fbpx
অফবিটপশ্চিমবঙ্গহেডলাইন

পালিত হল জামাইষষ্ঠী, ব্রাত্য থেকে গেল দূরের জামাইরা

অমিত দাস , নদিয়া ( করিমপুর) : জামাইকে নিয়ে বাঙালীর একটা বড়ো আবেগের জায়গা আছে। আর আবেগের এই জায়গাটাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে জামাইষষ্ঠীর আয়োজন, উৎসব। রসিক বাঙালী খাওয়া দাওয়া নিয়ে বেশ সচেতন। সেই সঙ্গে বিভিন্ন রকমের, বিভিন্ন স্বাদের আয়োজন করা বাঙালীর রন্ধ্রে রন্ধ্রে। এই জামাইষষ্ঠী নিয়ে অনেক গালগল্পও আছে। এই দিনটি যে জামাইবর্গের একটি বিশেষ দিন, এ নিয়ে সন্দেহ নেই।

 

জৈষ্ঠ্য মাসের প্রখর রোদ গরমে পাকা আম আর কাঁঠালের গন্ধ নিয়ে এক বিশেষ দিনে উপস্থিত হয় জামাইষষ্ঠী। বটগাছের নীচে ঠাকুর মশাইকে ঘিরে ধরে বিবাহিত মেয়ে বউদের ভীড় জমে ষষ্ঠী তলায়। গাছে ঘষা পাকা আমের গন্ধে ম ম করে চারদিক। আর এই পাকা আমের গন্ধই হলো জামাইষষ্ঠীর প্রতীক। বাঙালীর শাড়ি আর পাঞ্জাবিতে একরকম উৎসবের পরিবেশ তৈরি হয় এই দিনে। কাছের দূরের যে যেখানেই থাকুক না কেন সব জামাইরাই এদিন শ্বশুরবাড়িতে বেশ গদগদ ভাবে হাজির হয়। কিন্তু এবারের জামাইষষ্ঠী জামাইদের পক্ষে মোটেই সুখকর হলো না।

 

 

করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ আর লকডাউনের মধ্যেও কিন্তু থেমে থাকল না জামাইষষ্ঠীর উৎসব আয়োজন। এবছর অবশ্য বেশ খানিকটা ম্লান হলো জামাইষষ্ঠীর বাজার। কারন করোনার মতো ভাইরাসের তো আর লকডাউন নেই। তাই সামাজিক দুরত্ব বজায় রেখেই সামান্য আয়োজন করতে পিছু পা হলেন না বাঙালী সমাজের শ্বশুরগন। কিন্তু তাতে ব্রাত্যই থেকে গেলেন দূরের জামাইরা। এইসময় যোগাযোগ ব্যবস্থার যা হাল তাতে করে খুব প্রয়োজন না হলে তেমন আত্মীয় স্বজন অন্যের বাড়িতে আসছেন কম। আসতে গেলেই লাগছে প্রশাসনের পারমিশন।

 

 

এমতাবস্থায় বাড়ির কাছাকাছি জামাইদের তেমন অসুবিধেই পড়তে হয়নি। তারা সহজেই বাইক করে বা ছোটোখাটো যানবাহন করে চলে এসেছেন শ্বশুরবাড়িতে। কিন্তু দূরবর্তী জামাইদের মুখ ভার। তারা না আসতে পেরে খানিক মনঃকষ্টেই দিনটা নিজেদের বাড়িতে বসেই উপভোগ করছেন। তবে তাতে কি আর মন স্থির থাকে। বারবারই শ্বশুরবাড়ির কথা মনে পড়ছে। কেউ কেউ এদিন সকালেই শ্বশুরবাড়িতে ফোন করে প্রনাম জানিয়ে ভালো জামাইয়ের কাজটি করে নিলেন , কেউ বা সবার কুশল জিজ্ঞেস করেই খোঁজ নিলেন আর অন্য জামাইদের উপস্থিতির খবর।

 

 

জামাইষষ্ঠীর দিন বাড়ির কর্তাদের যেমন সকাল থেকেই বাজার করার ধুম লেগে যায় তেমন গিন্নিরাও সকাল থেকেই ব্যস্ত হয়ে পড়েন হেঁসেল ঠেলতে। বড়ো বড়ো বাজারের থলে ভরে ওঠে সেরা সেরা মাছ মাংস আম আর সঙ্গে বাঙালীর আর এক আবেগ দই মিষ্টিতে। কিন্তু এবছর বাজারে তেমন জৌলুস নেই৷ শ্বশুরদের বাজারের থলের সংখ্যাও কমে গেছে। লকডাউনের বাজারে একদিকে জনজীবন ব্যহত , ব্যবসা বানিজ্যে পড়েছে টান , অন্যদিকে দূরের জামাইবাবাজীরাও আসতে পারছেন না এবছর। তাই বাজারের থলের এই হাল বলে জানান শ্বশুরমশাইরা।

 

 

ওদিকে দূরদেশে থাকা জামাইরা আগেই জানিয়ে দিয়েছেন, এবছর তারা আসতে পারছেন না। দেশের যা অবস্থা তাতে জামাইষষ্ঠী কেন আরও অনেক উৎসব অনুষ্ঠানই হয়তো এবছর হবে না বলে মনে করা হচ্ছে। তবে এদিন বাড়ির কাছে বা অনতিদূরে থাকা জামাইরা কিন্তু চলে এসেছেন জামাইষষ্ঠী পালন করতে। সাড়ম্বরে পালিত না হলেও যতটুকু পারা যায় তার আয়োজনে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন শ্বশুর শাশুড়ি , বাড়ির অন্যান্যরা। তবুও শ্বশুর শাশুড়ির মনটা ভারাক্রান্ত। দূরের জামাইরা আসতে পারেনি। সবাই এলে বাড়ি ভরে উঠত সবার উপস্থিতিতে। নাতি নাতনিদের হইচইএ বাড়িতে এক উৎসবের পরিবেশ তৈরি হতো। এবছর সেসব কিছুই হলো না।

 

 

করোনা সংক্রমণ আর লাগাতার লকডাউনে প্রভাব পড়েছে সবকিছুর উপরেই। বন্ধ হয়েছে সমস্ত সামাজিক অনুষ্ঠান। জামাইষষ্ঠীর অনুষ্ঠানও যে ম্লান হয়ে যাবে তার আশঙ্কা করেছিলেন সবাই। কিন্তু যেদিনটা জামাইয়ের একান্ত সন্মান আর আনন্দের ছিল সেটাও আজ তার জৌলুস হারালো। এই আনন্দ আর বিশেষ পার্বণের বাইরেই থেকে গেলেন দূরে থাকা জামাইরা। আসলে বর্তমান ব্যস্ত জীবনের এই পার্বণগুলোই তো আমাদের একঘেয়েমি কাটাই , স্বস্তি দেই ভারাক্রান্ত মনের জাল থেকে। তাই বাঙালীর জামাইরাও অপেক্ষা করে থাকে তাদের এই বিশেষ দিনটিতে একসঙ্গে মিলে জীবনের অন্য স্বাদ গ্রহনের জন্য। তাই হাজার কাজ আর দায়িত্ব কর্তব্যের মধ্যেও এই দিনটি তাদের বেশ স্বস্তির। কিন্তু দিনটি আর এবছরের মতো পেলেন না বাড়ি থেকে দূরে থাকা জামাইরা। তাই অনেকে ফোনে আবার কেউ ভিডিও কলিংয়ের মাধ্যমে সেরে নিচ্ছেন জামাইষষ্ঠী।

 

 

পৃথিবী আবার কবে সুস্থ হবে , আবার কবে স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাবে তা আমরা কেউ জানি না। তবে আলোর দিনের খোঁজে রয়েছে গোটা পৃথিবী। একদিন ঠিক অন্ধকার কেটে যাবে। বেরিয়ে আসবে আলোর দ্যুতি। এই আশাতেই দিন কাটছে সকলের। তাই দূরে থাকা জামাইদের মঙ্গল কামনা করলেন শাশুড়িরা। জামাইষষ্ঠীর এই শুভক্ষণে সব জামাইরা যাতে সুস্থ থাকে তার চেষ্টাতেই কেটে গেল তাদের গোটা একটা দিন।

Related Articles

Back to top button
Close