fbpx
আন্তর্জাতিকগুরুত্বপূর্ণব্লগহেডলাইন

ভারত ও হিন্দু বিরোধী ‘কমলা’কে নিয়ে আদিখ্যেতা

মানস রায়: কমলা একটি ভারতীয় নাম তা নিয়ে সংশয় নেই। সেই নামের কমলা হ্যারিসকে ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য সঙ্গী করেছেন ডেমোক্র্যাট দলের প্রেসিডেন্ট পদ প্রার্থী জো বাইডেন। ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট বাকযুদ্ধের (ডিবেটে) প্রথম রাউন্ডে পরাজিত এই নবীন সেনেটারকে ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য সঙ্গী করা আদৌ গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থী কিনা সেই প্রশ্ন দলের ভিতরেই অনেকে উঠিয়েছে। তবে আইনত কোনও সমস্যা নেই, যেমন সরাসরি মানুষের ভোটে নির্বাচিত না হয়েও ড: মনমোহন সিংহ দু’দুবার পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্র ভারতের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন।

ভারতীয় মিডিয়া – মুদ্রণ ও বৈদ্যুতিন, রামমন্দির নিয়ে নীরব প্রিয়াঙ্কা চোপড়া ও রাম মন্দির সমর্থক বিজেপি বুদ্ধিজীবী, দেশী ও প্রবাসী ভারতীয় উচ্ছ্বসিত যে একজন ইন্ডিয়ান-আমেরিকানকে ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য সঙ্গী করেছেন জো বাইডেন। কথায় বলে ‘যার বিয়া তার হুঁশ নাই, পাড়া পড়শির ঘুম নাই’। যে মহিলাকে ভারতীয় সাজানোয় উঠে পড়ে লেগেছে ভারতীয় মিডিয়া, বলিউড, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং দেশী ও প্রবাসী ভারতীয়রা, সেই মহিলা কিন্তু কোনদিনই তার ভারতীয় সত্ত্বা নিয়ে কিছু বলেননি বরং উনি নিজেকে একজন ‘কালো মহিলা’ হিসেবেই পরিচয় দিয়েছেন এবং তার জন্য গৌরব বোধ করেছেন।

কমলার মা শ্যামলা গোপালন ছিলেন তামিল আইয়ার ব্রাহ্মণ, জন্ম ১৯৩৮ সালে চেন্নাইয়ে। দিল্লির লেডি আরউইন কলেজে পড়া শেষ করে গবেষণার জন্য পাড়ি জমান ক্যালিফোর্নিয়ার বার্কলে বিশ্ববিদ্যালয়ে। ক্যান্সার গবেষক হিসেবে সুপরিচিত শ্যামলা আমেরিকার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৬৩ সালে, ২৫ বছর বয়সে শ্যামলা বিয়ে করেন বার্কলের অধ্যাপক, জ্যামাইকা আগত কৃষ্ণকায় মানুষ, ডোনাল্ড হ্যারিসকে। হয়ে যান গোপালন আইয়ার থেকে হ্যারিস। বিয়ে ভেঙে যায় ১৯৭১ সালে, এর মধ্যে জন্ম দুই কন্যার কমলা ও মায়া। মেয়েদের বড় করেন মা শ্যমলা।

আরও পড়ুন:উপত্যকা থেকে ১০ হাজার আধাসেনা প্রত্যাহার করল কেন্দ্রীয় সরকার

কমলা হ্যারিসের যখন সাত বছর বয়স তখন থেকে মায়ের কাছে মানুষ তিনি। আট বছরের মধ্যে বিয়ে ভাঙলেও শ্যামলা সারা জীবন ‘হ্যারিসন’ পদবি ব্যবহার করেন। শ্যমলা ক্যানসার গবেষণার সময় থেকেই জড়িয়ে পড়েন সিভিল রাইটস মুভমেন্ট-এর সঙ্গে। যা মূলত আমেরিকার কৃষ্ণাঙ্গদের সমানাধিকার অর্জনের আন্দোলন, ভারতীয়দের সঙ্গে এই আন্দোলনের বিশেষ যোগ নেই। সেই আন্দোলনের সূত্রেই কৃষ্ণাঙ্গ ডোনাল্ড হ্যারিসনের সঙ্গে পরিচয় ও পরিণয়।

বিবাহ বিচ্ছেদের পর পিতার সঙ্গে কন্যাদের যোগাযোগ না থাকলেও শ্যামলা কন্যাদের ভারতীয় নয়, ‘কালো মেয়ে’ হিসেবে গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন। কেন এই সিদ্ধান্ত? কমলা হ্যারিস তার আত্মজীবনীতে লিখছেন যে, তার মা বুঝেছিলেন আমেরিকান সমাজ তাদের (দুই বোনকে) ‘কালো মেয়ে’ বলেই দেখবে। তাই আইয়ার বংশের কন্যা শ্যামলা কোনও ভারতীয় প্রতিষ্ঠানে (বার্কলে ও সান ফ্রান্সিসকোতে তার অভাব ছিল না) নয়, মেয়েদের নিয়ে যেতেন Rainbow Cultural Sign নামক কালোদের সংস্কৃতি চক্রে, যেখানে কৃষ্ণকায় ও সিভিল রাইটস মুভমেন্টের নেতা ও অন্যান্য বুদ্ধিজীবিদের ছিল নিত্য আনাগোনা। আরেকটি কারণ, কৃষ্ণাঙ্গদের আন্দোলনের সঙ্গে তখন শ্যামলার সম্পৃক্ততা এত বেশি ছিল যে ভারতীয় সামাজিক ধার্মিক সংস্কৃতিক আবহাওয়ার চিন্তা তার মাথায় আসা সম্ভব ছিল না।
আমেরিকার কালো মানুষদের রাজনীতি খুব বেশি ভাবে চার্চ ভিত্তিক। সুতরাং কালো মানুষদের বিশ্বাস অর্জন করতে হলে কোনও একটি চার্চ ভিত্তিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকা অত্যন্ত আবশ্যিক। কমলার মা শ্যামলা সেটা ভালোভাবে জানতেন তাই কন্যাদের খ্রিস্টধর্মের অনুসারী করেছিলেন শ্যামলা। ছোটবেলা থেকেই দুই বোন, কমলা ও মায়া, যেতেন ওকল্যান্ড এর ‘টুএন্টি থার্ড অ্যাভিনিউ চার্চ অফ গড’এ।

বর্তমানে কমলা হ্যারিস সান ফ্রান্সিস্কোর ‘থার্ড ব্যাপটিস্ট চার্চ’র সদস্য যার প্যাস্টর হলেন রেভারেন্ড এমস ব্রাউন। কমলা হ্যারিস ক্যালিফোর্নিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেল এবং পরে সেনেটার হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন বাইবেলের ওপর হাত রেখে, কোন গীতা রামায়ণের গল্প সেখানে নেই।

অতএব, নামের প্রথমে ‘কমলা’ শব্দটি ছাড়া আর কোনও ভারতীয় দুর্বলতা কমলা হ্যারিসের নেই (ভোট যুদ্ধে নেমে এখন উনি তার ভারতীয় যোগ নিয়ে অনেক কথা বলতে পারেন. সেটা ধর্তব্যের মধ্যে আনছি না)। শুধু তাই নয়, কমলা বেশ ভারত ও হিন্দু বিরোধী এবং পাকিস্তানের প্রতি নরম ভাব প্রকাশ করেন। মৌলবাদ এবং ইসলামী সন্ত্রাসবাদ সম্পর্কে সহানুভূতিশীল বিভিন্ন আমেরিকান সংগঠনের সভায় তিনি আমন্ত্রিত বক্তা (এটা অবশ্য প্রায় সব ডেমোক্র্যাট নেতা নেত্রীদের সম্পর্কে বলা যায়)। এরা সবাই এখন কমলা হ্যারিসের পক্ষে প্রচারে নেমে পড়েছে।

আরও পড়ুন: টিএমসির গণতন্ত্র ধ্বংসের রাজনীতি বিজেপি শেষ করবে

সম্প্রতি ভাইরাল এক ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে যে, কমলা হ্যারিস পাকিস্তানে আমেরিকার রাজদূত (অ্যাম্বাসাডর) না নিয়োগ করার জন্য ট্রাম্প প্রশাসনের নিন্দা করছেন, তিনি জানাচ্ছেন যে পাকিস্তানে আমেরিকার রাজদূত থাকলে ভারত সরকার দ্বারা আর্টিকেল ৩৭০ বাতিল ও কাশ্মিরীদের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করার বিষয়টিতে আমেরিকা আরও সক্রিয় হতে পারত। তিনি ভারত দ্বারা কাশ্মীরে নারী ও শিশুদের ওপর অত্যাচার ও পেলেট গান ব্যবহারের নিন্দা করেন, অথচ কাশ্মীরে মুসলিম মৌলবাদীদের দ্বারা পন্ডিতদের হত্যা, নারীদের ধর্ষণ, সম্পত্তি লুঠ এবং সর্বশেষে মাতৃভূমি থেকে বিতারণ নিয়ে তিনি কোনওদিন একটি শব্দও ব্যয় করেননি। কাশ্মীর ও ভারতের অন্যান্য অংশে পাকিস্তানের সহায়তায় ইসলামি সন্ত্রাসবাদ নিয়েও নীরব কমলা হ্যারিস, বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতন, পাকিস্তানে খ্রিস্টান নির্যাতন ইত্যাদি বিষয়েও কোনদিন মুখ খোলেননি কমলা হ্যারিস।

কমলা হ্যারিসের রাজ্য (স্টেট) ক্যালিফোর্নিয়ার স্কুল পাঠ্যপুস্তকে ভারত ও হিন্দুধর্ম বিরোধী অংশ বাতিল করার দাবিতে আন্দোলন চলছে গত পাঁচ বছরেরও বেশি। আন্দোলনে সফলতাও এসেছে অনেকাংশে. স্বাভাবিকভাবেই এই আন্দোলনের পাশে দাঁড়াননি কমলা হ্যারিস। ইসলামি মৌলবাদ ও সন্ত্রাসবাদের প্রতি কমলার নরম মনোভাব জো বাইডেনকে প্রভাবিত করেছে তাতে সন্দেহ নেই। কারণ স্বয়ং জো বাইডেন কয়েকদিন আগে আমেরিকার স্কুলগুলিতে অমুসলিমদের আরও বেশি ইসলাম শিক্ষার দাবি তুলেছেন। নির্বাচনে জিতলে শিক্ষার ইসলামিকরণে তার যোগ্য সঙ্গী হবেন কমলা হ্যারিস সেটা নিশ্চিত।

শুধু নামের প্রথম ভাগে একটি ভারতীয় শব্দের জন্য এক জন স্বঘোষিত ‘কালো মেয়ে’ এবং ভারত ও হিন্দু বিরোধীর জন্য দেশী ও প্রবাসী ভারতীয়দের উচ্ছ্বাস দেখে মনে হয় ভারতীয় চরিত্রে আত্মমর্যাদা নামক বস্তুটির চরম অভাব রয়েছে।

(মতামত নিজস্ব)

Related Articles

Back to top button
Close