fbpx
অন্যান্যগুরুত্বপূর্ণদেশপশ্চিমবঙ্গহেডলাইন

কেন চেয়ে আছ গো মা……

মনীষা ভট্টাচার্য: আজকের ভোর কি একটু অন্যরকম? করোনাকালে সব সকালই একই রকম লাগে। দু’হাতের উল্টো পিঠে চোখ কচলিয়ে পাশ ফিরতে ফিরতে মনে হল আজ স্বাধীনতা দিবস। এই করোনা পরিস্থিতেও লালকেল্লায় উত্তোলিত হবে জাতীয় পতাকা। স্যোশাল মিডিয়ায় আসবে নানা পোস্ট।কিন্তু…? এই কিন্তুর পরে রয়েছে কিছু খণ্ড খণ্ড শব্দ আর নিজস্ব এক ভাবনা।
ঘড়িতে এখন ৮টা বেজে ৫০মিনিট। স্বাধীনতার দিনে রাস্তায় তেমন গাড়ির গতি নেই।

কলকাতা ভাসছে নিজের ছন্দে। এক দমকা ঠান্ডা হাওয়ার স্পর্শ দিল বাগবাজারের পতিত পাবনী গঙ্গা। চোখ গেল সেইদিকে। ঘোলা জলে ইতিউতি শৈবাল দাম। তারই সঙ্গে দৃশ্যমান কিছু দামাল ছেলের জলকেলি। গঙ্গার শেষ সীমারেখায় যেখানে আকাশের সঙ্গে মিতালি, সেখানে চোখে পড়ল সাদা, নীল, কালো মেঘের লুকোচুরি। না ধানের ক্ষেত নয়, ক্রমাগত নাব্যতা হারাতে থাকা অনার্য গঙ্গার উপরে মেঘ-রৌদ্রের খেলা। খেলা না যুদ্ধ? নাকি যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা? হঠাৎ মন চিৎকার করে উঠল, ‘বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক’। এ শ্লোগান কার লেখা আমার ঠিক জানা নেই। কিন্তু বিপ্লব দীর্ঘজীবী হয়েছে। রসে বশে মানুষই তাকে দীর্ঘজীবী করেছে। মনে পড়ছে সলিলবাবুর সেই ‘ঢেউ উঠছে, কারা টুটছে, আলো ফুটছে, প্রাণ জাগছে।’

আরও পড়ুন:৭৪তম স্বাধীনতা দিবসে জাতির উদ্দেশে ভাষণ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির

সমষ্টিমানুষ থেকে ব্যক্তিমানুষ সকলের বিপ্লবের যোগফলই কি আজকের স্বাধীনতা? এ প্রশ্ন উঠছে কারণ ৭৪ বছরের স্বাধীনতায় আমরা ঠিক কী দিলাম আর কীই বা পেলাম, তা কিছুতেই বুঝতে পারছি না। মন বলছে দিন আনে দিন খায় যে মানুষগুলো তাদের জীবনযুদ্ধ উনিশ শতকে যা ছিল, বিশ শতকেও তাই আর একবিংশতেও একইরকম রয়েছে। এদের জীবনকে ‘আজ জুটেছে, কাল কী হবে, কালের ঘরে শনি’-এই ট্যাগলাইন পরিয়ে দেওয়াই যায়। তাদের জীবনে তথাকথিত কোনও সাফল্য ছিল না, আসবে বলেও মনে হয় না। তাই বারে বারে মনে হচ্ছে লাখ লাখ মানুষ প্রাণ দিয়ে, মান দিয়ে, রক্ত দিয়ে যে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করলেন তা কি বৃথাই গেল?

সুজলাং সুফলাং মলয়জশীতলাং জন্মভূমিকে শৃঙ্খলে আবদ্ধ রাখতে চাইনি আমরা কখনই। তাই দীর্ঘ ২০০বছর রাজত্ব করা ব্রিটিশকে তাড়িয়ে আমরা স্বাধীন হয়েছি। ভাগের স্বাধীনতায় আমরা এখন সবাই স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক। তবে কতটা স্বাধীন হয়েছি এ প্রশ্ন করা বারণ। সমস্ত সীমান্তের মানবজীবনের খবর আমরা কতটুকুই বা রাখি। প্রয়োজনই বা কী! গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা মানুষ যখন বলতে পারেন চাষি মারা যাচ্ছেন অবৈধ সম্পর্কের কারণে, তখন বোঝাই যাচ্ছে আমরা কতটা স্বাধীন। ৭৪বছর হয়ে গেল শিকল ঘুচেছে, কিন্তু সাধারণ মানুষের কোনও অগ্রগতি নেই। কত এমন রাজনৈতিক সন্ধি আছে, চুক্তি আছে,হস্তান্তর আছে যাতে ভারতবর্ষ আছে, কিন্তু তাতে তার কোনও অধিকার নেই। ব্রিটিশের কাছে যে সম্মান আমরা পাইনি তাই ভেবেছিলাম বড় বড় নেতাদের হাত ধরে আসা ভাগের স্বাধীনতার পরে পাব। কিন্তু সে গুড়েও বালি। বরং আমরা আজ ‘ভারত হামকো জানসে প্যায়রা হ্যায়’ গুন গুন করছি আর সব বেচে দিচ্ছি অন্যকে।

আরও পড়ুন:করোনার আবহে চাকরি হারালেন এয়ার ইন্ডিয়ার ৪৮ পাইলট

যে ‘বন্দেমাতরম’ ধ্বনি একদিন উদ্বুদ্ধ করেছে মানুষকে, সে আজ আর করে কই? আজ তো মিছিলে হাঁটাটাও স্টেটাস সিম্বল হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্তঃসারশূন্য হতে হতে আমরা আজ নিজেদেরকে শোপিস বানিয়ে তুলেছি, যার শো অফ না করলে অস্তিত্বের সংকট দেখা দেয়। গান্ধীজি বলেছিলেন যেদিন মধ্যরাতেও মেয়েরা নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারবেন সেদিন আমরা স্বাধীন হব। সেদিক থেকে দেখতে গেলে ৭৪বছর পেরিয়েও আমরা স্বাধীন নই, কারণ মধ্যরাত নয়, মধ্যদিনেও আজ মেয়েরা নিরাপদ নয়। তবু স্বাধীনতা ক্যালেন্ডার মেনে আসে। আমরা জাতীয় পতাকা উত্তোলন করি, জাতীয় সংগীত গাই এবং জাতীয় ছুটির দিনে প্রকৃত খাদ্যরসিক হয়ে ক্রেডিট কার্ডে দক্ষিণ হস্তের কর্ম সম্পাদন করি।

তাহলে স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক আমরা কী দিলাম দেশকে? আমরা কি পূজ্যপাদ গরুও হতে পারলাম না? ‘গরু ঘাস খায়। কিন্তু দেয় দুধ।… ক্রমাগত শুকনো বিস্বাদ ঘাস-খড় বিচালী চিবোতে চিবোতে ঢাক-ঢোল, শঙ্খ-ঘণ্টা, মাইক-লাউড স্পিকারহীন নীরবতার ভিতর দিয়ে এই একটা অত্যন্ত জরুরি জানার বিষয়কে প্রতিদিন ঘোষণা করে চলেছে যে, ঘাস খেয়ে দুধ দিয়ে যাও।’ এখানেই শেষ নয়, গরুর কাছ থেকে আরও শেখার আছে। ‘সব সময় পান করো। মুখের কাছে ঘাস, খড়, বিচালী, শুকনো পাতা, যা পাও।

আরও পড়ুন: এবার করোনায় আক্রান্ত কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রকের যুগ্মসচিব লভ আগরওয়াল

দুঃখ, দারিদ্র্য, অপমান, ভয়, ভাবনা, বিষাদ, হতাশা যা পাও। হত্যা, রক্ত, উন্মত্ততা যা পাও।…আলিঙ্গনের ভিতরে ছোরা, হাসির ভিতরে গোলাপের কাঁটা, চুম্বনের ভিতরে সাপের ফনা, যা পাও।পান করো। কিন্তু পৃথিবীকে ফিরিয়ে দেবার সময় দিয়ো দুধ।…ঘাস খেয়ে ঘাস ফিরিয়ে দিতে নেই।’-এত বড় সত্যি কথা বলেছিলেন পূর্ণেন্দু পত্রী।

কিন্তু মা যে আজও চেয়ে আছে এই আশায় যে, তার সন্তানেরা তাঁকে কিছু ফিরিয়ে দেবে। তিনি যে দিয়ে চলেছেন ‘স্বর্ণশস্য তব, জাহ্নবীবারি, জ্ঞান ধর্ম কত পুণ্যকাহিনী’…আর আমরা? মাকে কি সত্যি তাঁর হীন সন্তানদের ভুলে থাকতে হবে? মুখ লোকাতে হবে ধূলিশয়নে? আমরা কি সত্যিই নির্মম চেতনাহীন পাষাণ হয়েই থেকে যাব? যাই হোক।আজ ড্রাই দে। আজ অন্তত সকলে এক গ্লাস দুধ খান!

Related Articles

Back to top button
Close