fbpx
পশ্চিমবঙ্গহেডলাইন

সিরিয়াল কিলার চেনম্যান কামরুজ্জামানের মৃত্যু দণ্ডের সাজা দিল কালনা আদালত

অভিষেক চৌধুরী, কালনা: বাড়িতে একা থাকা মহিলাদের গলায় চেন পেঁচিয়ে খুন করার পর তাকে ধর্ষণ করে লুটপাত চালাত ‘চেনম্যান’ । আর এই সিরিয়াল কিলার ‘চেনম্যান’ কে ঘিরেই ২০১৯-এ আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল পূর্ব বর্ধমানের কালনায়। সেই সিরিয়াল কিলার ‘চেনম্যান’ কামরুজ্জামান সরকারের মৃত্যু দণ্ডের নির্দেশ দিল আদালত। সোমবার পূর্ব বর্ধমানের কালনার অতিরিক্ত জেলা দায়রা আদালতের বিচারক তপন কুমার মণ্ডল এই সাজা ঘোষনা করেন।দৃষ্টান্তমূলক এই সাজা ঘোষনায় খুশি কামরুজ্জামানের হাতে খুন হয়ে যাওয়া কালনার সিঙ্গেরকোনের নাবালিকা ছাত্রীর পরিবার।

পুলিশ সূত্রে জানা যায় যে,২০১৯ সালের
৩০ মে-র ঘটনা। ওই দিন বিকালে কালনা থানার সিঙ্গেরকোন গ্রামে থাকা নিজেদের বাড়িতে একাই ছিল দশম শ্রেণীর পড়ুয়া নাবালিকা ছাত্রীটি। তার মা তখন অপরের বাড়িতে পরিচারিকার কাজ সারতে গিয়েছিলেন। এলাকায় রেইকি চালানোর সময়ে ছাত্রীটি বাড়িতে একা রয়েছে বলে জানতে পারে কামরুজ্জামান। সুযোগ বুঝে সে চুপিসারে ছাত্রীর ঘরে ঢুকে পড়ে।

অভিযোগ, কামরুজ্জামান প্রথমে ছাত্রীকে ধর্ষনের চেষ্টা করে। এরপর ছাত্রীটি বাঁধা দিলে কামরুজ্জামান ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে ও পরেই ধারালো ও ভারী কিছু দিয়ে ছাত্রীর মাথায় আঘাত করে। এরপরেই তার গলায় লোহার চেন পেঁচিয়ে ধরে। ছাত্রী জ্ঞান হারালে কামরুজ্জামান মনে করে ছাত্রীটি মারা গিয়েছে। সংজ্ঞাহীন অবস্থায় পড়ে থাকা ছাত্রীর উপর যৌন অত্যাচার চালিয়ে কামরুজ্জামান চম্পট দেয়।সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে মেয়েকে রক্তাক্ত অবস্থায় ঘরে পড়ে থাকতে দেখে চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করেন ছাত্রীর মা। খবর পেয়ে পুলিশ ও স্থানীয় মানুষজন ঘটনাস্থলে ছাত্রীকে উদ্ধার করে কালনা মহকুমা হাসপাতালে ভর্তি করে। সেখানে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে ছাত্রীকে বর্ধমান মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়। সেখানে কয়েকদিন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে। শেষ পর্যন্ত জীবনযুদ্ধে হার মানে।এর পরেই ছাত্রীর পরিবার অভিযোগ জানায় কালনা থানায়। নড়েচড়ে বসে কালনা পুলিশ।

জেলা পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্তারাও খুনি চেনম্যানের খোঁজে নানা ভাবে খোঁজ চালানো শুরু করেন। খুনির নাগাল পেতে বিভিন্ন থানায় তার সম্পর্কে তথ্যও পাঠানো হয়। একই সঙ্গে চলতে থাকে নাকা চেকিং ও খানা তল্লাশী। ঘটনার কয়েকদিন বাদে ২ রা জুন নাকা চেকিং
চলাকালীন কালনার কাঁকুরিয়া গ্রামে বাইক নিয়ে যাওয়ার সময় পুলিশের হাতে ধরা পড়ে যায় ‘চেনম্যান ’ কামরুজাম্মান সরকার।

পুলিশের দাবি, ম্যারাথন জেরায় কামরুজ্জামান ছাত্রীর উপর হামলা ও যৌন নির্যাতন চালানোর কথা কবুল করে।জিজ্ঞাসাবাদে কামরুজ্জামান পুলিশকে জানায় তার আদি বাড়ি মুর্শিদাবাদে হলেও সে স্ত্রী ও তিন সন্তানকে নিয়ে কালনার সমুদ্রগড়ের সুজননগরে থাকে। ৩ রা জুন ধৃত কামরুজ্জামানকে কালনা আদালতে পেশ করে ও নিজেদের হেপাজতে নেয় পুলিশ। কামরুজ্জামানকে হেপাজতে নিয়ে পুলিশ তদন্ত চালালে উঠে আসে আরও নানা চাঞ্চল্যকর তথ্য ।
তদন্তকারী পুলিশ কর্তারা জানতে পারেন সিঙ্গেরকোনের ছাত্রী কামরুজ্জামানের প্রথম শিকার নয়। ওই বছর ৬ মাসের মধ্যে কালনা মহকুমার ৬ মহিলা কামরুজ্জামানের বর্বরোচিত হামলার শিকার হয়েছে।

এছাড়াও হুগলী ও পূর্ব বর্ধমান জেলার বিভিন্ন থানা এলাকায় ঘটানো ১৩ টি ঘটনার মধ্যে সে ১১ টি খুনের ঘটনা ঘটিয়েছে। পুলিশ আরও জানিয়েছে, বাড়িতে একা থাকা মহিলারাই ছিলেন কামরুজ্জামানের টার্গেট। তার জন্য বাইকে চড়ে নানা অছিলায় এলাকায় এলাকায় ঘুরে সে রেইকি চালাত। এরপর সুযোগ বুঝে বাড়িতে একা থাকা মহিলার ঘরে ঢুকে গিয়ে অতর্কিতে আক্রমন চালাতো কামরুজ্জামান। প্রথমে সে ধারালো ও ভারী ধরনের লোহার রড দিয়ে মাথায় আঘাত করে মহিলাকে ঘায়েল করত। পরে গলায় চেন পেঁচিয়ে ওই মহিলাকে খুন করে সে তার যৌন লালসা পূরণ করত। এই কার্যসিদ্ধি হবার পর মহিলার ঘরে থাকা মূল্যবান সামগ্রী হাতিয়ে নিয়ে কামরুজ্জামান চম্পট দিত।চুরি করে নেওয়া সেইসব সামগ্রী বিক্রি করত। সেই টাকায় দামি পোষাক কিনে ও নিত্য নতুন বাইক চড়ে ঘুরে বেড়াত কামরুজ্জামান।

পুলিশ দাবি করেছে সিঙ্গেরকোনের ছাত্রীকে খুনের ঘটনায় ধরা পড়ার পরেই কামরুজ্জামানের সমস্ত কুকীর্তির পর্দা ফাঁস হয়ে যায়। কালনা আদালতের বিচারক এদিন কামরুজ্জামানের ফাঁসির সাজা ঘোষনার পরেই খুন হওয়া ছাত্রীর মা বলেন , “এবার আমার মেয়ের আত্মা শান্তি পাবে। বিচারক এই নিষ্ঠুর খুনিকে যোগ্য সাজাই দিয়েছেন।“

আদালতের সরকারী আইনজীবী সৌম্যদীপ রাহা বলেন ,‘সমস্ত সাক্ষ্য প্রমানের ভিত্তিতে বিচারক খুনির এই সাজা ঘোষনা করেছেন।’ যদিও কামরুজ্জামানের ফাঁসির সাজা মেনে নিতে পারেননি কামরুজ্জামানের স্ত্রী জাহানারা বিবি। এই রায়ের বিরুদ্ধে তারা উচ্চ আদালতে যাবেন বলে জানান।

Related Articles

Back to top button
Close