fbpx
পশ্চিমবঙ্গহেডলাইন

অবৈধ সম্পর্ক জেনে যাওয়ায় গলার নলি কেটে খুন শাশুড়িকে! দাসপুরের বৃদ্ধা খুনের রহস্যের কিনারা করল পুলিশ

তারক হরি, পশ্চিম মেদিনীপুর : তিন তলা পাকা বাড়ি, প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। পরিবারে মাত্র ৪ জনের সংসার। সেই বাড়িটির অবস্থান আবার হাট খোলা বাজারের একদম ওপরেই, ওখান থেকে থানা মেরে কেটে ৭০০ মিটার মাত্র । এমন বাড়ির মধ্যেই নিজের শোবার ঘরের মেঝেতে গলার নলি কাটা অবস্থায় পড়ে রয়েছেন ৫৯ বছরের বয়স্কা গিন্নি।

পুত্রবধূ রান্না ঘরে রান্না করছেন, পরিবারের কর্তা বাড়ির অদুরেই মন্দিরে কুলদেবতার পূজা করছেন আর একমাত্র পুত্র বেসরকারি অফিসে কাজে গিয়েছেন। বেলা আনুমানিক দেড়টা! শুক্রবার পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার দাসপুর থানার দাসপুর বাজারেই শ্যামসুন্দরপুর এলাকার ঘটনাকে ঘিরে রহস্য ঘনীভূত হয়েছে।

খুনের মোটিভ, খুনি চিহ্নিত করা তো দূরের কথা ঘটনার কুল কিনারা করতে রীতিমত হিমশিম হতে হয়েছে পুলিশ কর্তাদের। পুলিশ জানিয়েছে মৃতা বৃদ্ধার নাম মৌসুমী গোস্বামীর বয়স ৫৯, স্বামী নিমাই গোস্বামী স্নানান্তে কুলদেবতার পুজো সেরে গিয়েছিলেন স্ত্রীকে ডাকতে। স্ত্রী তখন নিচের তলায় নিজের শোবার ঘরে ছিলেন। গিয়েই দেখেন রক্তাপ্লুত অবস্থায় পড়ে আছেন স্ত্রী। সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার করে ডাকেন পুত্রবধূ সুস্মিতাকে।

সুস্মিতা তখন রান্না করছিলেন। ছুটে আসেন সুস্মিতা। এরপরই নিমাই ফোন করেন পুত্র শুভজিৎকে। বেসরকারি সংস্থার কর্মী শুভজিৎ ফোন পেয়ে ছুটে আসেন। এরপরই শুভজিৎ ফোন করেন পুলিশকে। মৃতদেহ উদ্ধারের পাশাপাশি চলে তল্লাশি কিন্তু মেলেনি কোনোও সূত্র। বাড়ি থেকে কোনোও জিনিস খোয়া যায়নি বা চুরি বা লুটপাটের কোনও চিহ্ন আপাত ভাবে নজরে পড়েনি। তবে সামান্য ধস্তাধস্তির চিহ্ন রয়েছে। খাট থেকে মেঝেতে পড়ে বালিশ।

গোটা ঘটনার তদন্ত শুরু করেন দাসপুরের ভারপ্রাপ্ত পুলিশ আধিকারিক সুদীপ ঘোষাল এবং নেতৃত্বে ছিলেন ঘাটালের এসডিপিও অগ্নিশ্বর চৌধুরী। টানা ১০ ঘন্টা জেরার পর পুলিশ উন্মোচন করল দাসপুরের শ্যামসুন্দরপুরের বৃদ্ধা খুনের রহস্যে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে পুত্রবধূ সুস্মিতা ও পুরোহিত গোরাচাঁদ মুখোপাধ্যায়কে পুলিশ আধিকারিক জানান, “প্রথমত পরিবারের সদস্য ছাড়া আর কে এই খুনে যুক্ত থাকতে পারে এ নিয়ে প্রথম থেকেই একটা ধন্দেই ছিল পুলিশ। দ্বিতীয়ত, বাড়ির ভেতরে অপরিচিত মানুষ দেখলে সাধারন ভাবে চিৎকার চেঁচামেচি হয়ে থাকে কিন্তু এক্ষেত্রে কোনও আওয়াজ হয়নি। এবং লুটপাটের কোনো চেষ্টাও হয়নি বা লুটপাটের কোন মোটিভও ছিলনা।

বাড়িতে শ্বশুর ও পুত্রবধূ এই দুজনে মিলে খুনটা করতেই পারে কিন্তু এক্ষেত্রে ২ জনের কমন ইন্টারেস্ট বা সাধারন স্বার্থ কী? গোড়া থেকেই একটা বিষয় পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছিল যে পরিবারের কেউ ঘটনায় জড়িত কিন্তু বাইরের লোকের সহায়তা ছাড়া এই কাজটি সম্ভব নয়। প্রশ্ন হচ্ছে পরিবারের সেই ব্যক্তি কে? এবং খুনের পেছনে তার মোটিভ কী? এই কারনেই আমরা বৃদ্ধার ছেলে, ছেলের বউ এবং স্বামীকে টানা জেরা করতে থাকি।

এই টানা জেরায় তিনজনের মুখ থেকে একটাই সাধারন বিষয় বেরিয়ে আসে তা’হল পুত্রবধূ ও শাশুড়ির সম্পর্ক ইদানিং ভাল যাচ্ছিল না। যদিও ঘটনাটি কিছু অস্বাভাবিক নয়, শাশুড়ি আর পুত্রবধূর সম্পর্ক অনেক ক্ষেত্রই খারাপ থাকে কিন্তু তার জন্য সাধারণ ভাবে পরস্পর পরস্পরকে খুন করেনা। তাহলে? তাহলের উত্তরটা মেলে ওই ‘ইদানিং’ শব্দটার মধ্যেই। ইদানিং কেন সম্পর্ক খারাপ হল তারই দীর্ঘ জেরায় উঠে আসে বাড়ির পুরোহিতের সঙ্গে পুত্রবধূর প্রেম কাহিনী এবং তারও চেয়ে বেশি কিছু যা দেখে ফেলেছিলেন শাশুড়ি!! এখনও অবধি যেটুকু জানা গেছে।”

আর সেই প্রেমের পথে কাঁটা সরানোর জন্যই ছক কষে ছিলেন শাশুড়িকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার। শুক্রবার দুপুর বেলা দেড়টা নাগাদ সেই হিংসার বলি হলেন ৫৯ বছরের বৃদ্ধা মৌসুমী। প্রায় ৯ ঘন্টার জেরায় শেষ অবধি ভেঙে পড়েন পুত্রবধূ জেরায় স্বীকার করেছেন ঘটনার দিন পরিবারের কর্তা নিমাই গোস্বামী যখন কুলদেবতার পুজো করতে স্নান সেরে মন্দিরে গিয়েছিলেন তখন স্নান সেরে কাপড় বদলাতে নিজের ঘরে ঢুকেছিলেন বৃদ্ধা মৌসুমী। এই সময়েই ঘরে ঢুকে পড়েন প্রেমিক পুরোহিত গোরাচাঁদ।

পরিকল্পনা মতো সুস্মিতাও রান্না ঘর থেকে ঢুকে পড়ে শাশুড়ির ঘরে। মৌসুমী দেবী তখনও শাড়ি পরার সুযোগ পাননি। সেই অবস্থাতেই দুজনে মিলে জাপটে ধরে বৃদ্ধাকে, তিনি হতবাক হয়ে নিজের সম্ভ্রম বাঁচাতে বুকের কাছে টেনে নিয়েছিলেন সায়াটি যা মৃত্যুর পরেও সেই রকমই হাতে ধরা অবস্থায় ছিল। মাটিতে পড়ে যান বৃদ্ধা।

এরপর সুস্মিতা বালিশ দিয়ে মুখ চেপে ধরেন বৃদ্ধার। এরপর জ্ঞান হারান বৃদ্ধা। তারপরই গোরাচাঁদ ধারালো ছুরির সাহায্যে গলার নলি কেটে ফেলে বৃদ্ধার। এরপর পুত্রবধূ সুস্মিতা রান্নার কাজে চলে যান, আর পুরোহিত সুযোগ বুঝে বেরিয়ে যান বাড়ি থেকে।”

ঘটনার দিনই রাতেই তুলে আনা হয় পুরোহিত গোরাচাঁদকে। খুনে ব্যবহৃত অস্ত্রটি বাড়ির সোকপিটে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল যা পুলিশ শনিবার সকালে উদ্ধার করেছে। অভিযুক্তকে আদালতে হাজিরা পেশ করার তোড় চলছে। প্রায় ১০ ঘণ্টার মধ্যেই দাসপুরের বৃদ্ধা খুন রহস্যের কিনারা করতে পারলো পুলিশ।

Related Articles

Back to top button
Close