fbpx
ব্লগহেডলাইন

মারণ সময়ে রবীন্দ্রনাথেই জিয়নকাঠির খোঁজ জ্বলদর্চি’র

শান্তনু অধিকারী, সবং: সময়ের এখন গভীর অসুখ। বিপর্যস্ত বিশ্বের আনাচে কানাচে জমছে মৃত্যুর হাহাকার। তবু অনন্তকে জাগিয়ে রাখার প্রয়াস আজও অব্যাহত। সেই প্রয়াসেই সামিল হল এবার মেদিনীপুরের অন্যতম মাসিক অনুপত্রিকা ‘জ্বলদর্চি’। তাদের সেই প্রয়াসের অবলম্বন হলেন রবীন্দ্রনাথ। কথায় বলে, জীবনের যে কোনও সংকটে বাঙালি রবীন্দ্রনাথেই খোঁজে পরিত্রাণ। তার ওপরে বাঙালির ক্যালেন্ডারে ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে রবীন্দ্রমাস। তাই ‘জ্বলদর্চি’র সম্প্রতি প্রকাশিত হওয়া চলতি মাসের ‘এই সময় ও রবীন্দ্রনাথ’ সংখ্যাটি কেবল রবীন্দ্রস্মরণেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। বরং এই কঠিন সময়ে রয়েছে রবীন্দ্রদর্শনে জীবনবোধের আশ্চর্য অন্বেষণ। সভ্যতার সংকটে আঁকা হয়েছে মানবতার বিজয়পথ। যে পথের সারথী একমাত্র তিনিই! তিনি রবীন্দ্রনাথ।

‘জ্বলদর্চি’র এই সংখ্যায় সর্বমোট ৩৮ জন লেখক তাঁদের নিজস্ব অনুভূতি দিয়ে এই সংখ্যায় স্মরণ করেছেন রবীন্দ্রনাথকে। প্রত্যেকেরই চেতনায় ধরা পড়েছে জীবনবোধ। মহাসংশয়ের মহাসমুদ্রে ভাসতে ভাসতে তাঁরা সকলেই তরী ভিড়িয়েছেন রবি ঠাকুরেরই সৃষ্টির মহাবন্দরে। যেমন বছর সাতাত্তরের রবীন্দ্রগবেষক অমিত্রসূদন ভট্টাচার্য। তিনি এই কঠিন সময়ে রবীন্দ্রনাথের মধ্যেই খুঁজে নিয়েছেন শান্তি। চেয়েছেন আশ্রয়। এই সংকটের কালে তিনি যে কেবল রবীন্দ্রনাথই পড়ে চলেছেন, তাও জানাতে ভোলেননি তিনি তাঁর লেখাতে।

“যতবার ভয়ের মুখোশ তার করেছি বিশ্বাস/ততবার হয়েছে অনর্থ পরাজয়।” রবীন্দ্রনাথের এই শাশ্বত উচ্চারণেই অনুত্তম ভট্টাচার্য খুঁজেছেন এই সংকটের মুখোমুখি হওয়ার সাহস। রবীন্দ্রনাথেই ব্যক্ত করেছেন অচল বিশ্বকে সচল করে তোলার অভিপ্রায়। লেখক শংকর চক্রবর্তীর কাছে রবীন্দ্রনাথ আবার সকল সংশয়ের ওপর চিরকালীন আস্থার প্রলেপ। টাইটানিক ডুবে যাওয়ার পর এক খণ্ড কাঠকে আঁকড়ে বেঁচে থাকার প্রাণপন চেষ্টা করেছিলেন অভিনেত্রী ডারোথি গিবসন। লেখক অচিন্ত্য মারিকও তেমনই সংশয়ের এই ব্রাহ্মমুহূর্তে আঁকড়েছেন রবীন্দ্রনাথকেই।

আরও পড়ুন: ত্রাণ দিলেন, গড়লেন করোনা-তহবিল, বেনজির উদ্যোগ মোহাড় ব্রহ্মময়ী স্কুলের শিক্ষকদের

রাজর্ষি রায় তাঁর অনুভূতিতে ব্যক্ত করেছেন রবীন্দ্রনাথের গান ও কবিতায় সুন্দরের আরাধনা, যে সুন্দর সমস্ত প্রতিবন্ধকতাকে জয় করতে পারে। মঙ্গলপ্রসাদ মাইতির কাছে রবীন্দ্রনাথই ভরসা, অনেকখানি অন্ধকারে আলোর দীপশিখা। সঞ্জীব ভট্টাচাযের কাছে দুর্দিনে রবীন্দ্রনাথই রক্ষাকর্তা। সুকান্ত সিংহ আবার মৃত্যু আর বিচ্ছেদ পেরিয়ে আসা রবীন্দ্রস্পর্শের কথা বলেছেন। আশিস মিশ্র, প্রতাপ সিংহ, সুদর্শন নন্দী, মানব প্রামাণিক, শংকর চক্রবর্তী, রাখহরি পাল, রামকৃষ্ণ মহাপাত্র, রাকেশ সিংহ দেব প্রমুখ লেখকের সংবেদনশীল মনে রবীন্দ্রনাথ উঠে এসেছেন সংশয় জীবনের পরম অবলম্বন হিসেবে।

১৯৯৩ থেকে এক নাগাড়ে প্রকাশিত হয়ে চলেছে ‘জ্বলদর্চি’। তার বিরামহীন যাত্রাপথে এমন সংকটের মুখোমুখি সে হয়নি কখনও। ‘জীবনের প্রতি মুহূর্তেই রবীন্দ্রনাথ প্রাসঙ্গিক। নজিরবিহীন এই সংকটেও তাই রবীন্দ্রনাথকেই আঁকড়ে ধরেছি। আসলে বলা ভালো, রবীন্দ্রনাথের মাপকাঠিতে নিজেরাই নিজেদের মূল্যায়নে নেমেছি।’ এমনটাই জানালেন পত্রিকার সম্পাদক ঋত্বিক ত্রিপাঠী। তাঁর আরও সংযোজন, ‘রবীন্দ্রনাথকে কেবল নিজেদের আশ্রয় বানালেই হবে না, রবীন্দ্রনাথকে যথার্থ উপলব্ধির মাধ্যমে বাকি বিশ্বকেও ভরসা দিতে হবে আমাদের।’ এভাবেই চেনা দুঃখ চেনা সুখের ‘রবীন্দ্র সরণী’ ছুঁয়ে ফেলছে অতিমারির অচেনা বৃত্তকেও! এই বিপন্ন সময়কালে রবীন্দ্রনাথই জোগাচ্ছেন বেঁচে থাকার ও বাঁচিয়ে রাখার আশ্চর্য জিয়নকাঠি!

সময়ের দাবি মেনে স্বাভাবিকভাবেই বদলেছে ‘জ্বলদর্চি’। ছাপা পত্রিকার পাশাপাশি শুরু করেছে ডিজিটাল মাধ্যমেও প্রকাশনার কাজ। ঋত্বিক জানালেন, চলতি মাস থেকেই ই-ম্যাগাজিনও প্রকাশ করবেন তাঁরা। সোমা ভট্টাচার্যের প্রচ্ছদ ও অলংকরণে এবারের সংখ্যাটির যাবতীয় বিন্যাস করেছেন কবি ও গবেষক নরেণ হালদার। উল্লসিত ঋত্বিক জানালেন, পয়লা মে সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ হওয়ার দিনই তিন হাজারেরও বেশি মানুষ পছন্দ করেছেন ‘এই সময় ও রবীন্দ্রনাথ’। কিন্তু সামাজিক মাধ্যমে কেন এই প্রকাশের উদ্যোগ? ঋত্বিক বলেন, ‘লকডাউনের মেয়াদ বাড়ছে। তাই কোনও প্রকাশ অনুষ্ঠান করা সম্ভব নয়। পাঠকের দরবারে পৌঁছোনোর জন্য তাই এ ছাড়া কোনও উপায় নেই।’ আপাতত তাঁর ‘লক্ষ পাঠকই লক্ষ্য।’ ভরসার নোঙর বেঁধেছেন ঋত্বিক চিরকালের সেই রবীন্দ্রনাথেই!

Related Articles

Back to top button
Close