fbpx
অন্যান্যঅফবিটকলকাতাপশ্চিমবঙ্গহেডলাইন

কালী কালী মহাকালী…….

রণজিৎ ভট্টাচার্য: শক্তি সঙ্গমতন্ত্রে এই দশমহাবিদ্যা সম্বন্ধে বলা হয়েছে – ‘কালী তারা তথা ছিন্না সুন্দরী বগলামুখী, মাতঙ্গী শ্যামলা লক্ষ্মীঃ সিদ্ধিবিদ্যা চ ভৈরবী। ধূমাবতী ক্রমনৈব মহাবিদ্যা দশৈব তু॥’ এখানে ষোড়শীকে সুন্দরী এবং ভুবনেশ্বরীকে শ্যামলা নামে অভিহিতা করা হয়েছে। সর্বজীবকে গ্রাস করেন যিনি তিনি মহাকাল আর সেই মহাকালকেও কলন বা গ্রাস করেন তাই তিনি পরাৎপরা আদ্যাকালী। কালকে কলন করেন বলেই তাঁর নাম কালী এবং তিনি সকলের আদি। দেবী কালিকাই মহা-মহাব্রহ্মবিদ্যা। যোগিনীতন্ত্রে ‘কালী চ জগতাং মাতা সর্বশাস্ত্রেষু নিশ্চিতা।’ অর্থাৎ কালী যে জগতের মাতা তা সকল শাস্ত্রেই নিশ্চিত করে বলা হয়েছে। কালীতন্ত্রে দেবীর রূপের যে বর্ণনা আছে, তা হল-দেবীর চার হাত, মুক্তকেশী, করালবদনা, ঘনমেঘের মতো শ্যামবর্ণা, গলায় মুণ্ডমালা, দিগম্বরী। কালীর গায়ের রং কালো – মহাশক্তি নিরাকার তাই তিনি কৃষ্ণবর্ণা। কালী দিগম্বরী দেশ-কালের বন্ধনে তিনি সীমাবদ্ধ নন, অসীম তিনি। এটা বোঝাতেই এই দিগবসনা মূর্তি। গলায় মুণ্ডমালা – মুণ্ড হল জ্ঞান, শক্তির আধার। জ্ঞানরূপ মুণ্ডমালায় মহাশক্তি দেবী সজ্জিতা। বামদিকে দু’ই হাতে খড়গ এবং নরমুণ্ড, ভীষণ ধ্বংসের চিহ্ন আর ডানদিকের দু’ই হাতে অভয় ও বরদা মুদ্রায় পরম কল্যাণ প্রকাশিত। দু’ই কানে কুণ্ডল রূপে রয়েছে দু’টি শিশুর শবদেহ। কোমরে অনেক ছিন্নহাতের তৈরি মেখলা। রক্তাক্ত ঠোঁট, উঁচু দাঁত, মুখে হাসি। একদিকে ভীতি প্রদর্শন, অন্যদিকে বিশ্বের সৃজন ও সন্তানকে পালন। একই মূর্তিতে এমন বৈপরিত্য সারা পৃথিবীর অন্য কোথাও দেখা যায় নি।

কালীর ভয়ঙ্কর সুন্দর দু’টি রূপ-একদিকে তিনি ধ্বংসের প্রয়াসী অন্যদিকে তিনি বর ও অভয়াদাত্রী। মার্কণ্ডেয় পুরাণেও চামুণ্ডা এবং কালী অভিন্ন বলা হয়েছে। চণ্ড ও মুণ্ড দু’ই দৈত্যকে নিধনের জন্য দেবী চণ্ডীর ক্রোধান্বিত কালো কপাল থেকে কালীর আবির্ভাব। দেবী ভাগবতে কৃষ্ণবর্ণা পার্বতীকে কালী ও কালরাত্রী নাম দেওয়া হয়েছে। ঋগবেদেও দেবীরূপে সুপ্রাচীন কাল থেকে রাত্রিকে কল্পনা করা হয়েছে।
ভারতের আদিম অধিবাসী যারা মধ্যভারতে বসবাস করতেন তারা তাদের গায়ের রং, অবয়বের সঙ্গে মিলিয়ে কালী প্রতিমার রূপ কল্পনা করেছিলেন বলে অনেকেই মনে করেন। মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা আর্যরা ভারতের পশ্চিমপ্রান্ত দিয়ে ঢুকে সরস্বতী নদীর তীরে বসত করতে করতে যে মূর্তি কল্পনা করেছিলেন সেটি সরস্বতী যা খুবই স্বাভাবিক। হয়তো পরে অধিক শক্তিধর আর্যরা সে মূর্তিকে আত্মসাৎ করে নিয়েছে। আর অনার্যরা জনসমাজ থেকে দূরে সরে পাহাড়ে বনে-জঙ্গলে শ্মশানকালী, ডাকাতকালী ইত্যাদি নামে কালীকে পুজো করতে থাকে।

একাদশ শতাব্দীর কালিকা পুরাণে দেখা যাচ্ছে, মুক্তকেশী কালী বসে আছেন সিংহের উপরে। চার হাতের মধ্যে দু’হাতে খড়গ ও নীলপদ্ম। কলকাতা যাদুঘরে রাখা দশম-একাদশ শতকের একটি ভাস্কর্যে দেবীর হাসিমুখ, ললিতাসনের ভঙ্গিমায় পদ্মাসনা, গলায় মুণ্ডমালা, শুষ্কদেহ, পেটে ক্ষুধার সংকেত একটি বিছার ছবি, চার হাতে ছেদনযন্ত্র, নরমুণ্ড, একটি হাত ও হাতের সংযোগস্থলে ধরা ত্রিশূল। মূর্তিটিকে চামুণ্ডা কালীর প্রতিমা হিসাবে ধরা যেতে পারে। নবম শতাব্দীর প্রথম ভাগের গুর্জর প্রতিহার নৃপতি দ্বিতীয় নাগভট্ট’র এক তামার পটে চারহাত ও শবের উপর দাঁড়ানো এক দেবীর মূর্তি আঁকা আছে। দেবীর পরনে শাড়ি, এক হাতে টাঙ্গি, আরেক হাতে নৃমুণ্ড। খুব সম্ভবত দেবী নরদেহের কোনও অংশ চিবিয়ে খাচ্ছেন। লক্ষ করলে বোঝা যাবে, বাংলায় প্রচলিত কালীমূর্তির সঙ্গে কতটা সাদৃশ্য।

কালীর এমন মূর্তির কল্পনা কতদিনের? যতদূর জানা যায় ষোড়শ বা সপ্তদশ শতাব্দীর সাধক কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ এই কালীরূপের কল্পনার আদিস্রষ্টা। আনুমানিক ত্রয়োদশ শতকের গ্রন্থ বৃহদ্ধর্ম পুরাণে কালী স্বাস্থ্যবতী, শ্যামবর্ণা, দিগম্বরী ও মুক্তিকেশী শবরূপ মহাদেবের উপরে তাঁর আসন। তাঁর জিভ মুখ থেকে বেড়িয়ে এসেছে। নানা অলঙ্কারে ভূষিতা, মুখে হাসি, বাঁ-হাতে অসি ও নরমুণ্ড, আর ডান হাতে অভয় ও বরদানের ইঙ্গিত। শিবের বুকে পা রেখে কালী দাঁড়িয়ে। কিন্তু তাঁরা আসলে দু’জন নন। শ্রীরামকৃষ্ণদেবের অনুভূতিতে যিনি কালী তিনিই শক্তি। তিনিই ব্রহ্ম। শিব ছাড়া শক্তি নেই, শক্তি ছাড়া শিব নেই।

পুরাণ অনুযায়ী অসুর বধের জন্য মর্তে কালী এলেন অম্বিকা অর্থাৎ দেবী দুর্গা মায়ের রূপে। দেবী শিবা অর্থাৎ মঙ্গলময় শিবের শক্তি বা পরম মুক্তির প্রতীক। কার্তিকের অমাবস্যার রাত্রিতে যে মূর্তিপুজো হয়, প্রায় সেই প্রতিরূপের বর্ণনা দেওয়া আছে ত্রয়োদশ শতাব্দীর বৃহদ্ধর্ম পুরাণে। কোজাগরী পূর্ণিমার পরবর্তী অমাবস্যার রাত্রিকে দীপান্বিতা আখ্যা দেওয়া হয়েছে, যে রাত্রিতে দীপ জ্বালানো, নাচ, গান সবই অনুষ্ঠানের অঙ্গ। একাদশ শতাব্দীতে অল-বীরূনী তাঁর হিন্দু সংক্রান্ত বইয়ে ‘দীপাবলী’ উপলক্ষে উৎসব, মন্দির দর্শন ও দীপমালা সাজানোর উল্লেখ এবং ওই উৎসবের কালকে ভাগ্যোদয়ের উপযুক্ত সময় বলে মন্তব্য করেছেন।

অন্যান্য নানা নামেও জগন্মাতা কালী পূজিতা হন, যেমন- ভদ্রকালী, শ্মশানকালী, গুহ্যকালী, সিদ্ধিকালী ও কমলাকালী। আর ‘তন্ত্রলোকে’ কালীর অন্যান্য রূপেরও উল্লেখ পাওয়া যায়। সেগুলি হল রুদ্রকালী, রক্তকালী, সৃষ্টিকালী, স্থিতিকালী, সংহারকালী, মার্তণ্ডকালী, মহাভৈরবকালী, কালাগ্নিরুদ্রকালী। প্রতিটি রূপের জন্য ভিন্ন ভিন্ন ধ্যানমন্ত্র উল্লিখিত আছে ‘ক্রমস্তুতি’ গ্রন্থে। এছাড়াও রয়েছেন, বামাকালী, রক্ষাকালী, হংসকালী, রটন্তীকালী, ফলহারিণীকালী, শ্যামাকালী, নিত্যকালী, ধনকালী, চণ্ডীকালী, পার্বতীকালী ইত্যাদি।

‘জৈনকল্পসূত্র’ অনুযায়ী এই রাত্রিতে মহাবীরের মহাপ্রয়াণ হয়েছিল। তিনি পরম মুক্তি লাভ করেছিলেন। বিভিন্ন দেবতারা সেই রাত্রিতে দীপ জ্বালিয়েছিলেন। অন্যদিকে আঠারোজন শাসক, ‘প্রজ্ঞার’ আলো যখন নিভে গেছে, তখন জাগতিক বিষয়গুলিকে ‘আলোকিত’ করতে দীপের আলো জ্বালিয়েছিলেন। আজও এই উপলক্ষে চারদিন ব্যাপী শ্বেতাম্বর জৈনরা উৎসব পালন করেন। সর্বকামনা সিদ্ধির দেবী, কালীপুজোর দিন ধনের দেবীর আরাধনা করেন। ধনের উপাসকেরা দীপাবলী উৎসবে রাত্রিকে ধনকুবেরের পরিচারক যক্ষদেবের নামে যক্ষরাত্রি হিসাবেও পালন করেন। আর বৃহদ্ধর্ম পুরাণে কালীকে ‘নিষ্ফলা’ বা ‘ফলহীনা’ বলা হয়েছে। এর অর্থ যদি দেবীকে ‘শূণ্যের’ প্রতীক বলে চিহ্নিত করে, তবে তা বৌদ্ধপ্রভাবের ইঙ্গিত করতে পারে। সবশেষে যা বলার, শিবা অর্থাৎ পরমা মুক্তির প্রতীক বলে বর্ণনার মধ্যে আমরা দেবীভাবনায় জৈন, বৌদ্ধ ও ব্রাহ্মণ্য বিশ্বাসের এক ধরনের একাত্মীকরণের প্রচেষ্টার সন্ধান পেতে পারি। আর সেখানেই দেবী কালীর পুজোর মাহাত্ম্য।

Related Articles

Back to top button
Close