fbpx
পশ্চিমবঙ্গহেডলাইন

পিৎজা, বার্গারের কাছে হারিয়ে গিয়েছে জিলিপি ফলের স্বাদ

ভাস্করব্রত পতি, তমলুক : কেউ বলেন বাঁকড়ি বাদাম, কেউবা জিলিপি ফল। গ্রামবাংলার অতি পরিচিত এই ফল এবং তার গাছ এখন ক্রমশঃ দুর্লভ হয়ে পড়ছে। অথচ গ্রামাঞ্চলে ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের কাছে একসময় এটি ছিল অন্যতম প্রধান খাদ্যদ্রব্য। অন্যতম আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। দিনবদলের সাথে সাথে হারিয়ে গেছে চঞ্চলমতি শৈশব। হারিয়ে গেছে গ্রামবাংলার মনিমুক্তোগুলো।

 

 

এটির আসল নাম ‘ম্যানিলা ট্যামারিণ্ড’ বা ‘ম্যানিলা তেঁতুল’। কিন্তু টক নয়। মিস্টি। তবে এই নামের সাথে ম্যানিলার সম্পর্ক থাকলেও অন্য কোনও সংস্পর্শ নেই। মেক্সিকোতে এর আদি বাসস্থান। সেখানে একে বলে ‘গুয়ামুছি’, ‘হুয়ামুছিল’ এবং ‘কুয়ামুছিল’। কলম্বিয়াতে বলে ‘চিমিনানগো’। পুয়ের্তো রিকোতে পরিচিত ‘গুয়ামা অ্যামেরিকানো’ এবং ‘পিনজান’ নামে।

 

 

একে ‘ম্যাড্রাস থর্ন’ বা ‘কামাচিলি’ও বলে। কুয়েতে বলে ‘শওকত ম্যাড্রাস’। ‘শওকত’ এর অর্থ ‘থর্ন’। অর্থাৎ ‘ম্যাড্রাস থর্ন’। দক্ষিণ আমেরিকা, মধ্য আমেরিকা এবং মেক্সিকো এলাকায় ‘ফ্যাবেসি’ গোত্রের এই বাসিন্দা গাছটি কিভাবে ভারত সহ দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলোতে এলো তা অবশ্য এখন আর জানার সম্ভাবনা কম। তবে ব্যবসায়িক যোগাযোগের কারনে কোনোভাবে কোনো ফলরসিকের হাত ধরে এই গাছের বীজ এসে গিয়েছিল এদেশে। মন জয় করে নিয়েছিল শিশু কিশোর থেকে মায় বয়স্কদেরও।

 

 

তেলুগুতে বলে ‘সীমা চিন্তাকায়া’, ‘সুইট ইঙ্গা’, তামিলে ‘কোডুক্কাপ্পুলি’ বা ‘কোডিক্কাই’, কন্নড়ে বলে ‘ইলাইচি কাই’, ‘সীমি হুনাসে’, গুজরাটিতে ‘বাখাই আম্বলি’ বা ‘গোরাস আম্বলি’ , হিন্দিতে বলে ‘সিঙ্গরি’, ‘বিলায়তী ইমলী’, ‘গ্যাঞ্জেস ট্যামারিণ্ড’, মারাঠীতে বলে ‘ফিরঙ্গী চিঁচ’, সিন্ধ্রিতে ‘আচ্ছি গিডামিরি’, ওড়িয়াতে ‘সীমা কাইয়ান’, উত্তরপ্রদেশে এবং পাকিস্তানে একে বলে ‘জঙ্গল জলেবি’। এর বিজ্ঞানসম্মত নাম হলো Pithecellobium dulce।

 

 

এই ধরনের গাছ খরা সহায়ক। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৫০০ মিটার উঁচুতেও বহাল তবিয়তে জন্মায়। মোটামুটি ৩৩-৪৯ ফুট লম্বা হয়। পুরো গাছটায় কাঁটা ভর্তি। এর ফলটা খুব সুদৃশ্য এবং লালচে। আশিষ কুমার ঘোষ জানান, ‘আমান্নে কইথাই কাঁটা ঝিলিপির গাছ। পাকলে খাইতে ভালা লাগথায়। মোর ঘরে থাইলা’।

 

 

 

একসময় বিভিন্ন পার্কে, স্কুল ও রেলস্টেশন চত্বরে প্রচুর দেখা মিলতো। এখন এইসব গাছ আর দেখা যায়না। মেছেদা রেলস্টেশন সংলগ্ন এলাকায় এই জিলিপি ফলের গাছ অনেক রয়েছে। হুগলীর সোমরা বাজারের কাছে গঙ্গার চর -‘সবুজ দ্বীপ’ আছে । সেখানে অসংখ্য জিলিপি ফলের গাছ আছে। রূপনারায়ণের পাড়েও কিছু গাছ এখনও আছে।

 

 

আজ থেকে ২৫-৩০ বছর আগে যত্রতত্র দেখা গেলেও এখন কমে গিয়েছে। ইতিমধ্যেই এই ফলটির বিশেষত্ব নিয়ে স্মৃতি রোমন্থন করা হয়েছে জনপ্রিয় ফেসবুক গ্রুপ ‘আমারকার ভাষা আমারকার গর্ব’তে। শিক্ষক সুদীপ খাঁড়া বলেন, ‘আসলে মানুষ এ ধরনের গাছের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করতে পারেনি। তাই এর বংশবিস্তারের উদ্যোগ নেওয়ার চাহিদা নিয়ে মাথাব্যথা নেই কারোর’।

 

 

এই গাছের ফলের স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে স্বাগতা মিশ্র হোতা লিখেছেন ‘মুই সত্যিকার ঝিলাপির ঠুনু, ওউ ঝিলাপিটা খুব ভালাবাসি থাও’। অঞ্জনা মাইতির কথায় ‘মুই তো অখন ভি ঔ ঝিলাপি ফলটা খুঁজি বুলো। ছা বেলায় দমে খাই থাই’। সুজাতা করণ একে ‘কিচিমিচি ফল’ বলে উল্লেখ করেছেন। শিশির এস জানালেন ছোটবেলায় এই ফল পাড়ার মজার কাহিনী। তাঁর কথায় ‘গাছ গা অমন লম্বা হয় যে বিছানিয়া মুশকিল হি যায়। কোনো কোনো দিন আধ ঘন্টা ধরি ডিল মারি বি খালি মুহে ঘুরি আসতে হিতায়’।

 

 

সামনেই ৫ ই জুন। বিশ্ব পরিবেশ দিবস। প্রকৃতিপ্রেমীদের দাবি সরকারের উচিত এইসব প্রায় উধাও হতে বসা গাছগুলোকে যত বেশি সম্ভব উৎপাদন করা এবং বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে বিতরণ করা। আমফান ঝড়ঝঞ্ঝাতে অনেক গাছ নষ্ট হয়েছে। এই জিলিপি ফলের গাছ কিন্তু ঝড় কেটে টিকে থাকতে পারে।

 

 

 

বনদপ্তরও এইসব গাছের চারাগাছ তৈরি করে না। অথচ রাস্তার পাশে এরকম গাছ ‘ওরনামেন্টাল প্ল্যান্ট’ হিসেবে লাগানোই যেতো। একদিকে যেমন সৌন্দর্য বৃদ্ধি হোতো, অন্যদিকে জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সহায়ক হোতো। ছোটবেলায় এই ফল খাওয়ার কথা স্মরণ করেছেন শ্যামল কুমার, প্রবালকান্তি বাড়ি, জয়া পতি পানিগ্রাহী, মুরারী রাণা, সঙ্গীতা গিরি, মনোজ দোলাইরা। তবে এখন সচরাচর আর মেলেনা। তাছাড়া পিৎজা, বার্গার, বিরিয়ানি, চিকেন চাপে মজে থাকা বর্তমান প্রজন্মের চোখে এইসব ফলগুলো এখন যেন প্রাগৈতিহাসিক যুগের কোনো ডাইনোসরের ডিম।

Related Articles

Back to top button
Close