fbpx
গুরুত্বপূর্ণব্লগহেডলাইন

নীতি ও রাজনীতির বিতর্কে ভারতের কৃষিক্ষেত্র

ড: সৌমেন চক্রবর্ত্তী: নতুন কৃষি বিল নিয়ে যে বিতর্ক, তাতে অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যে অর্থনৈতিক যুক্তি অপেক্ষা রাজনৈতিক বিপণনের উপর বেশি নির্ভরশীল। এই বিল ভারতীয় কৃষকদের জন্য এক ঐতিহাসিক জলবিভাজিকার মুহূর্ত। এই বিলের বিরোধিতার ক্ষেত্রে যে শ্রেণীর সব চেয়ে বেশি ঢক্কানিনাদ শোনা যাচ্ছে, তাঁরা ভারতীয় সুবিধাভোগী মধ্যবিত্ত থেকে বেরিয়ে আসা কৃষক নেতা, তাদের সঙ্গে জমির কোনও সম্পর্ক নেই, অথচ কোন না কোনও রাজনৈতিক দলের পতাকা নিয়ে জনপ্রতিনিধি হিসেবে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতে উৎসাহিত বেশি। উদারিকরণের সুবিধা ভোগ করবে সবাই, কেবল কৃষক তার সব স্বাধীনতা বন্ধক রেখে যাবে, এই মধ্যবিত্ত শ্রেণীর কাছে।

এই নীতি একদিকে কৃষককে যেমন মুক্ত করবে দেশীয় এজেন্ট হিসেবে উপস্থিত ডাকাতদের কাছ থেকে, তেমনি রাজ্যের রাজনৈতিক ভূগোল থেকে। সুদূর প্রসারী পরিকল্পনা হিসেবে বলা যায়, এই নীতি কার্যকর হলে ভারত রাষ্ট্রের কাছে খুলে যাবে-খাদ্য কূটনৈতিক পথ, এর উপর বলিয়ান হয়ে রফতানি বাণিজ্য বাড়বে। কৃষি কেন্দ্রিক শিল্প বাণিজ্য বাড়বে। উদ্বৃত্ত ফসল নষ্ট হবে না, কৃষক মান্ডিগুলি প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হবে, বাড়বে কৃষকদের দর কষাকষির ক্ষমতা। একইভাবে উৎপাদন পণ্যের দাম বাজারে চাহিদা অনুযায়ী সে পাবে লাভের একটি বড় অংশ। দালাল, ফোঁড়েদের কাছে এই বিল সত্যিই অশনিসংকেত।

আরও পড়ুন:নয়া কৃষি আইনের প্রতিবাদে আজ ধরনায় বসছেন পঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী ক্যাপ্টেন অমরিন্দর সিং

নতুন কৃষি বিল নিয়ে সবচেয়ে বেশি উত্তেজিত পাঞ্জাব, হরিয়ানা, পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের অঞ্চলগুলো, এর কারণ ৮৫ শতাংশ গম এবং ধান ৭৫ শতাংশ যথাক্রমে পাঞ্জাব, হরিয়ানা রাজ্যের থেকে সরকার M.S.Pর দামে কেনে। তাদের ভয় যদি দাম নতুন ব্যবস্থায় কম পায় বা যে মান্ডিগুলি এজেন্টদের নিয়ে এক প্রতিষ্ঠানিক স্বার্থ চক্র গড়ে তুলেছে, তাহলে সেই ঘুঘুরবাসা এর ফলে ভেঙে যাবে-এই আশঙ্কায় সোচ্চার হচ্ছে তারা সবচেয়ে বেশি। পাঞ্জাব সরকার মান্ডিগুলি থেকে ৬ শতাংশ কর আরোপ করে। এর ফলে তাদের স্বার্থ জড়িত আছে। আঞ্চলিক দলগুলির দ্বারা পরিচালিত রাজ্য সরকারের বেলায় এক রকম স্বার্থের সংঘাত অনিবার্য। এখানেই এই আঞ্চলিক দলগুলির কাছে কৃষকদের দর কষাকষির স্বার্থের থেকে ভোট জড়ো করার স্বার্থ অনেক বেশি। তাই এই প্রতিবাদ ততটা না কৃষক স্বার্থে তার থেকে বেশি রাজনৈতিক বিপণনের স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত।

আরও পড়ুন:একমাত্র বিজেপিই পশ্চিমবঙ্গে নারী সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারে

এবারের আসি বামপন্থী দলগুলোর দ্বিচারিতা প্রসঙ্গে, ২০০৬ সালে পশ্চিমবঙ্গের বামপন্থী সরকার কোন যুক্তিতে মেট্রো ক্যাশ অ্যান্ড ক্যারির মতো জার্মান সংস্থাকে কিভাবে পারমিশন দেওয়া হয়। ৩০শতাংশ বিক্রিত পণ্য সরাসরি উৎপাদনকারীর থেকে নেয়। আন্তর্জাতিক দিক থেকে বিশ্ব খাদ্য সংকট রিপোর্ট থেকে জানা যায় ১১৭টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান ১০৭। সরকারের তথ্য অনুযায়ী ৭৪১.৪১লাখ টন খাদ্যশস্যের উৎপাদন করে ভারত। মা জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা আইন অনুযায়ী ৬১০ লাখ টন খাদ্য দরকার। কিন্তু এর মজুত করার ব্যবস্থা ভারতে নেই। এর ফলে খাদ্যশস্যের অপচয় ঘটে। নতুন কৃষি বিল বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে গোডাইন করায় উৎসাহিত করবে। ভারতের খাদ্যশস্যের স্বয়ম্ভরতা ভারতকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকতে সাহায্য করবে।

লেখক সাধনচন্দ্র মহাবিদ্যালয় (ডায়মন্ডহারবার, ফলতা), রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষক ও গবেষক
(মতামত নিজস্ব)

Related Articles

Back to top button
Close