fbpx
ব্লগহেডলাইন

মানুষ খুনের জন্য হাতির ফাঁসি হলে, হাতি খুনের জন্য মানুষের ফাঁসি হবে না কেন?

ভাস্করব্রত পতি, তমলুক : একটু খাবার চাওয়ায় কেরলের মাল্লাপুরম ও কোল্লাম জেলায় হাতিকে মারা হোলো বোম ভরা আনারস খাইয়ে। নৃশংস এই ঘটনায় আজ সারা ভারত জুড়ে প্রতিবাদের সুর। না, অপরাধীদের কোনো সাজা জোটেনি এখনও। আদৌ মিলবে কিনা কেউ জানেনা। অথচ আজ থেকে প্রায় ১০৫ বছর আগে সার্কাসের মঞ্চে এক অত্যাচারী মাহুতকে থেঁতলে ফেলার অপরাধে জনগনের প্রবল দাবির ভিত্তিতে পরের দিনই জনসমক্ষে ফাঁসিতে লটকে দেওয়া হয়েছিল সেই হাতিকে। আজ তাই দাবি কি সমিচীন নয় যে, মানুষ খুনের জন্য হাতির ফাঁসি হলে, হাতি খুনের জন্য মানুষের ফাঁসি হবে না কেন?

আজও সেদিনের সেই অমানবিক ঘটনা বুকে নিয়ে অনুতাপের আগুনে জ্বলছে আমেরিকার অঙ্গরাজ্য টেনেসির আরউইন শহরের মানুষজন। তাঁদের পূর্বপুরুষদের ‘মহান কীর্তি’তে এখনও লজ্জায় কুঁকড়ে যায় হৃদয়। এক অবলার প্রতি অমানবিক দৃষ্টান্ত ফের যেন চাগিয়ে উঠলো কেরলের ‘সাইলেন্ট ভ্যালি’র প্রসূতি গজরাজের হত্যার কাহিনীতে।

টেনেসি শহরের বর্তমান লোকসংখ্যা ৬০৯৭ ( ২০১০ সেনসাস)। একে মূলতঃ Tri cities Region বলে। ১৭৮০ থেকে বসবাস চালু হলেও ১৮৭৬ এ স্থাপিত হয়। ১৮৭৯ এর ৫ ই ডিসেম্বর ডেভিড জে এন আরভিনের নামে নামকরণ হয় ‘আরউইন’। সেই শহরের নাম ছড়িয়ে পড়ে ১৯১৬ তে, এক হাতিকে ফাঁসিতে লটকানোর জন্য। সেদিন টেনেসি রেল ইয়ার্ডে ৫০০০ মানুষ তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করেছিলো বিশ্বের সেই বিরলতম দৃশ্য। বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কেঁদেছিলো আরউইন শহরে।

এশীয় প্রজাতির সেই হাতিটার নাম ছিলো ‘মেরি’। তাঁর মালিক ছিলো চার্লি স্পার্কস। বংশ পরম্পরায় তাঁরা সার্কাসের শিল্পী ছিলেন। উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে মাত্র ৮ বছর বয়স থেকেই সার্কাসে হাতেখড়ি চার্লির। সে সময় চার্লির বাবা কিনে আনেন চার বছর বয়সী ছোট্ট একটা হাতি। আদর করে নাম রাখেন ‘মেরি’।

ধীরে ধীরে চার্লির সঙ্গে মেরির বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। এভাবেই চলছিলো দিনের পর দিন। দুজনেই বড় হয়ে উঠলো। এবার চার্লি নতুন একটা সার্কাসের দল গড়লেন। নাম দিলেন ‘স্পার্কস ওয়ার্ল্ড ফেমাস শো’। সেই সার্কাস দলের মুখ্য আকর্ষণ হয়ে উঠলো মেরি। আস্তে আস্তে মেরি হোলো ‘বিগ মেরি’।

চার্লি ও তাঁর স্ত্রী অ্যাডি মিচেল খুব ভালোবাসতেন মেরিকে। কেননা, তাঁদের নিজস্ব কোনো সন্তান ছিলনা। নিঃসন্তান এই দম্পতির কাছে মেরি ছিলো সন্তানতুল্য। মেরিকে দেখাশোনার জন্য একজন মাহুত থাকলেও মূলতঃ চার্লিই ছিলো মেরির গডফাদার! চার্লির কথা শুনতো অক্ষরে অক্ষরে।

সার্কাসে মেরির নানা কাণ্ডকারখানা খুব জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। চারিদিকে ছড়াতে থাকে মেরির কাহিনী। প্রচার ও প্রসার বাড়তে থাকে চার্লির সার্কাস দলের। আমেরিকার বিভিন্ন স্থানে দর্শকদের কাছে ক্রমশঃ জনপ্রিয় হয়ে উঠতে থাকে চার্লির মেরি। ইতিমধ্যেই পূর্ব টেনেসি শহরের কিংস্পোর্টে ডাক পড়ে সার্কাসের শো করার জন্য। এই শহরটি ভার্জিনিয়ার সীমান্তবর্তী এলাকা। কিন্তু ইতিমধ্যেই মেরির দেখাশোনা করা মাহুত ঐ সার্কাস ছেড়ে চলে যায়। এদিকে পূর্ব টেনেসিতে পৌঁছে যায় গোটা সার্কাসের দল। সেখানকার সেন্ট পলস এলাকায় তাঁবু খাটানো হয় সার্কাসের শো করার জন্য।

এদিকে সেখানকার একটি হোটেলের কর্মচারী ওয়াল্টার রেড এলড্রিচের ইচ্ছে হোলো ঐ মেরির মাহুত হওয়ার। নেহাতই খেয়াল আর কি! তখন সার্কাসের ট্রেনার পর জ্যাকব বিষয়টি চার্লির গোচরে আনলেন। এলড্রিচ নাছোড়। সে মেরির মাহুত হবেই। এদিকে মেরির নিজস্ব কোনো মাহুত নেই সে সময়। এলড্রিচের আগ্রহ এবং ইচ্ছে দেখে চার্লি তাঁকে মেরির মাহুত হিসেবে নিয়োগ করলেন। শিখিয়ে দেওয়া হোলো হাতি দেখভালের যাবতীয় নিয়মকানুন এবং পদ্ধতি। কিন্তু আসলে এই ঘটনাই কাল হয়ে এলো চার্লির সার্কাস দলে। বিরলতম ঘটনার সাক্ষী হতে হোলো মেরিকে!

পূর্ব টেনেসিতে শুরু হবে ‘স্পার্কস ওয়ার্ল্ড ফেমাস শো’র নতুন শো। সেদিনটা ছিলো ১৯১৬ র ১২ ই সেপ্টেম্বর। নতুন মাহুত এলড্রিচকে মন থেকে তখনও মানতে পারেনি মেরি। তাই প্রথম থেকেই একটু অন্যমনস্ক ছিলো সে। সার্কাসের রিংয়ে তাঁর তেমন খেলা দেখানোয় মন ছিলনা। হয়তো পুরোনো মাহুতের কথা ভুলতে পারছিলোনা সে। ফলে এলড্রিচের নির্দেশ পালন করতে বয়েই গিয়েছে তাঁর।

কিছুক্ষন পর এলড্রিচ রেগে মেরির মাথায় রডের খোঁচা মেরে তাঁকে ঢিঁট করতে চাইলো। যাতে সে ভালোভাবে তাঁর কসরতগুলো দেখায়। সার্কাস তাঁবুতে তখন প্রচুর দর্শক। সবাই তখন মেরির ফ্যান। মেরির খেলা দেখতে উন্মুখ। আর তখনই ঘটলো বিশদৃশ ঘটনাটা। এলড্রিচের রডের খোঁচা খেয়ে মেরি গেল বিগড়ে। রেগে অগ্নিশর্মা মেরি শুঁড় দিয়ে পেঁচিয়ে এলড্রিচকে তুলে আছাড় মারলো মেঝেতে। থেঁতলে দিলো মাথাটা। সেখানেই মৃত্যু হয়েছিল এলড্রিচের। এক দর্শক পিস্তল থেকে মেরিকে গুলি ছুঁড়লো। লাগলো না।

এই দৃশ্য দেখে সার্কাস থেকে সবাই ছুটে পালালো তৎক্ষণাৎ। ভয়ে ভীত লোকজন। সকলের সমবেত চিৎকার ‘ Kill the Elephant’। আঁধার ঘনিয়ে এলো মেরির জীবনে। তেমনি বিপদের মুখে ‘স্পার্কস ওয়ার্ল্ড ফেমাস শো’। চারিদিকে হত্যাকারি হাতির খবর ছড়িয়ে পড়লো দাবানলের মতো। খবরের কাগজেও লেখা হোলো। এই হাতি নাকি পাগল! এঁর মৃত্যুদণ্ড চাই। এদিকে চার্লি কিছুতেই বোঝাতে পারলোনা যে হাতির দোষ নয়। নতুন মাহুত এলড্রিচের দোষে এই কাণ্ড! কিন্তু কে শোনে কার কথা !

পরের দিন ১৩ ই সেপ্টেম্বর। চলে এলো একশো টনের বিশাল ডেরেক ইণ্ডাস্ট্রিয়াল ক্রেন। চোখের জলে সন্তানসম মেরিকে টেনেসি রেল ইয়ার্ডের বধ্যভূমিতে পাঠিয়ে দিলেন চার্লি। সন্তান বিয়োগের যন্ত্রনা তাঁর বুকে। এদিকে বিশাল চেন দিয়ে ঝোলানো হলো পাঁচ টনের মেরিকে। প্রায় ১৫ ফুট উঁচুতে তোলা হলো মাটি থেকে। কিন্তু চেন ছিঁড়ে পড়ে যায় মেরি। ভাঙলো দেহের হাড়গোড়, রক্তারক্তি অবস্থা। তবুও জনতার দাবি ‘মেরির ফাঁসি চাই’! আবারও ঝোলানো হোলো মেরিকে। জনসম্মুখে সেই ভয়ঙ্করতম দৃশ্য সবাই দেখলো তারিয়ে তারিয়ে।

নাট্যকার জর্জ ব্র্যান্ট এই হত্যা নিয়ে লিখেছিলেন ‘Elephant’s Graveyard’। এজন্য তিনি পেয়েছিলেন 2008 Keene Prize। সেই ঘটনার ১০০ বছর পরে শহরের বাসিন্দারা নিজেদের পূর্বপুরুষদের অমানবিক কাজের ক্ষত সারাতে হাতি সংরক্ষণে উদ্যোগী হয়েছিলেন। বিশ্বের ন্যাক্কারজনক ঘটনার জন্য কুখ্যাত হয়ে থাকুক আরউইন, এটা চায়না এখানকার বর্তমান প্রজন্ম। হয়তো এমনও একদিন আসবে, যেদিন মাল্লাপুরম বা কোল্লামের উত্তরপুরুষরাও উদ্যোগ নেবে তাঁদের পূর্বপুরুষদের অমানবিক কাজের প্রতিবাদে মুখর হতে। কিন্তু তখন কি টিকে থাকবে ভারতীয় হাতিগুলি ?

আসলে ডব্লিউ ডব্লিউ এফ এর মতে, ভারতীয় হাতি অনেক এলাকায় পাওয়া গেলেও এটি একটি বিপন্ন প্রজাতির মধ্যে পড়ে। বর্তমানে ভারতে প্রায় ২৫,০০০ এই প্রজাতির হাতি থাকলেও এশিয়ান এলিফ্যান্ট স্পেশালিস্ট গ্রুপ ১৯৯৬ সালেই এই ভারতীয় হাতিকে বিপন্ন প্রজাতি ঘোষণা করেছিল। বাংলাদেশের ২০১২ সালের ‘বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা’ আইনের  তফসিল-১ অনুযায়ী এ প্রজাতিটি সংরক্ষিত। যদি হাতি বাঁচাতেই হয়, তবে এখন থেকেই উদ্যোগ নিতে হবে। হাতির বাসস্থানে মানুষের অবৈধ প্রবেশ রোধ করতে হবে। তাহলে আর ‘সাইলেন্ট ভ্যালি’র প্রাণীদের মানুষের হাতে পড়ে চিরদিনের জন্য ‘সাইলেন্ট’ হতে হবে না!

Related Articles

Back to top button
Close