fbpx
গুরুত্বপূর্ণব্লগহেডলাইন

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর: বঙ্গজীবনে অনুপ্রেরণার মহাস্রোত

দিলীপ ঘোষ: আজ থেকে প্রায় দুশো বছর আগে ১৮২০ সালের ২৬শে সেপ্টেম্বর অধুনা পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার (তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার হুগলি জেলা) বীরসিংহ গ্রামে বাঙালি হিন্দু ব্রাহ্মণ পরিবারে ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ও ভগবতী দেবীর পুত্র রূপে জন্মগ্রহণ করেন ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। মাত্র নয় বছর বয়সে বীরসিংহ গ্রাম থেকে কলকাতা শহরে যাওয়ার সময় পথের ধারে মাইলস্টোন দেখে ইংরেজি নম্বর শিখে নিয়েছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র, তাঁর আসাধারণ মেধার পরিচয় বিবর্ধনকারী এই আখ্যান সর্বজনবিদীত। সংস্কৃত ভাষায় অগাধ দক্ষতার পরিচয় দিয়ে তিনি মাত্র একুশ বছর বয়সে ১৮৪১ সালে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে যোগদান করেন সংস্কৃত ভাষার বিভাগীয় প্রধান হিসাবে।

পরবর্তী কালে ১৮৪৬ সালে তিনি সংস্কৃত কলেজে সহকারি সম্পাদক পদে নিযুক্ত হয়ে অধ্যাপনায় ব্রতী হন। সংস্কৃত কলেজ অধ্যাপনা করা কালীন ঈশ্বরচন্দ্র তাঁর সংস্কৃত ভাষা-সাহিত্য ও দর্শনশাস্ত্রে অসাধারণ পাণ্ডিত্যের কারণে ‘বিদ্যাসাগর’ উপাধিতে ভূষিত হন। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর রূপে পরিচিত হন বাংলা মায়ের এই অন্যতম শ্রেষ্ঠ সন্তান। পরে অবশ্য গতানুগতিক শিক্ষানীতির পরিবর্তন সাধনের কিছু প্রস্তাব দেওয়ার কারণে সংস্কৃত কলেজের সম্পাদক রসময় দত্তের সঙ্গে মতবিরোধ বাধে ঈশ্বরচন্দ্রের। তাই ১৯৪৯ সালে সংস্কৃত কলেজ থেকে অব্যাহতি নিয়ে পুনরায় ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে ফিরে যান তিনি। ১৮৭৩ সালে বিদ্যাসাগর সাঁওতাল পরগনার কারমাটরে উপস্থিত হন এবং জীবনের প্রায় আঠারো বছর সেখানেই অতিবাহিত করেন। কারমাটর ও জামতারা অঞ্চলে নারীশিক্ষার প্রসারে বিদ্যাসাগরের ভূমিকা অপরিসীম। ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯ তারিখ থেকে বর্তমান ঝাড়খণ্ড রাজ্যের জামাতারা জেলার কারমাটর ব্লকের নাম পরিবর্তন করে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ব্লক রাখা হয়েছে।

বিদ্যাসাগরের সমসাময়িক বাংলা ভাষা লেখা হত মূলত সাধু ভাষায় সংস্কৃত আঙ্গিকে এবং পদ্য রূপে। সংস্কৃতের কাঠিন্য থেকে মুক্ত করে বাংলা ভাষাকে সরল রূপদানের পথিকৃৎ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। তিনি বাংলা ভাষা শিক্ষার প্রণালীবদ্ধ প্রক্রিয়ার সর্বপ্রথম সূচনা করেন। আজও তাঁর রচিত ‘বর্ণপরিচয়’ বাংলা ভাষার প্রাথমিক শিক্ষায় মূল পাঠ্য হিসাবে সারা বিশ্বে সমাদৃত। সংস্কৃত ভাষার কঠিন ছন্দের অবগুন্ঠন থেকে মুক্ত করে বাংলা গদ্যকে পথ দেখিয়ে এগিয়ে নিয়ে গেছেন তিনি। বিদ্যাসাগরের হাত ধরেই বাংলা গদ্যের পথ চলার সূচনার কারণে আজও ‘বাংলা গদ্যের জনক’ রূপে তিনি সুপ্রসিদ্ধ। শুধুমাত্র ভাষাবিদ হিসেবে নয়, একজন শিক্ষাবিদ রূপেও বিদ্যাসাগর আজ চিরস্মরণীয়।

আরও পড়ুন:পুজোর মাসে নতুন ৫টা স্পেশাল ট্রেন পাচ্ছে রাজ্য

এ কথা অস্বীকার করবার অবকাশ নেই যে আঠারো শতকের তমসালব্ধ অন্তর্দ্বন্ধে লিপ্ত কুসংস্কারাছন্নে নিমজ্জিত বাঙালি সমাজের মধ্যে বিদ্যাসাগরের মতো ঋজু মেরদন্ড বিশিষ্ট মানুষের আবির্ভাব এক বিচিত্র ঐতিহাসিক ঘটনা। ১৮৫৬ সালে তত্ত্ববোধিনী সভার সভ্য রূপে নিযুক্ত হন বিদ্যাসাগর এবং ১৮৫৯ সালে ‘ক্যালকাটা ট্রেনিং স্কুল’ স্থাপনে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন তিনি। পরবর্তী কালে ১৮৬৪ সালে ক্যালকাটা ট্রেনিং স্কুলের নাম বদল করে রাখা হয় ‘হিন্দু মেট্রোপলিটন ইন্সিটিউট’। বিদ্যাসাগর সেখানে নিযুক্ত ছিলেন সম্পাদক পদে। ১৮৭৯ সালে এই হিন্দু মেট্রোপলিটন ইন্সিটিউটকে প্রথম শ্রেণীর কলেজে পরিণত করা হয়। বর্তমানে হিন্দু মেট্রোপলিটন ইন্সিটিউট ‘বিদ্যাসাগর কলেজ’ নামে আমাদের কাছে সুপরিচিত।

তৎকালীন সমাজে জাতিভেদ ও কৌলীন্য প্রথার কারণে বহুবিবাহ ছিল অত্যন্ত সাধারণ ঘটনা। মৃত স্বামীর জ্বলন্ত চিতায় সদ্য বিধবা নারীদের জীবন্ত দগ্ধ করে মেরে ফেলার বর্বর ‘সতীদাহ’ প্রথা আর একটি ভয়ঙ্কর কুসংস্কারের উদাহরণ। ভারতের নবজাগরণের অগ্রদূত রাজা রামমোহন রায়ের লড়াইয়ের মাধ্যমে সতীদাহ প্রথা অবলুপ্তির আইন পাস হয়। সামাজিক দায়ভার থেকে মুক্ত হবার জন্য মাত্র কম বয়সী শিশুকন্যার সঙ্গে অশীতিপর বৃদ্ধের বিবাহ দেওয়া হত। এই প্রথা সমাজে পরিচিত ছিল গৌরীদান হিসাবে। ১৮৫০ সালে বিদ্যাসাগর তাঁর বন্ধু ও শিক্ষাবিদ মদনমোহন তর্কালঙ্কারের সঙ্গে যৌথ ভাবে প্রকাশ করেন ‘সর্ব্বশুভকরী পত্রিকা’। তার প্রথম সংখ্যায় ‘বাল্য বিবাহের দোষ’ নামক একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করা হয়। গৌরীদান প্রথার সব থেক বড় কুফল ছিল স্বল্প বয়েসে বিধবা হয়ে যাওয়া নারীদের উপর সমগ্র সমাজের অবর্ণনীয় অত্যাচার। এই অত্যাচার থকে মুক্তি পেতে একপ্রকার বাধ্য হয়েই বা কুচক্রের জালে ফেঁসে গিয়ে স্বল্পবয়স্ক বিধবারা দেহব্যবসার পথ বেছে নিতেন।

১৮৫৩ সালে কলকাতায় প্রায় ১২৭০০ বারবণিতা ছিল বলে জানা যায়। মাতৃরূপে নারীই সমস্ত সমাজের ধারক ও বাহক। বিদ্যাসাগর উপলব্ধি করেন যে এই বিধবাদের আবার বিবাহের মাধ্যমেই সমস্ত বাঙালি সমাজকে গড্ডলিকা প্রবাহের কলুষিত অন্ধকার থেকে দেদীপ্যমান আলোকবর্তিকায় নিয়ে আশা সম্ভব। বিদ্যাসাগর বিধবা বিবাহের জন্য আইন পাসের প্রস্তাব দিলে রাজা রাধাকান্ত দেবের বিরোধিতা করে ধর্মসভা আহ্বান করেন। সংস্কৃত পন্ডিত শাস্ত্রবিদ জ্ঞানী বিদ্যাসাগর সেই ধর্মসভায় প্রাচীন ভারতীয় দর্শন সাহিত্য ব্যাখ্যা করে প্রমাণ করেন যে বিধবা বিবাহ শাস্ত্র সম্মত। ধর্মসভায় বিধবা বিবাহের পক্ষে বিদ্যাসাগর যা স্বাক্ষর সংগ্রহ করেন তার থেকে বিধবা বিবাহের বিরুদ্ধাচারণকারীদের সংগৃহীত স্বাক্ষরের পরিমাণ ছিল চারগুণ অধিক। তাও লর্ড ডালহাউসির হাত ধরে ১৮৫৬ সালের ২৬ জুলাই পাস হয় হিন্দু বিধবাদের পুনর্বিবাহ আইন।

এহেন মহান মানুষ বিদ্যাসাগরের সম্মান বর্তমান পশ্চিমবঙ্গে ভূলুণ্ঠিত। নারী মুক্তির মাধ্যমে সমাজের উন্নতির যে দিশা বিদ্যাসাগর দেখিয়ে গেছেন তাকে সম্পূর্ণ রূপে অগ্রাহ্য করে চলেছে পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেসের সরকার। সাম্প্রতিক অতীতের কিছু ঘটনার বিশ্লেষণ করলে এই কথা সহজেই বোঝা যায়। পার্ক স্ট্রিট ধর্ষণ কাণ্ডের পরের দিনই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যেভাবে এই কাণ্ডকে ‘সাজানো ঘটনা’ বলে আখ্যায়িত করেন এবং অপরাধীকে আড়াল করবার চেষ্টা করেন তার মাধ্যমে নারীদের প্রতি সরকারের উদাসীনতা স্পষ্ট হয়ে যায়। পরবর্তীকালে তদন্ত করে কৃতি মহিলা আইপিএস অফিসার দময়ন্তী সেন প্রকৃত অপরাধীকে গ্রেফতার করলে তাকে শাসকের রোষানলে পড়তে হয়। এ’রাজ্যে সুদক্ষ আইপিএস অফিসারদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা হয়। আবার দরকার ফুরিয়ে গেলে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে বাধ্য করা হয় পুলিশের চাকরি থকে অব্যাহতি নেওয়ার জন্য। কামদুনির ঘটনায় তৃণমূল কংগ্রেস তথা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল কিভাবে বর্বর মানসিকতার পরিচয় দিয়েছে তা কারো কাছে অজানা নয়।

পশ্চিমবঙ্গের মানুষ ২০১১ সালে একজন নারী মুখ্যমন্ত্রীকে নির্বাচিত করেন বামফ্রন্টের ৩৪ বছরের অপশাসনের অবসান ঘটিয়ে। তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে বাংলার মানুষ নারী সমাজের যে উন্নতির আশা করেছিলেন তা রাখতে তৃণমূল কংগ্রেসের সরকার সম্পূর্ণ রূপে ব্যর্থ। স্কুল ছত্রীদের সাইকেল দান করলেই যে সামাজিক উন্নতি হয় না তা আজ স্পষ্ট হয়ে গেছে। স্কুল পাশ করে কলেজে ভর্তি হবার ক্ষেত্রে তৃণমূল ছাত্র পরিষদের বিপুল দুর্নীতির শিকার হতে হচ্ছে সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের। স্বল্প সংখ্যক কলেজ ও লাগাম ছাড়া দুর্নীতির কারণে অনেকেই বঞ্চিত হচ্ছে উচ্চ শিক্ষার সুযোগ থেকে। সরকারি চাকরিতে স্বজনপোষণ ও দুর্নীতির কারণে যে সমস্ত ছাত্রীরা স্কুলে পড়বার সময় সাইকেল পেয়েছিল তাদের বর্তমানে নিজেদের উপার্জনে একটি সাইকেল কেনার ক্ষমতাও তৈরি হয়নি।

ভারতবর্ষের মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শ্রী অমিত শাহ’জীর মিছিলের সময় বিদ্যাসাগর কলেজর ভিতর থেকে তাকে আক্রমণ করা হয় এবং কলেজের ভিতর ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের আবক্ষ মূর্তি ভাঙচুর করা হয়। আজও প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করে শাস্তি দিতে পারেনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস সরকার ও দলদাসে পরিণত হওয়া পুলিশ প্রশাসন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তথা তৃণমূল কংগ্রেস ইচ্ছাকৃতভাবে বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভেঙে বিজেপিকে কালিমালিপ্ত করবার বৃথা চেষ্টা করছিল। যে পুলিশ রাজনৈতিক হিংসায় বলি হওয়া বিরোধী দলের নিরীহ কর্মীদের খুনের কিনারা করতে ব্যর্থ হয়, সেই পুলিশই বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙার অপরাধীদের চিহ্নিত করার সৎসাহস দেখাবে একথা নিতান্তইই হাস্যকর। তাই ধরাই যায় যে প্রকৃত অপরাধী তৃণমূল কর্মীদের আড়াল করতেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশে পুলিশ আজ নিষ্ক্রিয়।

আরও পড়ুন:রাষ্ট্রবাদী বাংলা চান ভাগবত…..

বাংলা ভাষা শিক্ষার প্রবাদ প্রতিম শিক্ষক বিদ্যাসাগরের পশ্চিমবঙ্গে আজ বাংলা ভাষা ব্রাত্য। তৃণমূল সরকারের ভ্রান্ত শিক্ষা নীতি শুধুমাত্র বাংলা ভাষার গরিমাকেই খর্ব করছে না, তার সঙ্গে অপমান করছে বাংলা ভাষার দিকপাল সমস্ত মানুষকে। ফলে পশ্চিমবঙ্গের মানুষের উচিত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন দুর্নীতিগ্রস্থ ও সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কাণ্ডারি তৃণমূল কংগ্রেসের সরকারকে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে অপসারিত করে প্রকৃত ভারতীয় সংস্কৃতির ধারক ও বাহক বিজেপিকে বেছে নেওয়া। তাহলেই ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মতো মহান মানুষের নাম পুনরায় সসম্মানে গর্বের সঙ্গে অনুরণিত হবে সমগ্র পশ্চিমবঙ্গে ও পশ্চিমবঙ্গের নেতৃত্বে আসমুদ্র হিমাচলে। একমাত্র বিজেপির মতো সর্বভারতীয় দলের পক্ষেই সম্ভব পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে পুনরুদ্ধার করার। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিজীর নেতৃত্বে ভারতব্যাপী যে অখন্ড উন্নয়নমূলক ও সংস্কার সাধনকারী অসীম কর্মযজ্ঞ চলছে তাতে আমাদের পশ্চিমবঙ্গের যোগদান আশু প্রয়োজন। কিন্তু রাজ্যে যতদিন তৃণমূল নামক উন্নয়ন বিরোধী, সংস্কার পরিপন্থী, রাজনৈতিক হিংসাকামী ও বিচ্ছিন্নতাবাদী সরকার থাকবে ততদিন পশ্চিমবঙ্গের উত্থান সম্ভবপর নয়। আগামী দুর্গোৎসবের আগে মায়ের কৃপায় ও আপনাদের সকলের আশীর্বাদে পশ্চিমবঙ্গে নিশ্চয় প্রকৃত পরিবর্তনের জোয়ার আনা সম্ভব হবে বলেই আমার দৃঢ় বিশ্বাস।

(লেখক বঙ্গ বিজেপি সভাপতি)

Related Articles

Back to top button
Close