fbpx
দেশবিনোদনহেডলাইন

সংগীতের রসরাজ যশরাজ স্মরণে

অরিজিৎ মৈত্র: চলতি বছরে পথ চলায় দেখতে পাচ্ছি নানা বাধা বিঘ্ন। বর্তমান সময়টি বড়ই অদ্ভুত। প্রতিনিয়ত ভয়, আশঙ্কা, মৃত্যু আর বিচ্ছেদ। আমাদের ছেড়ে চলে যাচ্ছেন আপনজনেরা। পাশাপাশি একই সঙ্গে বিদায় নিচ্ছেন অখ্যাত আর প্রখ্যাত প্রিয়জনেরা। শিল্প, সাহিত্য, চলচ্চিত্র আর ক্রীড়াজগতের গুণী মানুষেরাও এক অর্থে প্রিয়জন। যাওয়ার তালিকায় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরাও আছেন।

বছরের শুরু থেকে ধারাবহিক সেই সব প্রস্থানগুলো দেখে, মনে গুনগুনিয়ে উঠছে লাল মাটির সুর, ‘সাধের খাঁচা পড়ে রবে তোর একা, একদিন পাখি পালিযে যাবে।’ মহাপ্রস্থানের পথে চলে যাওয়া গুণী সব জ্যোতিষ্কদের মধ্যে অন্যতম সংগীত মার্ত্যণ্ড, পদ্মবিভূষণ পণ্ডিত যশরাজ। তাঁর জীবনাবসান সমগ্র পৃথিবীর মার্গসংগীত জগতে প্রকৃত ইন্দ্রপতন। পরিণত বয়সে গেলেও তাঁর যাওয়া তো নয় যাওয়া। কারণ এখনও সুরের মানুষদের হৃদয়ে তাঁর বাস। সেকি কখনও শূন্য হয়? প্রাণের পাখি উড়ে গেলেও আকাশে, বাতাসে, বিশ্বপ্রকৃতিতে কান পাতলে শোনা যাবে সেই সুমিষ্ট কলতান। নক্ষত্রখচিত মহাকাশে আজ হয়তো শিল্পীর অবস্থান কিন্তু তাঁর সুরের মূর্চ্ছনা থেকে আমরা বঞ্চিত নই।

SPIC MACAY আয়োজিত যশরাজ স্মরণ অনুষ্ঠানে শ্রদ্ধা জানালেন শিল্পীরা

মেওয়াতি ঘরানার প্রবাদপ্রতিম শিল্পী পণ্ডিত যশরাজের জন্ম ১৯৩০ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি। জীবনের পাঠ নিয়েছিলেন সংগীতের মাধ্যমেই। দাদা মনিরামও ছিলেন শাস্ত্রীয় সংগীতের সাধক। বিশ্বজোড়া সুরের প্রাঙ্গণে যশরাজজি ছিলেন বিশ্বনাগরিক। কোথাও যে তার নাই সীমানা। দৃপ্ত অথচ নান্দনিক আবেদনের মাধ্যমে তিনি বহুকাল থেকে শ্রোতাদের বাকরুদ্ধ করেছেন রাগ- ‘দরবারি’, ‘বসন্ত’, ‘মিঞা কী মল্লার, ‘বাগ্রেশ্রী,’, ‘ভীমপল্লশ্রী’, ‘ভাটিয়ার’, ‘জয়জয়ন্তী’, ‘ঠাট খাম্বাজ’, ‘মুলতানি’, ‘মধুবন্তী’, ‘পূরবী’ ইত্যাদি শুনিয়ে। রাগ ‘আহির ভৈরব’- এর যুগলবন্দিতে অংশ নিয়েছেন পণ্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়ার সঙ্গে।

‘মালকোষ’ পরিবেশন করেছেন ভারতরত্ন পণ্ডিত ভীমসেন যোশীর সঙ্গে দ্বৈতকন্ঠে। যশরাজের কণ্ঠে শ্রোতারা শুনতে পেতেন ভক্তিমূলক সংগীতও। ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাসী আধ্যাত্মিক চেতনা সম্পন্ন শিল্পী বিভিন্ন অনুষ্ঠানে শুনিয়েছে নানা স্বাদের ভক্তিগীতি। তার মধ্যে ছিল শিবস্তুতি, কালীবন্দনা, ভাগবৎ, হনুমান চল্লিশা, কৃষ্ণবন্দনা ইত্যাদি। সাম্প্রদায়িকতার রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে গেয়েছেন ‘মেরো আল্লা মেহেরবান’। শিল্পীর যে কোনও জাত থাকতে নেই। সারা জীবন ধরে দেখেছেন প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মের রং বদল আর তার অপরূপ রূপের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিজের কণ্ঠে এনেছেন রাগ-রাগিণীর পরিবর্তন। একবার পূব আকাশ স্বচ্ছ হওয়ার আগে মুহূর্তে ভাটিয়ার রাগে গেয়েছিলেন ‘কোই নেহি হ্যায় আপনা’।

আরও পড়ুন: শিক্ষক দিবসের প্রাক্কালে ছাত্রস্বার্থে কুড়ি হাজার টাকা অনুদান এক শিক্ষকের

তাঁর পার্থিব দেহ পঞ্চভূতে বিলীন হওয়ার ১৩ দিনের মাথায় শিল্পীর অসংখ্য গুণমুগ্ধরা করোনার পরিবেশ থেকে নিজেদের মুক্ত করে আয়োজন করেছিলেন শিল্পীর স্মরণসভা গত ৩০ আগস্ট, রবিবার। সেই আয়োজন বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে কোনও প্রেক্ষাগৃহের পরিবর্তে অনুষ্ঠিত হল ভার্চুয়ালি মানে অনলাইনে। ‘স্পিক ম্যাক’ আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে সদ্য প্রয়াত পণ্ডিত যশরাজের স্মৃতির উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন ভারতের উপ-রাষ্ট্রপতি এম. ভেঙ্কাইয়া নাইডু, কেন্দ্রীয় তথ্য ও প্রযুক্তিমন্ত্রী রবিশঙ্কর প্রসাদ, পণ্ডিত শিবকুমার শর্মা, পণ্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া, ড. সোনাল মান সিং, ড. এল. সুভ্রমনিয়াম, বেগম পরভীন সুলতানা, ভিক্কু বিনায়াক্রাম, পণ্ডিত রাজন ও পণ্ডিত সাজন মিশ্র, রতনমোহন শর্মা, মাধবী মুদগল, অরুণ ভারত রাম সহ অন্যান্য গুণিজনেরা। অনুষ্ঠানের শুরুতে উপ-রাষ্ট্রপতি প্রেরিত শোকবার্তা পাঠ করার পরে বক্তব্য রাখেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী রবিশঙ্কর প্রসাদ। তিনি বলেন, শৈশবে পাটনায় দুর্গাপুজোর সময় আয়োজিত অনুষ্ঠানে শিল্পীর গান শুনে মুগ্ধ হয়েছিলেন তিনি। ওস্তাদ আমির খান, ওস্তাদ আবদুল করিম খান, পণ্ডিত মল্লিকার্জুন মনসুর, সহ প্রখ্যাত কণ্ঠসংগীত শিল্পীদের সঙ্গে যশরাজের তুলনা করেন রবিশঙ্কর প্রসাদ। মন্ত্রীত্বের ব্যস্ততার মধ্যেও একবার তৎকালীন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের আমন্ত্রণে রাষ্ট্রপতি ভবনে গিয়ে এক ঘন্টার উপর শিল্পীর গান শোনার অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেন শ্রোতাদের সঙ্গে।

স্মৃতিচারণ করে পণ্ডিত শিবকুমার শর্মা বলেন, ১৯৫৫ সাল থেকে যশরাজজির সঙ্গে তাঁর পরিচয় এক সময় পারিবারিক ঘনিষ্ঠতায় গিয়ে দাঁড়ায়। ৬৫ বছরের সেই সম্পর্ক শেষ হল পণ্ডিতজির মৃত্যুর সঙ্গে।

প্রবাদপ্রতিম বংশীবাদক পণ্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া সুরে সুরে শ্রদ্ধা জানালেন তাঁর সতীর্থকে। বাঁশির সুরে শোনা গেল ‘বৈষ্ণব জানাতো’ রামধুন। এরপরেও পণ্ডিত চৌরাসিয়া বাজালেন আরও একটি রাগ। শিল্পী ড. এল. সুভ্রমনিয়ামের কণ্ঠেও যশরাজের সম্পর্কেও আবেগের সুর অনুরণিত হল। দেশের স্বাধীনতার হীরকজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে পণ্ডিত যশরাজের সঙ্গে তিনি বাজিয়েছিলেন একটি রামধুন। অন্যান্য অনুষ্ঠানেও তাঁরা অংশগ্রহণ করেন। ‘মাতা কালীকা’ গানটির সঙ্গেও বেহালা বাজিয়েছিলেন ড. সুভ্রমনিয়াম। প্রদর্শিত হল দুজনের দ্বৈত অনুষ্ঠানের ভিডিও। ড. সোনাল মান সিং তাঁর বক্তব্যে জানালেন, সাতের দশকে একবার পণ্ডিত মনিরাম এবং তাঁর ছোট ভাই যশরাজকে নিয়ে তিনি দিল্লির উপকণ্ঠে কালকাজি কালীমন্দিরে যান। সেই সময় মন্দিরের দ্বার খুলতে কিছুটা সময় বাকি ছিল। সেই অবসরে দুই ভাই সময় কাটানোর জন্য ধরেন দেবী কালীকার বন্দনা। সে ছিল এক বিরল অভিজ্ঞতা।

শ্রদ্ধায় অবনত শিল্পী মাধবী মুদগল

যশরাজ স্মরণে আয়োজিত এই অনলাইন অনুষ্ঠানে ছিল নৃত্যানুষ্ঠানও। অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পরেও থেকে যায় রেশ। ইউটিউবে শুনতে ইচ্ছে করে প্রয়াত শিল্পীর কণ্ঠে ভীমপল্লশ্রীতে গাওয়া ‘যা যারে আপনে মন্দিরওয়া, শুন বাভেরি সাসো নাজারিয়া’। স্মরণানুষ্ঠান শুনে এক চোখে আনন্দ আর অন্য চোখে জলের ধারা। সেই জলের স্বাদ যে লবণাক্ত, যা আগে জানা ছিল না। আসলে দিব্যত্বকে সহজে বিচলিত করতে পারে সংগীত যা ঈশ্বরের এক অন্যবদ্য সৃষ্টি। আর সেই সুন্দরের সাধকরা যখন শাশ্বত আলোয় মুক্তির স্বাদ পেয়ে পৃথিবীর মাটি ত্যাগ করেন, তখন আমরাও বিচলিত হয়ে পড়ি।

Related Articles

Back to top button
Close