি ক্লাবের নাম চলে আসে তাদের মধ্যে অবশ্যই রয়েছে ইন্ডিয়া ক্লাব। ঠিক ১৯০০ সালে ক্লাবটি প্রতিষ্ঠিত হয়। পরাধীন ভারতে জাতীয় ভাবাবেগে অনুপ্রাণিত হয়ে গড়া ক্লাবটির নাম শুরুতে ছিল ন্যাশনাল ক্লাব। ১৯০৩ সালে সেটা বদলে রাখা হয় ইন্ডিয়া ক্লাব। তৎকালীন সুরমা উপত্যকা এবং অসমে বিভিন্ন খেলাধুলার পথিকৃত হিসাবে কাজ করেছে এই ক্লাব। প্রথম প্রথম তাদের খেলা হতো সাহেবদের বিরুদ্ধে। ফুটবলে বুট পরা সাহেবদের বিরুদ্ধে ইন্ডিয়া ক্লাবের ফুটবলারদের খালি পায়ের ম্যাচ অনেকটা স্বাধীনতা আন্দোলনের লড়াইয়ের মতো ছিল। ক্লাবটি সচল রাখার ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি অবদান ছিল ক্যাপ্টেন নলিনী মোহন গুপ্তের। তিনি টানা ৩০ বছর ক্লাবের অধিনায়ক ছিলেন। তিনি সেনাবাহিনীর কোন‌ও ক্যাপ্টেন ছিলেন না। ক্লাবের অধিনায়ক হওয়ার সূত্রেই তিনি ক্যাপ্টেন নামে পরিচিতি লাভ করেছিলেন।

 

 

১৯১৭ সালে বরাক উপত্যকার গণ্ডি পেরিয়ে কলকাতায় আই এফ এ শিল্ডে অংশগ্রহণ করে ইন্ডিয়া ক্লাব। বর্তমান ক্লাব ঘরটি ওই বছর তৈরি করা হয়। ১৯২৩-র মধ্যে চার-চারবার শিল্ডে খেলতে যায় ইন্ডিয়া ক্লাব। স্বাভাবিকভাবে নাম যশ বাড়তে থাকল শিলচরের ক্লাবটির। অন্যান্য জায়গা থেকেও ডাক আসতে লাগল তাদের। ১৯৩১ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত নির্মল শিল্ড ফুটবল আসরে তারা অংশ নিয়ে রানার্স আপের গৌরব অর্জন করে । ১৯১৯ সালে ডি এন দত্ত কাপের মাধ্যমে শিলচরে হকি খেলার প্রবর্তন করে ইন্ডিয়া ক্লাব। পরের বছর অসমের প্রথম দল হিসেবে তারা কলকাতায় বেটন কাপে অংশগ্রহণ করে। দলের খেলোয়াড় আশুতোষ দত্ত পরে কলকাতার গ্রিয়ার স্পোর্টিং ক্লাবে অধিনায়কত্ব করেন। ১৯২৩-এ তাঁর নেতৃত্বে কলকাতা হকি লিগে জয়ী হয় গ্রিয়ার স্পোর্টিং।

 

 

গত ১২০ বছরে বিভিন্ন ক্রীড়া আসরে সাফল্য দেখিয়েছে ইন্ডিয়া ক্লাব। ফুটবল ও ক্রিকেটে শিলচরে সব ধরনের আসরেই বিভিন্ন সময়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে তারা। কিন্তু বাইরের সাফল্য বেশি দিন তারা ধরে রাখতে পারেনি। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে উল্লেখযোগ্য সাফল্যের মধ্যে ১৯৫৪ সালে গুয়াহাটিতে বরদলৈ ট্রফিতে রানার্স হয় ইন্ডিয়া ক্লাব। ২০০৭ সালে আসাম ক্লাব কাপ ফুটবলে অংশ নিলেও দ্বিতীয় রাউন্ড থেকে ছিটকে যায়।

 

 

খেলাধুলার আয়োজক হিসেবে ১৯২৪ সালে আর্বুটনট ট্রফি, ১৯২৬-এ ভারতীয় ও ইউরোপীয়দের মধ্যে আন্তর্জাতিক টূর্নামেন্ট ‘লেডি কার শিল্ড’ চালু করে ইন্ডিয়া ক্লাব। যদিও কোন‌ওটিরই স্থায়িত্ব ছিল না। ১৯৬২ সালে ক্লাবের চালু করা ক্যাপ্টেন গুপ্ত ও খগেশ চন্দ্র সেন স্মৃতি ফুটবল আসর ডি এস এ-র ব্যানারে এখনও চলছে।

 

 

ক্যাপ্টেন গুপ্তের একান্ত প্রয়াসে ১৯১৫ সালে বর্তমান মাঠটি পায় ইন্ডিয়া ক্লাব। এর পেছনেও রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস। তদানীন্তন আসামের চিফ কমিশনার স্যার আর্কডেল আর্ল সাহেবের কাছে জেলাশাসকের মাধ্যমে ইন্ডিয়া ক্লাবের জন্য মাঠের আবেদন করেছিলেন ক্যাপ্টেন গুপ্ত। স্যার আর্ল জমি দিতে সম্মত হন, তবে শর্ত সাপেক্ষে। শর্ত ছিল–ক্যাপ্টেন গুপ্তকে প্রয়োজনে কিছু যুবককে নিয়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সৈন্য দলে যোগদান করতে হবে। অকুতোভয় ক্যাপ্টেন গুপ্ত ২০ জন অনুগামীকে নিয়ে ইন্ডিয়ান ডিফেন্স ফোর্সেস-এ যোগ দেন এবং কলকাতায় ছয় মাসের মিলিটারি ট্রেনিং নিতে যান। ফিরে আসার পর ১৫ বিঘা জমির বন্দোবস্ত পান। সেখানে এখন মাঠ ও ইন্ডোর স্টেডিয়াম রয়েছে।
১৯৪৮ সালে লন্ডন অলিম্পিকগামী ভারতীয় ফুটবল দল এই মাঠে দুটি প্র্যাকটিস ম্যাচ খেলেছে। ১৯৬৩-তে চুনী গোস্বামীর নেতৃত্বে এখানে দুটি প্রদর্শনী ম্যাচও খেলে মোহনবাগান।

 

 

১৯৯৪ সালে ইন্ডিয়া ক্লাবের ইন্ডোর স্টেডিয়ামের ভিত্তি স্থাপন করেন প্রয়াত সন্তোষ মোহন দেব। নিজের সংসদ উন্নয়ন তহবিল এবং বিভিন্ন সংস্থা থেকে অনুদানের বড় অংশই জোগাড় করে দিয়েছেন তিনি। এর মধ্যে ইন্ডিয়ান টি অ্যাসোসিয়েশনের সুরমা ভ্যালি ব্রাঞ্চ ৩৬ লক্ষ, ও এন জি সি-র কাছাড় ফরোয়ার্ড বেস থেকে সাড়ে চার লক্ষ, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ডঃ মনমোহন সিংয়ের সাংসদ তহবিল থেকে পাঁচ লক্ষ, লাকি ডোনেশন কুপন থেকে সাড়ে পাঁচ লক্ষ, বিভিন্ন শিল্প সংস্থা থেকে ৪৮ লক্ষ টাকা আসে। কাজ সম্পূর্ণ না হলেও অন্তত খেলাধুলা চালিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা হয়ে গেছে এই ইন্ডোর স্টেডিয়ামে।

 

 

২০১৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত টেবিল টেনিস কোচিং সেন্টার পরিচালনা করে ইন্ডিয়া ক্লাব। প্রশিক্ষণের অভাবে পরে সেটা বন্ধ হয়ে যায়। ২০১৪-র নভেম্বরে তারা ব্যাডমিন্টন কোচিং সেন্টার চালু করে। সেটা অবশ্য এখনও বেশ ভালভাবে চলছে। ২০১৯ সালে ব্যাডমিন্টন প্রতিযোগিতা আয়োজন করে ক্লাব। এর অভিনবত্ব ছিল যে এই প্রথমবার বরাক উপত্যকায় কোন‌ও ব্যাডমিন্টন টুর্নামেন্টে খেলোয়াড়রা লিগ ফরম্যাটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেন।

 

 

ক্রিকেটে ইন্ডিয়া ক্লাব ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর থেকে কোচিং ক্যাম্প চালাচ্ছে। এর নাম দেওয়া হয়েছে ইন্ডিয়া ক্লাব ক্রিকেট ফাউন্ডেশন সেন্টার। এতে বাইরে থেকে রাজীব রাজবংশী, বাবুরাম মেগর, জাভেদ খান প্রমুখ কোচরা এসে কয়েক দফায় প্রশিক্ষণ দিয়ে গেছেন।

 

 

সবকিছুর পরও নিজেদের খেলাধুলার বৃত্তটা ছোট করে ফেলেছে ইন্ডিয়া ক্লাব। ক্রিকেট ও ফুটবলের বাইরে একমাত্র ব্যাডমিন্টন চর্চা ও কোচিং চালিয়ে যাচ্ছে তারা। শিলচরের পথপ্রদর্শক ক্লাবের এভাবে সীমিত হয়ে পড়াটা মোটেও ইতিবাচক নয়।

Related Articles

Back to top button
Close