fbpx
অফবিটপশ্চিমবঙ্গহেডলাইন

প্রতি বছর পাঁচটা রাখি পরি, এবছর দুটো… তিন দিদি বাইরে তাদের কাছে যেতে পারব না

ভাইরাস ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে কাঁটা রাখী উৎসব

অভিষেক আচার্য, কল্যাণী: বয়স ১৩-১৪বছর। বাড়ির ছাদে ঘুড়ি ওড়াচ্ছে একমনে। পাড়ার অলিগলিতে নেই ভিড়। শুনশান। বাড়িগুলির ভিতরেও রয়েছে নিস্তব্ধতা। এমনই চিত্র ধরা পড়ল নদিয়ার রানাঘাটের শরৎপল্লিতে। “রাখি পাড়া” নামেই পরিচিত এই পল্লি।

বাড়ির ছাদ থেকে দেখতে পেয়ে সেই ছোট ছেলেটি জিজ্ঞাসা করে, “কোথায় যাবেন? দাঁড়ান আমি আসছি”। কয়েক মিনিটের মধ্যে হাফ প্যান্ট ও গায়ে জামা পরে সামনে উপস্থিত হল সে। নাম জিজ্ঞাসা না করেই বললাম, “বাবু, এখানে রাখী কার বাড়িতে তৈরি হয়? যেখানে অনেকে মিলে রাখী তৈরি করছে সেখানে নিয়ে যেতে পারবি?” সহজ-সরল উত্তর, “আসুন আমার সঙ্গে”। বেশিদূর হাঁটতে হয়নি। একজনের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে চিৎকার করতে থাকে ছেলেটি, “দাদু, দরজা খোলো লোক এসেছে।” দরজা খুলে বাইরে এলেন পরেশ নন্দী। রাখী ব্যবসায়ী। দুপুরের ভাতঘুম দিচ্ছিলেন দেখেই বোঝা গেল। কেমন আছেন? পরেশবাবু হাই তুলে বললেন, ভালো না। কেন? ঘরে আসুন বুঝতে পারবেন। তিনটি ঘরে ভর্তি রাখী তৈরির সরঞ্জাম। বস্তার পর বস্তা রয়েছে রাখী। বস্তাগুলো এখনও বাড়িতে কেন? পরেশবাবু করুণ সুরে বলেন, ” কে নেবে? লোক কই? অর্ডারই নেই। রাখী তৈরি করার কর্মচারী নেই। কর্মচারীদের টাকা দিতে পারছি না। তাই কয়েক লাখ টাকার মাল তুলে ঘর বোঝাই করে রেখেছি। বস্তায় কিছু রাখী তৈরি করে রেখেছিলাম। সেটাও তো কেউ নিয়ে গেল না।”

আরও পড়ুন:করসেবকদের ওপর গুলি না চালিয়ে গর্ববোধ করছি: কল্যাণ সিং  

ফের ছোট ছেলেটির পিছু নিলাম। এবার পৌঁছালাম মঙ্গল দাসের বাড়ি। কেমন আছেন জিজ্ঞাসা করতেই রেগে উত্তর দিলেন, “না খেতে পেয়ে মরবো, ঋণ নিয়ে এবছর রাখী তৈরি করলাম, একটাও বিক্রি হল না। টাকা শোধ দেব কিভাবে এই ভেবে রাতের ঘুম উড়ে গিয়েছে। সরকারি কোনও সাহায্য নেই। এরপর ও কি বলা যায় ভালো আছি?”
এরপর কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলার পর বুঝলাম, প্রতিবছর এই শরৎপল্লিতে রাখীতে আগের ভিড় লেগে থাকতো ক্রেতাদের। সেই ভিড় সামলাতে হিমশিম খেতেন তাঁরা। মেশিনের আওয়াজ, লোকের কোলাহলে কান পাতা দায় হয়ে উঠতো বাসিন্দাদের। কিন্তু এবছর সেইসব অতীত। ভবিষ্যৎ জানা নেই। বর্তমান পরিস্থিতি দেখে কাঁদছেন রাখী শিল্পীরা। ভাইরাস রাখী শিল্পকেও ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। তা এক কথায় স্বীকার করলেন শিল্পীরা।

এবার সেই ছোট ছেলেটিকে প্রশ্ন করলাম, তুই প্রতিবছর কটা রাখী পড়িস? চটজলদি উত্তর, পাঁচটা। আর এবছর কটা পরবি? উত্তর, দুটো। কেন? বাইরে তিন দিদি থাকে। এবছর তাঁদের কাছে যেতে পারব না। তাই দুটো। বললাম, মন খারাপ? মুখ নিচু করে উত্তর দিল সে, খুব মন খারাপ। না, ছেলেটির নাম জানা হয়নি। শুধু এইটুকু জানলাম, ভাইরাস ভ্রাতৃত্বের বন্ধনেও কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কবে ফিরবে সেই সুদিন। উত্তরের অপেক্ষায় গোটা বিশ্ব।

Related Articles

Back to top button
Close