fbpx
কলকাতাখেলাগুরুত্বপূর্ণফুটবলব্লগহেডলাইন

স্পর্ধার ১০০, ঘৃণার আঁধারে আজ মশালের শিখা, লাল হলুদ বিপ্লবের সাক্ষী ইতিহাস

স্বর্ণার্ক ঘোষ: সময়টা ১৯১৯ সালের শেষ দিকে। গান্ধীজীর অসহযোগ আন্দোলন তখনও চলছে। ভারতের প্রথম অহিংস আন্দোলন চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। প্রথম জাতীয়তাবাদের স্বাদ ও স্বাধীনতার চেতনার  আগুন ক্রমেই ছড়িয়ে পড়ছে আসমুদ্রহিমাচল। গর্জে উঠেছে দেশবাসী। কিন্তু সেই আন্দোলনের মাঝে সুর কাটলো চৌরিচৌরা ঘটনা। বিহারে চৌরিচৌরার একটি থানায় আকস্মিক বিদ্রোহীদের অগ্নিসংযোগের ঘটনায় মর্মাহত হলেন গান্ধীজী। মাঝপথেই বন্ধ করে দিলেন দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়া অসহযোগ আন্দোলন। যার ১৯২০ সালের সেই ঘটনায় তৎকালীন ভারতীয় রাজনীতিতে প্রথম আগুনের স্ফুলিঙ্গ জ্বলে উঠলো। ছাইচাপা স্বাধীনতার ক্ষোভ রুপান্তরিত হয়েছিল প্রথম আগুনে। ‌ সেই আগুনে আঁচ কিন্তু স্বাধীনতা সংগ্রামে সীমাবদ্ধ ছিল না, রাজনীতির বাইরে ছড়িয়ে পড়েছিল খেলার ময়দানেও।

সেই তপ্ত আগুনের আঁচে ই ময়দানে জ্বলে উঠল মশাল। ঝড়ঝঞ্জাবৃষ্টি সবের মধ্যে দিয়েও সেই মশালের লাল-হলুদ আগুনের শিখা আজও জ্বলছে একইভাবে। ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে বিপ্লবীদের শপথের সাক্ষী হত আগুন কিংবা জ্বলন্ত মশাল। তেমনই এক শতাব্দী ধরে ভারতীয় ফুটবলের বৈপ্লবিক যাত্রাপথে এক জ্বলন্ত সাক্ষী লাল হলুদ ইস্টবেঙ্গল। ঘৃণা, বৈষম্য বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে লড়াই করে আজকের দিনে গড়ে উঠেছিল ইস্টবেঙ্গল।

১৯২০ সালে আঠাশে জুলাই কোচবিহার কাপের জোড়া বাগানের মুখোমুখি হয় মোহনবাগান। কিন্তু সে সময় শৈলেশ বোস, নাসা সিংকে মোহনবাগান দল থেকে বসিয়ে দেওয়া হয়। যদিও জোড়াবাগান ক্লাব ভাইস প্রেসিডেন্ট সুরেশ চন্দ্র চৌধুরী পরবর্তীতে তাদের দলে ওই দুজনকে নেওয়ার চেষ্টা করলেও কোনো লাভ হয়নি। শ্রবনশক্তিতে সমস্যা তাদের একটি অন্যতম বড় প্রতিবন্ধকতা ছিল। যার জন্য বারবার অবজ্ঞা  অবহেলার মুখে পড়তে হতো তাদের। দু’জনেই ছিলেন পূর্ববঙ্গের বাসিন্দা। পরবর্তীকালে তাদের সঙ্গে পরিচয় হয় সুরেশের। তিনিও ছিলেন পূর্ববঙ্গের লোক। শুরু হলো নতুন উদ্যোগ।‌ নেওয়া হল নতুন ক্লাব গঠনের শপথ।‌

আজকের দিনে অর্থাৎ পহেলা আগস্ট উনিশশো কুড়ি সালে নাশা সিং, শৈলেশ ভুষন রায়, মন্মত নাথ রায় চৌধুরী এবং অরবিন্দ ঘোষ নেতৃত্বে গড়ে উঠলো লাল হলুদ ইস্টবেঙ্গল।

শুরু হলো ময়দানী লড়াই এর যাত্রা।‌ রেড কাপ থেকে গোল্ড ও হারকিউলিস কাপ পরপর জিতে এগিয়ে চলল ইস্টবেঙ্গল। এই লড়াইয়ের প্রথম মাইলস্টোন ইস্টবেঙ্গলের আইএফএ ইন্ডিয়ান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে এসেছিল।  তারপর স্বীকৃতি পেল সন্তোষ ট্রফিতে খেলার। মন্মত নাথ এই  গোটা প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।

১৯২৪ সালে ক্যামেরুনের বি টিমের সঙ্গে সেকেন্ড ডিভিশনের জয়েন্ট চ্যাম্পিয়ন ঘোষিত হয় লাল-হলুদ ব্রিগেড। সেই লীগে আরিয়ানস এবং মোহনবাগানের দাপট কিন্তু যথেষ্ট ছিল। সেই মোহনবাগানী দাপটকে পরাজিত করেও পদক ছিনিয়ে নিয়েছিল ইস্টবেঙ্গল। সে সময় এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনে পরাধীন ভারতীয়দের জন্য মাত্র দুটি স্লট বরাদ্দ ছিল। ক্যামেরুনের সঙ্গে এই যুগ্ম জয়ের ফলে সেই কনফেডারেশনে জায়গা করে নেয় ইস্টবেঙ্গল। যা ভারতীয় ফুটবলের সেই সময়ে ঐতিহাসিক মাইলস্টোন বলা যেতে পারে। তার পরের বছর ময়দানের অন্যতম বড় ক্লাব মোহনবাগানকে ১-০ গোলে হারিয়ে ভারতীয় ফুটবলের নতুন মাত্রা যোগ করে শৈলেন সুসান মন্মথ রায়েদের  স্বপ্নের ক্লাব। ইতিহাসের সেই প্রথম ডার্বিতে হাজির হয়েছিল ৫০ হাজার দর্শক। সেই জয়ের পর ঘুরে আর করে তাকাতে হয়নি লাল-হলুদ শিবিরকে। আকাশ লাল করে জ্বলে উঠলো হলুদ মশাল।

এরপরে প্রায় কুড়ি বছর কেটে যায়। একদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঝংকার অন্যদিকে স্বাধীনতা সংগ্রামে উত্তাল ভারত। এই দুয়ের অস্থিরতার আবহেও ১৯৪২ ও ৪৫এর অফ আই এফ এ শিল্ড চ্যাম্পিয়ন হয় ইস্টবেঙ্গল। প্রাক স্বাধীনতার সেই মুহূর্তে সেই সঙ্গে সঙ্গে ভারতীয় ফুটবল পেয়ে যায় নতুন এক পাওয়ার হাউস।

এরপর স্বাধীন ভারতে ইস্ট বেঙ্গলের হয়ে মাঠে নেমেছেন ভারতীয় ফুটবলের বহু কিংবদন্তি। পিকে বন্দ্যোপাধ্যায়, তুলসীদাস বলরাম থেকে আহমেদ খান। বাইচুং ভুটিয়া থেকে সুদীপ চট্টোপাধ্যায়ের। পিটার থংঘরাজ থেকে হাবিব। সকলেই গায়ে চাপিয়েছেন লাল হলুদ জার্সি। পরবর্তীকালে আমরা দেখতে পাই ব্রাজিলীয় ডগলাস ডি সিলভা, অ্যালভিটোর ডিকুনহা মতো তারকাদের।

সত্তরের দশকে পিকে বন্দোপাধ্যায়দের দাপটে একচেটিয়া ময়দান রাজ করেছে ইস্টবেঙ্গল। ২৯ বার আইএফএ শিল্ড নিজের ঘরে তোলার পাশাপাশি ‌৩৯ বার কলকাতা লিগেও মশাল জ্বালিয়ে ছিল লাল হলুদ শিবির।‌ এছাড়াও ন্যাশনাল ফুটবল লিগ ৩ বার এবং কমপক্ষে ৮ বার ফেডারেশন কাপের খেতাব ছিনিয়ে নিয়েছিল ইস্টবেঙ্গল।‌ শুধুমাত্র দেশেই নয় বিদেশের মাটিতে ২০০৩ সালে আশিয়ান কাপ জিতে এক অসামান্য কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছিল লাল হলুদ শিবির। বিদেশের মাটিতেও গর্বের সঙ্গে মাথা উঁচু করিয়েছিল ভারতীয় ফুটবলের। ‌সেই দলের সাফল্যের অন্যতম কাণ্ডারী ছিলেন কোচ সুভাষ ভৌমিক ও অধিনায়ক বাইচুং ভুটিয়া।

স্বাধীনতার লড়াই থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ইতিহাসের থেকে নানান ঘটনার চড়াই-উতরাইয়ের পর আজ ১০০ বছরে পা রাখল ভারতীয় ফুটবলের ঐতিহ্যশালী এই ফুটবল ক্লাব।

ইতিহাসের মতোই ভবিষ্যতেও নানান ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়েও মাথা উঁচু করে এগিয়ে যাবে ইস্টবেঙ্গল। আকাশের অন্ধকার চিরে জ্বলবে লাল হলুদ মশাল। প্রিয় ক্লাবের শতবর্ষে শুধু এটাই প্রার্থনা আপামর ইস্টবেঙ্গল প্রেমীর।

Related Articles

Back to top button
Close