fbpx
গুরুত্বপূর্ণপশ্চিমবঙ্গহেডলাইন

দু’পাড়ের মেলন্ধনে ইছামতী

ইসলামুল আলম প্রান্ত: উমা মর্ত্যে এসেছিলেন, এবার যাবার পালা। বাসন্তী দেবীর এই অকালবোধন সনাতন ধর্মাবলম্বীদের জন্য বড়ই আনন্দের। সেই যে গেল বছরের দশমীর রাত কাটতে না কাটতেই পরবর্তী বছরের বোধনের প্রতীক্ষাটা শুরু হয়ে যায়, এবারও তার অন্যথা হবে না।  সনাতন ধর্মাবলম্বী ছাড়াও সকল অসাম্প্রদায়িক বাঙালির চেতনায় আর প্রার্থনায় আনন্দময়ীর আগমন যেন আমাদের দিনগত পাপক্ষয়লব্ধ জীবনের সমস্ত হতাশা, বিপন্নতা, শোক ব্যাকুলতাকে ঢেকে দিতেই।  কিন্তু অন্যান্য বছরের মতো এই বছরটা নয়। তবুও উমা এসেছিলেন মর্ত্যে। তাই বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায় এই বিশ্বজোড়া সংকটের মধ্যেও ঘরের মেয়েকে যথাসাধ্য বরণ করে নেওয়ার চেষ্টা করেছে।

অতীত কাল থেকেই দেখা যায়, এদেশে পুজোর প্রারম্ভ  হতে মণ্ডপগুলো যেন সকল ধর্মাবলম্বীদের পদচারণায় কেবল যে অসাম্প্রদায়িকতার এক মূর্ত প্রতীক হয়ে ওঠে তা কিন্তু নয়, বরং সেটি হয়ে ওঠে অবিভক্ত বাংলার একটি ছোট্ট দ্বীপ!

ভৌগোলিক সীমারেখায় বাংলাদেশ-ভারত আলাদা দুটি দেশ। কিন্তু দুর্গাপুজোর আবেগে, কাঁটাতারের বেড়া যেন সে রাশ টানতে পারেনি। শারদ উৎসবের শেষ প্রহরে বিজয়া দশমীর দিন ইছামতীর দু’পাড়ে সেই আদিম কিন্তু চিরসত্য, সুন্দর দৃশ্যটিই আমরা দেখতে পাই। উমার নিরঞ্জন উপলক্ষ্যে ইছামতীর বুকে মিলে যায় দুই বাংলা! জার্তি-ধর্ম-বর্ণ ভুলে গিয়ে দিনভর এখানে জড়ো হয় উভয় বাংলার লাখ লাখ মানুষ। ইছামতী নদী দখল করে রাখে বাংলাদেশ-ভারতের কয়েক হাজার রকমারি নৌকা আর ট্রলার।

সরেজমিনে দেবহাটা উপজেলার সদর, টাউন শ্রীপুর, ভাতশালা, কোমরপুর এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ভারতের পাশে টাকী আর বাংলাদেশের পাশে দেবহাটা । মাঝখান দিয়ে উত্তর-দক্ষিণে বয়ে যাওয়া সীমান্ত  নদী ইছামতী বিভক্ত করেছে দু’দেশকে । সীমান্ত নদী ইছামতীর টাউন শ্রীপুর থেকে ভাতশালা পর্যন্ত কয়েক কিলোমিটার জুড়ে যত দূর চোখ যায় ভেসে বেড়ায় শুধু নৌকা আর নৌকা । কোনও নৌকায় প্রতিমা ও মানুষ । আবার কোনও কোনও নৌকায় শুধুই  মানুষ। টাউন শ্রীপুরে দেবহাটা উপজেলা পরিষদের পক্ষ থেকে বানানো হয় মিলন মেলা উপলক্ষে সুসজ্জিত মঞ্চ। বিপরীত দিকে টাকীতেও একইভাবে মঞ্চ বানানা হয় । দেশ বিভাগের অনেক আগে থেকেই সীমান্ত নদী ইছামতীর উভয় তীরে দুর্গাপুজোর শেষ দিন বিজয়া দশমীতে বসে আসছে এ মিলন মেলা । দেশ বিভাগের পরও বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়নি সীমান্তের এ জলসীমারেখা । নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও এ মেলবন্ধন কখনও বন্ধ হয়নি । সারা বছর ধরে শুধু ইছামতী নদীর পাড়ের  মানুষ নয়, বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন এলাকার মানুষ এ দিনটির জন্যে থাকে অপেক্ষায়। বিজয়া দশমীতে উমার নিরঞ্জন উপলক্ষ্যে ইছামতীর দু’পাড়ে বসে নানারকমের দোকান। এই ভাসানকে কেন্দ্র করে দু’দেশে থাকা আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাতের পর্বটি সেড়ে ফেলেন। এছাড়াও এখানে আসা মানুষজন দুই পাড়ের মেলা হতে কিছু কেনাকেটা করে সন্ধ্যার পরে ফিরে যান যে যার দেশে, যে যার ঘরে।

২০১১ সাল অবধি এইভাবেই মিলেমিশে গেছে দুই বাংলা । কিন্তু ২০১১ সালে প্রশাসনের শিথিলতায় প্রচুর অনুপ্রবেশ ঘটে ভারত সীমান্তে এবং ওই সালেই ইছামতীর ভাসান দেখতে এসে নদীতে নৌকা উল্টে মৃত্যু হয় সুজয় দাস নামে যাদবপুরের এক গবেষকের । অনুপ্রবেশের জেরেই চুরি ডাকাতির ঘটনা বেড়েছিল বলে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র দফতর এবং রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন টাকীর বাসিন্দারা । যার ফলস্বরূপ ২০১২ থেকে সীমান্তে কড়াকড়ি অনেকটাই বেড়ে যায়। এখন উভয় দেশই নিজেদের জল সীমানায় নিজেদের পতাকাবাহী স্পিডবোটে টহল দেয়।

প্রতিবছর পুজোর আগে বাংলাদেশের পক্ষ হতে দেবহাটা উপজেলার চেয়ারম্যান আর ভারতের পক্ষ হতে টাকি পৌরসভার মেয়র একটি বিশেষ আন্তঃদেশীয় বৈঠকের মাধ্যমে এ মেলবন্ধনের যাবতীয় নীতিমালা নির্ধারণ করে থাকেন । তবে এবার করোনা মহামারীর জন্য হয়তো এমন জাঁকজমক পূর্ণ মেলবন্ধনের সুযোগ প্রশাসন নাও দিতে পারেন।

করোনা মহামারীর জন্য দেবহাটা উপজেলায় একুশটি পূজামণ্ডপের বাইরে নতুন করে কোনও পূজামণ্ডপের অনুমোদন দেওয়া হয়নি। যেগুলোর অধিকাংশ প্রতিমা এই ইছামতী নদীতেই বিসর্জন দেওয়া হবে। সেই সঙ্গে এসব পূজামণ্ডপে যেন সামাজিক দুরত্ব এবং সাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে মেনে চলা হয় সে জন্য স্থানীয় প্রশাসন পুজোমণ্ডপগুলোকে নজরদারিতে রাখবেন বলে জানা গেছে। বছরের পর বছর ধরে দেবী দুর্গার বিসর্জন উপলক্ষ্যে যে অসাম্প্রদায়িক রীতিনীতিটির চর্চা ইছামতীকে ঘিরে চলে আসছে, সেটি যে কেবল ধর্মীয় কারণে তা কিন্তু নয়  বরং এ মিলন মেলাটি এখন এই দুই এলাকার মানুষের সংস্কৃতি, দুই দেশের ঐতিহ্যের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে এবছর এ মিলন মেলা না হয়, না হোক। আসছে বছর আবার তো দেখা হবে।

সেই সুদিনের আশায় এবারের ইছামতী পাড়ের বিজয়া দশমীতে সামাজিক দূরত্ব আর সাস্থ্যবিধি মেনে দেবী দুর্গার নিরঞ্জন হোক এক অনন্য দৃষ্টান্ত ।

 

Related Articles

Back to top button
Close