fbpx
পশ্চিমবঙ্গহেডলাইন

রাজ্য সরকারের ভূমিকা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ, বাংলায় আসছেন কাশ্মীরি নোডাল অফিসার

সৌরভ বড়াল, বীরভূম: প্রতিবছরই ভারতের কাশ্মীর রাজ্য থেকে সেখানকার শীতবস্ত্র ব্যবসায়ীরা পশ্চিমবাংলায় আসেন তাঁদের শীতবস্ত্র বিক্রি করার জন্য। শীতের মরশুমে কয়েক মাস আগে থেকে তাঁরা বাংলায় এসে পৌঁছান। তারপর গোটা বাংলা জুড়ে বিভিন্ন জেলায় জেলায় ছড়িয়ে পড়েন এইসব কাশ্মীরি শীতবস্ত্র ব্যবসায়ীরা।

দীর্ঘ বহু বছর ধরে এই ভাবেই গোটা ভারত জুড়ে ঘুরে ঘুরে ব্যবসা করেন এইসব ব্যবসায়ীরা। এবছরও বাংলায় এসেছেন প্রায় চার হাজারের বেশি কাশ্মীরের শীতবস্ত্র ব্যবসায়ী। কিন্তু করোনা ভাইরাস এর জেরে গোটা ভারতবর্ষজুড়ে লকডাউন হয়ে যাওয়াই কার্যত বিপদের মুখে আটকে পড়েছেন বাংলায়। বর্তমানে তাঁরা কাশ্মীরে ফিরতে না পেরে রীতিমত সমস্যায় পড়েছেন বাংলায়। এমনটাই অভিযোগ করেছেন কাশ্মীরি শীতবস্ত্র ব্যবসায়ীরা। সেই সঙ্গে তাঁদের অভিযোগ লকডাউনের পর এই অসহায় অবস্থার খবর একবারের জন্য নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি রাজ্য সরকার।
রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় জেলায় শুধু নয় কলকাতার বুকে থাকা শীতবস্ত্র ব্যবসায়ীরাও প্রশাসনের দরজায় একাধিকবার কড়া নেড়েছেন সাহায্যের জন্য। কাশ্মীরে নিজের পরিবারের কাছে ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্য প্রশাসনের দপ্তরে দপ্তরে হন্যে হয়ে ছুটে বেড়াচ্ছেন তারা। কিন্তু রাজ্য সরকারের কোন সহযোগিতার বদলে তাদের কপালে জুটেছে কখনো পুলিশের মার তো কখনো লাঞ্ছনা।

কাশ্মিরী শীত বস্ত্র ব্যবসায়ীদের সংগঠন যারা বাংলায় এইসব ব্যবসায়ীদের পরিচালনা করেন কাশ্মীরি শাল ডিলার্স হকার্স এসোসিয়েশন। সেই সংগঠনের তরফে জানা গেছে, শীতের মরশুম শুরু হওয়ার আগে অর্থাৎ অক্টোবরের মাঝামাঝি সময় থেকে বাংলায় আসতে শুরু করেন তাঁরা।

তারপর বাংলায় ব্যবসা পত্র গুছিয়ে কাশ্মীরের উদ্দেশ্যে রওনা দেন মার্চ মাস নাগাদ। এবছরও তেমনই প্রস্তুতি নিয়ে এসেছিলেন তাঁরা। মার্চ মাসের শেষের দিকে বেশিরভাগ এই শীতবস্ত্র ব্যবসায়ীরা কাশ্মীরে ফিরে যাওয়ার জন্য কেউ ট্রেনযোগে অথবা কেউ বিমানযোগে ফিরে টিকিট কেটেছেন। কিন্তু মার্চ মাসের 23 তারিখ হঠাৎ কেন্দ্র সরকার লকডাউন ঘোষণা করায় বাংলাতেই বিপাকে পড়ে যান তাঁরা। ট্রেন যোগে ফিরে যাওয়ার জন্য যারা ভারতীয় রেলের কাছে টিকিট কেটে ছিলেন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাঁদের টিকিট বাতিল হয়ে যাওয়ায় টাকা ফেরত পেয়ে গেছেন তাঁরা। কিন্তু এয়ার ইন্ডিয়ার অথবা অন্যান্য বিমানযোগে সরাসরি অথবা ট্রাভেল এজেন্ট এর মাধ্যমে বিমান টিকিট কাটার পর তাঁরা যাত্রা তো করতে পারেনি নি বরং টিকিট বাতিল হয়ে যাওয়ায় হাজার হাজার টাকা বিমান কর্তৃপক্ষের কাছে ফেরত পাননি তারা।

ইউনিয়নের তরফের আরও অভিযোগ, বাংলায় ব্যবসা করতে আসার শুরুতে অনেক ক্রেতা এইসব ব্যবসায়ীদের কাছে ঋণে পণ্য সামগ্রী ক্রয় করেছেন। মার্চ মাসের শুরুর দিকে সেই সব ঋণ ক্রেতারা আংশিকভাবে পরিশোধ করলেও অনেকে পুরো টাকা দিতে পারেননি লকডাউন এর জেরে। তাই লক্ষ লক্ষ টাকা ক্রেতাদের কাছে আটকে রয়েছে এইসব ব্যবসায়ীদের। সেই সঙ্গে বাড়ি ফিরে যাবার জন্য বিমানের টিকিট তাও ফেরত পাননি তারা। এর উপর লকডাউন এ বাংলায় গৃহবন্দি হয়ে একদিকে ঘর ভাড়া গুনতে হচ্ছে এবং অন্যদিকে দিনের পর দিন খাওয়া-দাওয়ার খরচ বহন করতে হচ্ছে। ফলে আর্থিকভাবে ব্যাপক সংকটের মধ্যে দিয়ে বাংলায় দিন কাটাচ্ছেন প্রায় চার হাজারের বেশি কাশ্মীরি শীত বস্ত্র ব্যবসায়ী।

এরমধ্যে বীরভূমের বিভিন্ন এলাকায় রয়েছেন প্রায় ১৭জন, আসানসোলে প্রায় ৫০ জন, দুর্গাপুরে প্রায় ৩০ জন, পুরুলিয়াতে ১৯ জন, বাঁকুড়াতে ২২ জন সহ রাজ্যজুড়ে উত্তরবঙ্গ এবং দক্ষিণবঙ্গ মিলিয়ে বর্তমানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছেন এই সমস্ত ব্যবসায়ীরা।

এইসব ব্যবসায়ীদের আরও একটি সংগঠন কাশ্মীর আর্ট ইউনিয়ন এর তরফে অভিযোগ, বাংলায় আটকে পড়া প্রায় চার হাজার শীত বস্ত্র ব্যবসায়ী একত্রিত হয়ে রাজ্য প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হয়েছে। শুধু তাই নয় রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গেও বারংবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হয়েছে। এছাড়া তাদের দাবি বিভিন্ন জেলায় যে সমস্ত ব্যবসায়ীরা রয়েছেন তারা সেই সব জেলার প্রশাসনিক আধিকারিকদের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছেন।

আর্জি জানিয়েছেন তাদের বাড়ি ফেরার ব্যবস্থা করার জন্য। ইমেইলের মাধ্যমে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, কেন্দ্র সরকার এবং সর্বোপরি কাশ্মীর সরকারের কাছে একাধিকবার মেইল করে তাদের সমস্যার কথা জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। কিন্তু কোনভাবেই কোন সদুত্তর মেলেনি বলে তাদের অভিযোগ।

অন্যদিকে কলকাতার কাশ্মীর শাল ডিলার্স হকার্স অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে জানা গেছে, সোমবার ব্যবসায়ীদের ডাকে সাড়া দিয়ে কাশ্মীর সরকারের একজন নোডাল অফিসার বাংলায় আসছেন। ইউনিয়ন এর পক্ষ থেকে এক সদস্য জানিয়েছেন, “বাংলায় আমরা প্রায়ই চার হাজার শীতবস্ত্র ব্যবসায়ী আটকে আছি। আমাদের পরিবার সেখানে খুব উদ্বিগ্ন আছে। আমরা দারুণ সমস্যার মধ্যে দিয়ে দিন।বাড়ি ফেরার জন্য বারবার সরকারের কাছে আর্জি করেছি। জানিনা পশ্চিমবাংলায় এ কেমন প্রশাসন, কেমন সরকার? থানায় গিয়ে পুলিশ আধিকারিকদের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা বলেছেন পঞ্চায়েত বিডিও অফিসে গিয়ে কথা বলতে। সেখানেও গেছি। তারা বলেছেন অনলাইনে ই পাস এর জন্য আবেদন করতে। কিন্তু কাশ্মীরের জন্য কোন ইপাস দিচ্ছে না সরকার। যদি রাজ্য সরকার আমাদের জন্য কোন যানবাহনের ব্যবস্থা টুকু না করতে পারে অন্ততপক্ষে আমাদের ইপাস দিন আমরা নিজেরা যানবাহন ব্যবস্থা করে ফিরে যাব কাশ্মীর। তা না হলে কোথায় যাব আমরা? এত জায়গায় আবেদন করেছি কিন্তু সরকারের তরফে একবারের জন্য আমাদের খোঁজ নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি এই রাজ্য সরকার। এখন আমাদের একমাত্র ভরসা যদি কাশ্মীরের নোডাল অফিসার আমাদের উদ্ধার করেন।”

বীরভূমের সিউড়ি শহরে ব্যবসা করতে আসা কাশ্মীর আর্ট ইউনিয়নের এক সদস্য তারেক আহমেদ শেখ জানিয়েছেন,”জেলার প্রশাসনিক দপ্তর নেই যেখানে হন্যে হয়ে আমরা আধিকারিকদের কাছে আবেদন নিয়ে গিয়েছি। আমাদের বাড়ি ফেরার জন্য কোনো রকম কোনো ইপাস সরকার দিচ্ছে না। দিনের পর দিন গরম বাড়ছে। শারীরিক অসুস্থতার জন্য আমাদের এক ব্যবসায়ী কর্মী হৃদরোগে মারা গেছেন। তার পরিবার রয়েছে কাশ্মীরে। কিন্তু বাধ্য হয়ে তার সৎকার বাংলাতে করতে হয়েছে। সরকারের কাছে আর্জি আমাদের বাড়ি ফেরার জন্য কোন ব্যবস্থা যেন তারা করেন।”

Related Articles

Back to top button
Close