fbpx
আন্তর্জাতিকগুরুত্বপূর্ণদেশব্লগহেডলাইন

ইমরানের বোকামিতে ফের ভেঙে পড়বে পাকিস্তান

রবীন্দ্র কিশোর সিনহা: মনে হচ্ছে অন্য কোথাও থেকে উৎসাহ পেয়েছেন ইমরান খান। যখন তাঁর সরকার পাকিস্তানের একটি নতুন মানচিত্রপ্রকাশ করে গুজরাটের জুনাগড় এবং স্যার ক্রিক লাইনকেও পাকিস্তানের অংশ হিসেবে বর্ণনা করেছে। নিজেকে তিনি বারবার বোকা প্রমাণিত করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে।তিনি নিজেকে ইতিহাসের ছাত্র বলেন, কিন্তু মনে হচ্ছে ইতিহাসের মূল্যবোধ সম্পর্কে তিনি মোটেও অবগত নন। আশ্চর্যের বিষয় হল, তিনি এটুকুও জানেন যে, ১৯৪৮ সালে জুনাগড়ে জনমত সংগ্রহও হয়েছিল। সেখানকার ৯৯.৯৫ শতাংশ মানুষ ভারতের সঙ্গে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

এগিয়ে যাওয়ার প্রাক্কালে জেনে রাখা দরকার, জুনাগড় আসলে কী? জুনাগড় গুজরাটের গিরনার পর্বতের অদূরে অবস্থিত। এখানে প্রাক-হরপ্পা যুগের স্থলের খননও হয়েছিল। নবম শতাব্দীতে এই শহরের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। গিরনার যাওয়ার পথে গাঢ় রঙের পাথর রয়েছে, সেখান তিনটি রাজবংশের প্রতিনিধিত্বমূলক শিলাখন্ড খোদাই করা রয়েছে। মৌর্য শাসক অশোক (২৬০-২৩৮৮ খ্রিস্টপূর্ব), রুদ্রদমন (১৫০ খ্রিস্টাব্দ) এবং স্কন্দগুপ্ত (৪৫৫-৪৬৭)। এখানে ১০০-৭০০ খ্রিস্টাব্দে বৌদ্ধদের দ্বারা নির্মিত গুহা-সহ একটি স্তুপও রয়েছে।

জুনাগড় শহরের সন্নিকটে অবস্থিত কিছু মন্দির ও মসজিদও দীর্ঘ ও জটিল ইতিহাস উদঘাটিত করে। এখানে খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীর বৌদ্ধ গুহা, পাথরে খোদাই করা সম্রাট অশোকের আদেশপত্র এবং গিরনার পাহাড়ের চূড়ায় কোথাও কোথাও জৈন মন্দির রয়েছে। পঞ্চদশ শতাব্দী পর্যন্ত রাজপুত্রদের দুর্গ ছিল জুনাগড়। কিন্তু, ১৪৭২ সালে গুজরাটের মেহমুদ বেগড়া দখল করে নিয়েছিলেন, যিনি নাম দিয়েছিলেন মুস্তাফাবাদ এবং একটি মসজিদ তৈরি করেছিলেন, যা বর্তমানে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।

আরও পড়ুন:২০২১-এ ক্ষমতায় এলে বিজেপি সরকারের প্রথম কাজ উত্তরবঙ্গে এইমস হাসপাতাল নির্মাণ: দিলীপ ঘোষ

জুনাগড় ও ভুট্টো বংশ

সর্বশেষ ইতিহাসের দিকে ফিরে আসা যাক। পাকিস্তানের দু’জন প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলি ভুট্টো এবং বেনজির ভুট্টোর সঙ্গে জুনাগড়ের সম্পর্ক রয়েছে। ভুট্টোর পিতা স্যার শাহনওয়াজ ভুট্টো দেশভাগের প্রাক্কালে জুনাগড় রাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তিনি গুজরাটের নবাব মুহম্মদ মহাবত খানজির ঘনিষ্ঠ ছিলেন। জুলফিকার আলি আহমেদ ভুট্টোর মা হিন্দু ছিলেন। বিয়ের আগে তাঁর নাম ছিল লক্ষ্মীবাই। পরে হয়ে গিয়েছিল খুরশিদ বেগম। প্রতিষ্ঠিত রাজপুত পরিবারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল। বিয়ের আগেই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন তিনি। অনেকেই বলেন, শাহনওয়াজ এবং লক্ষ্মীবাইয়ের মধ্যে সর্বপ্রথম দেখা হয়েছিল জুনাগড়ের নবাবের দুর্গে। ভুজ থেকে সেখানে এসেছিলেন লক্ষ্মীবাই। ১৯৪৭ সালের ৩০ মে থেকে ১৯৪৭ সালের ৮ নভেম্বর পর্যন্ত শাহনওয়াজ জুনাগড়ের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। লক্ষ্মীবাইয়ের বাবা জয়রাজ সিং জাদেজা রাজকোটের পেনেলি গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। এবার নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন জুনাগড় কীভাবে ভুট্টোর বংশের সঙ্গে সম্পর্কিত।

আসলে দেশভাগের পর, জুনাগড়ের নবাব মুহম্মদ মহাবত খানজিকে ভারত সরকার বারবার ভারত সঙ্ঘের অংশ হিসেবে থেকে যাওয়ার কথা বলেছিল। কিন্তু, তিনি নিজ সিদ্ধান্তে অনড় ছিলেন। ভারত সরকারকে তিনি হুমকি পর্যন্ত দিয়েছিলেন। বলে দেওয়া যাক, জুনাগড়ের তিন-দিকের সীমারেখা ভারতের সঙ্গে যুক্ত এবং চতুর্থ-দিক সমুদ্র। তা সত্ত্বেও জুনাগড়ের নবাব চেয়েছিলেন সমুদ্রপথে পাকিস্তানের সঙ্গে মিশে যাক জুনাগড়।

মহম্মদ আলি জিন্নাহ সম্মতিও দিয়েছিলেন এবং ১৯৪৭ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর একীভূত হওয়ার চিঠিতে জুনাগড়ের সম্বন্ধে হস্তাক্ষর হয়েছিল। ভারত সরকারের সচিব বি পি মেনন নবাবকে তাঁর সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের জন্য বলেছিলেন, যাতে পাকিস্তানের সঙ্গে হওয়া চুক্তি বাতিল হয়। নবাব তা মানেননি। এরপর ভারত জুনাগড়ের সঙ্গে সমস্ত সীমানা বন্ধ করে দিয়েছিল। পণ্য পরিবহন, ডাক সামগ্রীর চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে দেখে, নবাব ও তাঁর পরিবার জুনাগড় ছেড়ে দেন এবং ১৯৪৭ সালের ২৫ অক্টোবর সমুদ্রপথে করাচিতে পালিয়ে যান। তখন জুনাগড়ের মুখ্যমন্ত্রী ভুট্টো, যিনি জুলফিকার আলি ভুট্টোর বাবা এবং বেনজির ভুট্টোর দাদু ছিলেন, তিনি পাকিস্তানের চলে যাওয়া নবাবকে চিঠি লিখেছিলেন। জবাবি টেলিগ্রামে, ভুট্টোকে নবাব এই অধিকার দিয়েছিলেন, যে মুসলিমদের স্বার্থে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন তিনি। ভুট্টো তখন ভারত সরকারের সঙ্গে পরামর্শ করার সিদ্ধান্ত নেন।

আরও পড়ুন:স্বাধীনতা দিবসে রাজ্যের ৭ পুলিশ আধিকারিককে পুরস্কৃত করবে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক

ভারতের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ জুনাগড়

শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, জুনাগড়ের নাগরিকদের স্বার্থে নিজ হাতেই ক্ষমতা রাখবে ভারত। তাই ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে জনমত সংগ্রহের আয়োজন করা হয়েছিল। সেই জনমত সংগ্রহতে ৯৯ শতাংশের বেশি মানুষ ভারতে থাকার পক্ষে নিজেদের মত দিয়েছিলেন। এরপরই জুনাগড় পুরোপুরি ভারতের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসেবে পরিণত হয়েছিল। কথিত আছে, জুনাগড়ের নবাবের শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানে গিয়ে বসবাস করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছিল। এরপর ভারত এবং জুনাগড়কে স্মরণ করতে করতেই পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। এটাই জুনাগড়ের শেষ ইতিহাস। অর্থাৎ জুনাগড় ভারতের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। এখন আচমকাই ইমরান খান বোকার মতো বলছেন, জুনাগড় পাকিস্তানের।

তাহলে ফের ভেঙে পড়বে পাকিস্তান

কথায় আছে, যাঁরা কাচের ঘরে থাকেন, তাঁরা অন্যের ঘরে পাথর নিক্ষেপ করেন না। জম্মু ও কাশ্মীর, লেহ-লাদাখ এবং গুজরাটের জুনাগড় ও স্যার ক্রিক লাইনকে পাকিস্তানের অঙ্গ হিসেবে বর্ননা করেছেন ইমরান খান। ভালো হবে উনি যদি আগে বালুচিস্তানকে নিজেদের দেশ থেকে পৃথক হওয়া থেকে রক্ষা করেন। সেখানে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন চলছে। ইমরান খান সমস্ত বিষয়ে অবগত। বিগত কয়েক বছর ধরে চলা আন্দোলন এখন নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে উঠেছে। আন্দোলনের সূত্রপাত-স্থানীয় জনগণের অভিযোগ, সেখানে চিন যে বিনিয়োগ করছে সেই বিনিয়োগের আসল উদ্দেশ্য হল চিনকে উপকৃত করা। বালুচিস্তানে নিষিদ্ধ সংগঠন হুমকি দিয়েছে, চিন-সহ অন্যান্য দেশ যেন তাঁদের অর্থ অপচয় না করে, বালুচিস্তানের প্রাকৃতিক সম্পদ লুটতে দেওয়া হবে না অন্যান্য দেশকে। বালুচিস্তানে কাজ করা চিনা ইঞ্জিনিয়ারদের উপর হামলা চালাচ্ছে ওই সংগঠন।

আরও পড়ুন:রেকর্ড ভেঙে দেশ একদিনে করোনার কবলে ৬৭ হাজার, ২৪ ঘণ্টায় বাড়ল করোনা পরীক্ষার সংখ্যা

বালুচিস্তানে জনগণের মতে, ১৯৭১ সালে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেভাবে বাংলাদেশ তৈরি হয়েছিল, সেভাবেই বালুচিস্তান পৃথক দেশে উন্নীত হবে। যেনতেন প্রকারেণ পাকিস্তান থেকে আলাদা হতে চাইছে বালুচিস্তানের জনগণ। পাকিস্তানের পশ্চিমী প্রদেশ হল বালুচিস্তান, রাজধানী কোয়েটা। প্রতিবেশী দেশ হল ইরান ও আফগানিস্তান। ১৯৪৪ সালে বালুচিস্তানকে স্বাধীনতা দেওয়ার জন্য বাতাবরণ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু, ১৯৪৭ সালে জোরপূর্বক বালুচিস্তানকে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। তখন থেকেই বালুচিস্তানে জনগন আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন, একইভাবে পাক সেনা ও বালুচ সরকার মানুষের উপর নিপীড়ন চালাচ্ছে। মনে হচ্ছে, ভারতের কিছু অংশ নিজেদের দখলে নিতে গিয়ে নিজেদের দেশকেই ভেঙে ফেলবেন ইমরান খান।

(মতামত নিজস্ব)

Related Articles

Back to top button
Close