fbpx
অন্যান্যঅফবিটপশ্চিমবঙ্গহেডলাইন

পূর্ণ হল তাঁর দ্বিশতজন্মবর্ষ…..

মনীষা ভট্টাচার্য: পশ্চিম মেদিনীপুরের বীরসিংহ গ্রামে ১৮২০ সালে জন্মালেন আগামী বাংলার অন্যতম রূপকার, সমাজ সংস্কারক, শিক্ষাবিদ, গদ্যকার ঈশ্বরচন্দ্র। বীরসিংহ গ্রামে কালীকান্ত চট্টোপাধ্যায়ের পাঠশালায় শুরু হয় তাঁর শিক্ষালাভ। এই পাঠশালা ছিল তাঁর বাড়ির পাশেই। সেই পাঠশালা ১৯২৯ সালে ‘বীরসিংহ বিদ্যাসাগর প্রাথমিক বিদ্যালয়’-এ পরিণত হয়েছে। এই পাঠশালায় শিক্ষা শেষে গ্রামের বাড়ি ছেড়ে ঈশ্বরচন্দ্র চললেন কলকাতার উদ্দেশ্যে। অবিভক্ত মেদিনীপুর থেকে পায়ে হেঁটে বাবার সঙ্গে কলকাতায় এসে ওঠেন বড়বাজারের সিংহ বাড়িতে। ভর্তি হন সংস্কৃত কলেজে। এই পদব্রজেই তিনি অর্জন করেন মাইলস্টোনের অভিজ্ঞতা। আজও ঘাটাল মহকুমা থেকে বীরসিংহের পথে গেলে মাইলস্টোন দেখতে পাওয়া যাবে। সেই মাইলস্টোন ধরে আমাদের এগিয়ে চলা ঈশ্বরচন্দ্রের বাড়ির দিকে। গন্তব্যে পৌঁছে দেখি বিদ্যাসাগরের বাড়ি সংরক্ষণের পরে নাম হয়েছে ‘বিদ্যাসাগর স্মৃতিমন্দির’। স্মৃতিমন্দির যাবার পথে বা-হাতে পড়বে লাইব্রেরী, ঠাকুরদাস মঞ্চ, ডাকঘর আর ডান দিকে রয়েছে প্রাথমিক বিদ্যালয়। স্মৃতিমন্দিরের তত্ত্বাবধায়ক দিলীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছ থেকে জানা গেল নানা তথ্য।

বিদ্যাসাগরের আদিবাড়ি যা আজ বিদ্যাসাগর স্মৃতিমন্দির।

আরও পড়ুন:পুলিশের নিরপেক্ষ তদন্তের অভাবে মাদকের রমরমা ব্যবসা নিয়ে রাজ্যকে সতর্ক হাইকোর্টের

সমাজে যাতে সকলে শিক্ষিত হয়, বিশেষ করে মেয়েরা, সেই উদ্দেশ্যেই ঈশ্বরচন্দ্র লিখেছিলেন বর্ণপরিচয়। বাংলা বর্ণ শেখার একমাত্র বই বর্ণপরিচয়। আজও যাঁরা বাংলা শিখতে চান তাঁদের জন্য প্রাথমিকভাবে অবশ্যই প্রয়োজন এই বই। ১৮৫৫ সালে এই বইয়ের দুটি ভাগই প্রকাশিত হয়।

–বিদ্যাসাগর স্থাপিত বীরসিংহ ভগবতী বিদ্যালয়।

১৬৫ বছর ধরে এই বইয়ের জনপ্রিয়তার কারণ কী? প্রথম, বাংলা বর্ণমালা শেখার উৎকৃষ্ট বই এটি। দ্বিতীয়, এই বই থেকে ছোটরা সহজবোধ্য ছোট ছোট বাক্যের মধ্য দিয়ে বর্ণের ব্যবহার এবং বর্ণ দিয়ে শব্দ কিভাবে বানাতে হয় তা শিখতে পারে। তৃতীয়, বাক্যের মধ্যে যে দাড়ি, কমা অর্থাৎ যতিচিহ্ন ব্যবহার করা হয় তার ধারণাও এই বই থেকে করা যায়। এই তিনটি কারণ ছাড়াও এই বইয়ে পাওয়া যায় ধর্ম বর্জিত, সংস্কৃত ভাষার জটিলতাবিহীন সরল সাহিত্যরস। বর্ণপরিচয় যখন প্রকাশিত হয় তখন রাধাকান্ত দেব রচিত ‘বাঙ্গালা শিক্ষাগ্রন্থ’, স্কুল বুক সোসাইটি প্রকাশিত ‘বর্ণমালা প্রথম ভাগ’, ‘বর্ণমালা দ্বিতীয় ভাগ’, ক্ষেত্রমোহন দত্ত রচিত ‘শিশুসেবধি’ প্রভৃতি বই মানুষের হাতে ছিল। কিন্তু সেই সব বইকে ছাপিয়ে আজও বিপুল জনপ্রিয় ‘বর্ণপরিচয়’। তথ্য বলছে, ১৮৫৫ সালের এপ্রিল মাসে বর্ণপরিচয় প্রথম ভাগ এবং ওই বছরেই জুন মাসে প্রকাশিত হয় এর দ্বিতীয় ভাগ। জানা যায় , মফস্বলে স্কুল পরিদর্শনে যাওয়ার সময় এই বইয়ের পাণ্ডুলিপি তিনি তৈরি করেন।

আবক্ষ মূর্তিতে জননী ভগবতী দেবী ও পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ।

প্রসঙ্গত বলে রাখা ভালো, ১৮৪৭ সালে ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ও মদনমোহন তর্কালংকার উভয়ের উদ্যোগে এবং বাবু নীলমাধব মুখোপাধ্যায়ের থেকে ৬০০ টাকা ঋণ করে সংস্কৃত প্রেস ও ডিপোজিটারী স্থাপিত হয়। এই প্রেসের প্রথম মুদ্রিত বই ভারতচন্দ্র রায়ের ‘অন্নদামঙ্গল’। নিজস্ব বই প্রকাশের সঙ্গে সংস্কৃত প্রেস ও ডিপোজিটরীতে অন্যান্য লেখক ও প্রকাশকদের বইও বিক্রি করা হত। পরবর্তীতে বিদ্যাসাগর এই প্রেস রাজকৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায়, কালীচরণ ঘোষকে বিক্রি করে দেন। শুধু বর্ণপরিচয় নয়, তিনি রচনা করেছেন অনেক কিছুই। তাঁর সকল রচনা নিয়ে দুখণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে ‘বিদ্যাসাগর রচনাবলী’। এই বইয়ের খোঁজ পাওয়া গেল পশ্চিম মেদিনীপুরের বীরসিংহগ্রামে অবস্থিত রুরাল লাইব্রেরি থেকে। ১৯৬১ সালে ‘বীরসিংহ বিদ্যাসাগর মেমোরিয়ল হল রুরাল লাইব্রেরি’ স্থাপিত হয়। আগে এটি বিদ্যাসাগর স্মৃতিমন্দিরের সঙ্গে যুক্ত ছিল।

 

মাইলস্টোনের প্রতি ছিল তাঁর অগাধ বিস্ময়।

বিদ্যাসাগর শিক্ষার আলোয় মানুষকে আলোকিত করতে চেয়েছিলেন। শিক্ষা মানুষকে কতটা চিন্তাশীল করে তুলতে পারে তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ বোধহয় তিনি নিজেই। ল্যাম্পপোস্টের আলোয় যিনি পড়াশোনা করেছেন, তিনিই ভবিষ্যত প্রজন্মের কথা ভেবে নিজের গ্রামে ১৮৫৩ সালে তৈরি করেছিলেন তিনটি স্কুল।

অ-অজগর আসছে তেড়ে। আ-আমটি আমি খাব পেড়ে।।

সেই সময় বীরসিংহ গ্রামের রামধন চক্রবর্তীর কাছ থেকে তিনি প্রায় ২ একর কী তারও একটু বেশি জমি কিনেছিলেন। সেই জমিতেই ১৮৫৩-তে তিনি মধ্য বাংলা ইংরেজি স্কুল, গালর্স স্কুল এবং রাখাল বিদ্যালয় (নাইট স্কুল) চালু করেন। কিন্তু দশ বছরের মধ্যে গালর্স স্কুল ও রাখাল বিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যায়। চলতে থাকে মধ্য বাংলা ইংরেজি স্কুল। তবে সেই সময় ম্যালেরিয়ার প্রকোপ প্রায় মহামারীর আকার নেয়, তাই ছাত্র সংখ্যা কমতে থাকে এবং এক সময় বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে ১৮৯০ সালে এই স্কুলটিকে ভাই শম্ভুচরণ বিদ্যারত্নের সাহায্যে বিদ্যাসাগরমশাই পুনরায় চালু করেন। মায়ের নামে নাম দেন বীরসিংহ ভগবতী বিদ্যালয়। দুঃখের বিষয় এই স্কুলের পুনর্জন্মের পরের বছরই তিনি মারা যান।

দু খণ্ডে বিদ্যাসাগর রচনাবলী।

বর্তমানে এই স্কুলের সহশিক্ষক হরগোবিন্দ দলুই জানালেন, এই স্কুলের পুরনো ইতিহাসের কথা। ১৮৯১ সালে ঈশ্বরচন্দ্রের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র নারায়ণচন্দ্র বিদ্যারত্ন এই স্কুলকে বন্ধ করে দেবার অনেক চেষ্টা করেছিলেন। বিদ্যাসাগরমশাই তাঁর উইলে এই স্কুলের জন্য প্রতি মাসে ধার্য করেন ১০০ টাকা। নারায়ণচন্দ্র সবার প্রথম সেটা বন্ধ করেন। বিদ্যাসাগর তাঁর একমাত্র ছেলেকে ত্যাজ্য করেছিলেন, তাই উইলে তাঁর কোনও প্রাপ্য ছিল না। কিন্তু পরবর্তীতে আইনি সহায়তায় তিনি তাঁর সকল পৈত্রিক সম্পত্তিই পেয়েছিলেন।

বীরসিংহ বিদ্যাসাগর মেমোরিয়াল হল রুরাল লাইব্রেরি।

যাই হোক, হরগোবিন্দবাবুর ভাষায়, নারায়ণচন্দ্র স্কুলের টাকা বন্ধ করলে আইনি সহায়তাতেই তা আবার চালু হয়। ১৮৯০-এ যে স্কুলের প্রতিষ্ঠা, সেই স্কুল পরের বছরই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন পায়। এখন স্কুলের প্রতিটি বাড়িই পাকা বাড়। কিন্তু শুরুর দিকে মাটির বাড়িই ছিল। অনেক বছর পর ১৯৭১ সালে, বিদ্যাসাগরের সার্ধশতবর্ষে বীরসিংহ গ্রামে পুনরায় বিদ্যাসাগরের সেই গালর্স স্কুলটি চালু হয়।

আরও পড়ুন:রাষ্ট্রবাদী বাংলা চান ভাগবত

কলকাতায় বাদুরবাগানের এই বাড়ি আজ মিউজিয়াম।

তাঁর সম্বন্ধে লিখে শেষ করা যাবে না। তার নাম আজকের প্রজন্ম জানে বটে, তবে কেমনভাবে জানে, কতটা জানে,কী কী কারণে জানে তা জানা নেই। আজ পূর্ণ হল তাঁর দ্বিশতজন্মবর্ষ। ‘বিদ্যারসাগর তুমি বিখ্যাত ভারতে, করুণার সিন্ধু তুমি সেই জানে মনে। দীন যে দীনের বন্ধু উজ্জ্বল জগতে, হেমাদ্রীর হেমকান্তি অম্লান কিরণে’- মাইকেলের এই শব্দগুলিই হোক এই পূণ্যক্ষণের তর্পণ মন্ত্র।

Related Articles

Back to top button
Close