fbpx
পশ্চিমবঙ্গহেডলাইন

বিদেশী ‘ক্যালিফিয়া’, ‘কোলিয়েক’, ‘কোটলিকিউ’, ‘ক্যালমা’ দেবীই কি আমাদের দেবী ‘কালী মা’?

 ভাস্করব্রত পতি: আজ আমরা দেবী কালীর আরাধনায় ব্রতী। সারা ভারত জুড়ে হিন্দুদের কাছে শক্তির উপাসক এই দেবী। কিন্তু এই কালীর অস্তিত্ব কি বিদেশ থেকে এসেছে? বিদেশী দেবীর অনুষঙ্গ থেকেই কি কালীর জন্ম? কিংবা এই কালীই কি বিদেশের নানা দেবীতে অনুপ্রবেশ করেছে?

মাঘ মাসের কৃষ্ণা চতুর্দশী রটন্তী কালী, জৈষ্ঠ্য মাসের কৃষ্ণা চতুর্দশীতে ফলহারিণী কালী, কার্তিকের রাস পূর্ণিমাতে কৃষ্ণকালী ছাড়াও শ্মশানকালী, রক্ষাকালী, আদ্যাকালী, জিয়ৎকালী, মহাকালী, শ্যামাকালী, নিত্যকালীর পূজার রেওয়াজ আছে। নানা রকম কালীর সাথে অদ্ভুত মিল মেলে বিদেশের বহু দেবীর সাথে। কারা প্রথম দেবী কালীর আরাধনা শুরু করেছিল, তা নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হতে বাধ্য তাই।

হিন্দুদের ব্রম্ভবৈবর্ত্তপুরাণে পাই “প্রথমে পূজিতা সাজ কৃষ্ণেণ পরমাত্মানা / বৃন্দাবনে চ সৃষ্টাদৌ গোলকে রাসমণ্ডলে / মধুকৈটভ ভীতেন ব্রম্ভণা সা দ্বিতীয়া / ত্রিপুরাপ্রেসীতে নৈব তৃতীয়ে ত্রিপুরারিণা / ভ্রষ্টশ্রিয়া মহেন্দ্রেণ সাপার্দ্দুর্বাসস পরা / চতুর্থে পূজিতা দেবী ভক্তা ভগবতী সতী / তদণমুণিন্দ্রৈ সিদ্ধেন্দ্রৈ দেবৈশ্চ মনুর্মানবৈঃ পূজিতা সর্ববিশ্বেসু বভূব সর্ব্বতঃ সদা”। অর্থাৎ বৃন্দাবনে প্রথম কালীপূজার সাধক শ্রীকৃষ্ণ। এরপর মধুকৈটভের হাত থেকে পরিত্রাণের উপায় খুঁজতে পূজা করেন ব্রম্ভা। তৃতীয় জন হিসেবে কালীর পূজা করেন দেবরাজ ইন্দ্র।

বিদেশের বিভিন্ন দেবীর উপচার এবং নানাবিধ বিবরণ জানলে মনে হবেই দেবী কালীর অস্তিত্ব একসময় নিশ্চয়ই প্রাচীন ক্রীট সভ্যতা, অ্যাজটেক সভ্যতা, পার্শিয়ার জিপসিদের থেকে মেক্সিকো, স্কটল্যাণ্ড, স্পেন, আয়ারল্যাণ্ড, রাশিয়া, গ্রীস, ফিনল্যাণ্ডেও বিস্তৃত ছিল।

ইউরোপের গ্রীকরা দেবী রিয়ার (Rhea) পূজা করতো আড়ম্বর সহকারে। এই দেবী হলেন যুদ্ধের দেবী। অবাক বিষয় যে, দেবী রিয়ার পূজা হয় শ্বেত জবা, পদ্ম এবং শালুক দিয়ে। আর কালীর পূজায় লাগে রক্ত জবা! সুদূর রাশিয়ার দক্ষিণ এলাকাতেও এই রিয়া পূজিতা হতেন ‘রা’ (Rha) নামেও। এর অর্থ রক্তবর্ণ বা লোহিতবর্ণ। আরও অদ্ভুত ব্যাপার যে ‘রা’ কে বলা হয় ‘Mother Time’। অর্থাৎ যিনি নিজের সন্তান সহ সব দেবতাকেই গ্রাস করে নেন। তিনিই দেবী ‘রিয়ানমন’। এঁরা স্বামীর নাম ‘ক্রোনাস’। যিনি হলেন ‘Father Time’ অর্থাৎ স্ত্রী রিয়া বা রিয়ানমনের মতো নিজের সন্তানদের গ্রাস করে নেন। এ আসলে আমাদের দেবাদিদেব মহাদেব এবং মহাকালীর বিদেশী সংস্করণ নয় কি?

প্রাচীন স্পেনের অধিবাসীদের কাছে পূজিতা হতেন এক দেবী। তাঁর নাম ‘ক্যালিফা’ বা “ক্যালিফিয়া”! আমাদের কালীর মতোই তিনি! এই দেবীর রাজত্বে ভরপুর ছিলো সোনা, রূপা সহ নানা ধরনের বহুমূল্য রত্নসামগ্রী। আমাদের কালী পূজার সঙ্গে ধনতেরস উৎসবের কিছু মিল পাওয়া যাচ্ছে কি? সবচেয়ে মজার ব্যাপার, পরবর্তীতে উত্তর আমেরিকার নব আবিষ্কৃত একটি নতুন ভূখণ্ডের নাম এই ‘ক্যালিফিয়া’র নামে করা হয় “ক্যালিফোর্নিয়া”!

মেক্সিকোতে তাকালেও কালীর বিদেশী অনুষঙ্গ মেলে। এখানকার সুপ্রাচীন অ্যাজটেক সভ্যতার আরাধ্যা দেবীর নাম ‘কোটলিকিউ’। ইনি ধ্বংস এবং সৃষ্টির দেবী। আমাদের কালীর মতোই। মেক্সিকান রেড ইন্ডিয়ান রা দেবীকে বলে ‘Our Mother’। সবচেয়ে অবাক ব্যাপার হোলো, কোটলিকিউর কোমরে অসংখ্য সাপের সমাহার। আর গলায় লকেটের মতো মাথার খুলি ও হাত! (Goddess of the serpent petticot & Lady of the skirt of Serpents)। পরবর্তীতে একে ‘কৃষ্ণবর্ণা ম্যাডোনা’ নামে খ্রীষ্ট ধর্মে যুক্ত করে নেওয়া হয়। এই ‘কোটলিকিউ’ সম্পর্কে জাস্টিনো ফার্নাণ্ডেজ লিখেছিলেন, ‘The Embodiment of the Cosmic Dynamic Power Which Bestows Life and Which Thrives on Death in the Struggle of Opposites’।

ফিনল্যাণ্ডের কৃষ্ণবর্ণা দেবীর নাম ‘ক্যালমা’ (Stench of Corpses)! যা কিনা আমাদের ‘কালী মা’! অবাকই হতে হবে। কেননা, এই দেবী একসময় জিপসিদের কাছে কৃষ্ণবর্ণা দেবী ‘সারা কালী’ নামে পরিচিতা ছিলেন। এই ক্যালমার প্রিয় স্থান হোলো সমাধীক্ষেত্র বা A Hunter Of Tombs। আমাদের কালীমার পূজাস্থানও শ্মশানভূমি। তাই তিনি শ্মশানকালী নামেও পূজিতা হন। বর্তমানে দক্ষিন ফ্রান্সে এখনও পূজা পান এই দেবী। এক সময় পার্শিয়ার জিপসিরা নিজেদের অভিহিত করতো ‘ক্যালেনডেরিস’ বা ‘দেবী কালীর লোকজন’ নামে। এঁদের এখনও বলা হয় ‘ক্যালডেরা’ বা ‘ক্যালডেরাস’। অর্থাৎ এটাই বোঝায় যে, এঁদের পূর্বপুরুষরা দেবী কালীর উপাসক ছিলেন।

আয়ারল্যাণ্ড কৃষ্ণবর্ণা দেবীর নাম ‘কোলিয়েক’। এর থেকে নাম হয়েছে ক্যালিডোনিয়া! আয়ারল্যাণ্ডের অধিবাসীদের ডাকা হোতো ‘কেলে ডে’ নামে। অর্থাৎ কালীর উপাসক! একসময় এই স্কটল্যাণ্ডকে ডাকা হোতো ‘ক্যালিডোনিয়া’ বা ‘কালী প্রদত্ত ভূখণ্ড’ বলে। দেবী ‘স্কোটিয়া’র নামেই হয়েছে স্কটল্যাণ্ড। এই দেবীই রোমানদের কৃষ্ণবর্ণা দেবী ‘অ্যাফোডাইট’। স্ক্যণ্ডিনেভিয়ানরা ‘কোলিয়েকে’র রূপভেদ হিসেবে ‘স্ক্যাডি’ এবং ‘স্কোটিয়া’র আরাধনা করতো। আমরা রক্ষাকালীর পূজা করি অসুখ থেকে মুক্তির জন্য। অসুখ সেরে গেলে দেবীর কাছে মানত হিসেবে পাঁঠা বলি দিই। তেমনি আয়ারল্যান্ডে জলবসন্ত বা চিকেন পক্স হলে এই কোলিয়েকের শরণাপন্ন হয়। অসুখ সেরে গেলে দেবীর কাছে ভেড়া উৎসর্গ করা হয়। এই কোলিয়েককে বলাই যায় ইউরোপীয় কালী। উপচারের পাশাপাশি নামেও অদ্ভুত মিল কালী ও কোলিয়েকের মধ্যে।

স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন আসতেই পারে, তথাকথিত বিদেশী ‘ক্যালমা’ এবং আমাদের আরাধ্যা ‘কালীমা’ কি আলাদা? স্প্যানিশ ‘ক্যালিফিয়া’ ও ইণ্ডিয়ান ‘কালী’র মধ্যে এতো মিল কি করে হতে পারে? সুদূর আটলান্টিক পারে থাকা ‘কোটলিকিউ’ আর গঙ্গা অববাহিকা এলাকার ‘কালী’র উদ্ভবের ক্ষেত্রে কি কোনও অজানা মিল রয়েছে? কিংবা ইউরোপীয় ‘কোলিয়েক’ আর এশিয়ান ‘কালী’ কি এক হতে পারেনা? তথাকথিত ভারতীয় ‘কালী উপাসক’দের সাথে দশম শতাব্দীর পার্শিয়ান ‘কেলেনডেরিস’ কিংবা আইরিশ ‘কেলে ডে’দের ধর্মীয় মিল কোথা থেকে এলো? আমাদের ‘কালীঘাট’ এর সাথে পার্থক্যটা কোথায় ‘ক্যালিফোর্নিয়া’, ‘স্কটল্যাণ্ড’ অথবা ‘ক্যালিডোনিয়া’র? একটু হলেও কি দেবী কালী সম্পর্কে মনে হচ্ছেনা যে, একসময় এই দেবীর সদর্প উপস্থিতি ছিল বিশ্বজুড়ে?

Related Articles

Back to top button
Close